Image description

চট্টগ্রাম বন্দর এবার ৩৫ লাখ একক কন্টেইনার উঠানামার বড় সক্ষমতা দেখিয়েছে। মোট কন্টেইনার উঠানামার ৯২ শতাংশই করেছে আট দেশি অপারেটর। বাকি ৮ শতাংশ বিদেশি অপারেটর।

কন্টেইনার ওঠা-নামায় এবার ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একটি জাহাজ বন্দরে এসে কত দ্রুত পণ্য ওঠা-নামা শেষ করে জেটি ছেড়েছে (জাহাজের গড় অবস্থানকাল) সেই সূচকেও বেশ উন্নতি করেছে। তবে একটি কন্টেইনার কত সময় ধরে বন্দর ইয়ার্ডে পড়েছিল সেই সূচকে অবনতি হয়েছে। এমন কৃতিত্বের পুরোটাই দেশিয় অপারেটরদের। বিপরীতে বিদেশি অপারেটরের পারফরম্যান্স কাঙ্ক্ষিত মানে উন্নীত হয়নি।

এই ৯২ শতাংশ কন্টেইনার ওঠা-নামা করে চট্টগ্রাম বন্দর এবার ৪ হাজার ৮৫ কোটি টাকা আয় করেছে। আগের বছরের তুলনায় আয় ৮৮৫ কোটি টাকা বেশি। এখন বন্দর চাইছে এই কন্টেইনার ওঠানামার প্রায় পুরোটাই বিদেশিদের দিয়ে পরিচালনা করতে।

এমন এক সময়ে সক্ষমতা-দক্ষতা দেখাল যখন বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল এনসিটি বিদেশি অপারেটর দিয়ে পরিচালনার আলাপ চূড়ান্ত পর্যায়ে। আর সেই টার্মিনাল বিদেশিদের দিয়ে পরিচালনার প্রতিবাদে সরব হয়েছেন বন্দরভিত্তিক শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠন। ইজারা ঠেকাতে চলছে সমাবেশ, মানববন্ধন ও কালো পতাকা মিছিল।

বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার জানালেন, ‘সরকার যদি দেশ ভালো চালাতে না পারে, দক্ষতা দেখাতে ব্যর্থ হয় তখন কী আমরা বিদেশিদের পরিচালনা করতে দিই? যদি না হয় তাহলে বন্দরের প্রতিবছর প্রবৃদ্ধি বেশি দেখানো টার্মিনাল কেন বিদেশিদের ইজারা দিব। এনসিটি সিসিটির মতো ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ বিদেশিদের ইজারা দেওয়া চলবে না।’

চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার উঠানামার ৫৪ শতাংশ একাই ওঠা-নামা করেছে বন্দরের হৃদপিণ্ড নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। সেটি পরিচালনা করছে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব জাহাজ মেরামতকারী প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ড্রাইডক। পাশে থাকা চারটি জেটি সমৃদ্ধ চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনালও (সিসিটি) পরিচালনা করছে দেশিয় টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। এই টার্মিনালে বন্দরের মোট কন্টেইনার উঠানামার ২৬ শতাংশ। জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এর ছয় জেটিতে ছয় দেশিয় প্রতিষ্ঠান কন্টেইনার উঠানামা করেছে ১২ শতাংশ।

 

এর বাইরে একমাত্র বিদেশি অপারেটর রেড সী গেটওয়ে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি মোট কন্টেইনার উঠানামার সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ করেছে। তিনটি জেটি সমৃদ্ধ এই পিসিটি এখনো জিসিবির সনাতনী পদ্ধতির মতোই কন্টেইনার ওঠানামা করে। রেড সী গেটওয়ে পিসিটি পরিচালনায় যে দক্ষতা দেখানোর কথা সেই লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক দূরে।

যদিও রেড সী গেটওয়ে টার্মিনাল হেড অফ কমার্শিয়াল সৈয়দ আরেফ খুরশিদ জানালেন, ‘বিগত দুই বছর তো আমরা টার্মিনাল প্রস্তুতিতে ছিলাম। ৪টি কী গ্যান্ট্রি ক্রেন যুক্ত করার কাজ জুলাইয়ে শেষ হবে। এরপর আমাদের পারফরম্যান্স গণনা শুরু। আমরা ভালো করতে পারবো। অন্যরাও আমাদের অনুকরণ করবে।’

বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ একক কন্টেইনার ওঠানামা সক্ষমতা দিয়ে তৈরি হয়েছে পিসিটি। পূর্ণ ক্ষমতায় আসলে বন্দরের মোট কন্টেইনার ওঠানামার ১৪ শতাংশ করতে পারবে এ টার্মিনাল।

চট্টগ্রাম বন্দর এখন চাইছে এনসিটি ও সিসিটি বিদেশিদের দিয়ে পরিচালনা করতে। যে দুটি টার্মিনালের কন্টেইনার ওঠা-নামার সক্ষমতা ৮০ শতাংশ। এর সঙ্গে পিসিটির ৭ শতাংশ যোগ হলে কন্টেইনার ওঠা-নামার ৮৭ শতাংশই বিদেশিদের দখলে চলে যাবে।

 

দেশীয় অপারেটর কন্টেইনার ওঠানামার দক্ষতা-সক্ষমতার পুরোটাই দেখাচ্ছে। বার্থ অপারেটর এভারেস্ট এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলছেন, ‘এখন পর্যন্ত যা পারফরম্যান্স পুরোটাই দেশি অপারেটরদের। বিদেশি অপারেটর যদি এর চেয়ে ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে চায় তাহলে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় যোগ্য হয়ে আসুক। কিন্তু গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট (জিটুজি) কনসেশন চুক্তির নামে বিদেশিদের দেওয়া অন্যায়, অনৈতিক।’

বিশ্বের শীর্ষ শিপিং লাইনে বাংলাদেশের কর্মরত নির্বাহী এক কর্মকর্তা বললেন, বিদেশিদের ইজারার পেছনে অকাট্য কোন যুক্তি এখনো বন্দর দেখাতে পারেনি। বন্দর চেয়ারম্যান এখন আবেগ দিয়ে সেটি বোঝানোর চেষ্টা করছেন আরব-আমিরাতে ২৬ লাখ বাংলাদেশি আছে। সেই অজুহাতে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যদি কাজ দিতে হয়। তাহলে মালয়েশিয়ায় ১০ লাখ প্রবাসি বাংলাদেশির জন্য তাদের একটি টার্মিনাল, ওমান কাতার, যুক্তরাজ্যকেও তিনটি টার্মিনাল দিতে হবে!’

দেশে এখন জোর আলাপ চলছে দেশি নাকি বিদেশি অপারেটর দিয়ে এই বন্দরের টার্মিনাল পরিচালিত হবে। দেশি অপারেটর দিয়ে পরিচালনার যুক্তি হচ্ছে, দেশিয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহারে দেশের কৌশলগত সমুদ্র-বাণিজ্যের একক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। রাজস্বের সম্পূর্ণ অর্থ দেশে থাকে। স্থানীয় পর্যায়ে বিপুল দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি হয়।

বিপরীতে বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে বিশ্বমানের প্রযুক্তি,আধুনিক ইয়ার্ড ম্যানেজমেন্ট ও গ্লোবাল নেটওয়ার্ক নিশ্চিত হয়। কিন্তু কৌশলগত সমুদ্র-বাণিজ্যের একক নিয়ন্ত্রণ ও সংবেদনশীল ডেটা বিদেশিদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। অর্জিত আয়ের বড় অংশ বাইরে চলে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে।