ঢাকার কোনো গলিতে ঢুকলেই এখন বোঝা যায়, এবারের বিশ্বকাপ শুধু যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর মেক্সিকোতেই হচ্ছে না। এর আরেকটি আবেগের আয়োজক যেন বাংলাদেশও। বারান্দা থেকে বারান্দায় উড়ছে আকাশি-সাদা, সবুজ-হলুদ। কোথাও তিনতলা বাড়ির সমান পতাকা, কোথাও চায়ের দোকানের টেবিলে মেসি-নেইমার নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা। রাত যত গভীর হয়, টেলিভিশনের আলোয় তত জেগে ওঠে শহর, মফস্বল, গ্রাম। বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দল কোনো দিন বিশ্বকাপে খেলেনি; তবু বিশ্বকাপ এ দেশে কখনোই পুরোপুরি ‘বিদেশি’ আসর হয়ে থাকেনি।
২০২৬ বিশ্বকাপ চলছে উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকোতে। এবারই প্রথম বিশ্বকাপ ৪৮ দলের, ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত চলা এই আসর ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায়। অথচ বাংলাদেশের মানুষের আবেগের মানচিত্রে এখনও সবচেয়ে উজ্জ্বল দুটি দেশ—আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। প্রশ্ন হলো, হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দুটি দক্ষিণ আমেরিকান দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের এই আত্মীয়তা তৈরি হলো কীভাবে?
এর উত্তর এক দিনে তৈরি হয়নি। এর ভেতরে আছে পেলের রূপকথা, ম্যারাডোনার বিদ্রোহী জাদু, বিটিভির সাদা-কালো পর্দা, স্বাধীনতা–পরবর্তী বাংলাদেশের স্বপ্ন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্মৃতি, স্যাটেলাইট টিভির বিস্তার, মেসির দীর্ঘ অপেক্ষার জয়, আর নিজেদের ফুটবলহীনতার ভেতরেও ফুটবলকে ভালোবাসতে থাকা এক দেশের গল্প।
ফুটবল ছিল আগে থেকেই ঘরের খেলা
বাংলাদেশে বিশ্বকাপ-পাগলামি দেখে অনেকে মনে করেন, এ দেশের ফুটবলপ্রেম বুঝি শুধু আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলকে ঘিরেই তৈরি। বিষয়টি পুরোপুরি ঠিক নয়। স্বাধীনতার আগেও পূর্ব বাংলায় ফুটবল ছিল জনপ্রিয় খেলা। স্বাধীনতার পর ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী—বিভিন্ন শহরে ফুটবল ছিল বড় সামাজিক ঘটনা। আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ মানেই ছিল স্টেডিয়ামে মানুষের ঢল, পাড়ায় পাড়ায় তর্ক, পতাকা, ব্যানার, রেডিও-টিভির সামনে অপেক্ষা।
এই যে দলভাগ করে ফুটবল ভালোবাসার সংস্কৃতি—এটি বাংলাদেশে আগে থেকেই ছিল। বিশ্বকাপ এসে শুধু সেই আবেগকে আন্তর্জাতিক রং দিয়েছে। আগে ছাদে উড়ত আবাহনী-মোহামেডানের পতাকা; পরে সেখানে জায়গা করে নেয় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বকাপের আগে থেকেই জানত, ফুটবলে একটি দল শুধু দল নয়; সেটি পরিচয়, স্মৃতি, অহংকার, কখনো পারিবারিক উত্তরাধিকারও।
আরেকটি ইতিহাসও মনে রাখা জরুরি। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রীতি ম্যাচ খেলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত ও অর্থ সংগ্রহ করেছিল। সেই দল বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে শুধু ক্রীড়া দল নয়, মুক্তিযুদ্ধের অংশ হিসেবেও স্মরণীয়। তাই বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমের শিকড় মাঠের চেয়েও গভীরে—এটি জাতির স্মৃতি, সংগ্রাম ও আবেগের সঙ্গে যুক্ত।
ব্রাজিল: পেলের আলোয় দরিদ্র দেশের স্বপ্ন
বাংলাদেশে ব্রাজিল-সমর্থনের শিকড় খুঁজতে গেলে পেলের নাম এড়ানো যায় না। পেলে ছিলেন এমন এক ফুটবলার, যিনি শুধু ব্রাজিলকে নয়, পুরো ফুটবলকে এক রকম কবিতায় পরিণত করেছিলেন। দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা এক কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর বিশ্ব ফুটবলের রাজা হয়ে উঠলেন—এই গল্প বাংলাদেশের মতো নবীন, দরিদ্র, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে আলাদা অর্থবহ হয়ে উঠেছিল।
পেলে ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের অংশ ছিলেন। ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতেছে পাঁচবার—১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে। এই সাফল্যই ব্রাজিলকে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলগুলোর একটিতে পরিণত করে।
কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে ব্রাজিল শুধু সাফল্যের দল নয়; ব্রাজিল মানে সৌন্দর্য। ব্রাজিল মানে বল পায়ে ছন্দ, ড্রিবল, আনন্দ, রং, শরীরের ভাষা। ইউরোপীয় ফুটবলের শৃঙ্খলিত শক্তির বিপরীতে ব্রাজিলের ফুটবল ছিল নাচের মতো। বাংলাদেশের গ্রামের কাদামাটির মাঠে, খালি পায়ে, বাঁশের গোলপোস্টে যে ফুটবল খেলা হতো, সেখানে জয় যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আনন্দও তেমনই ছিল বড়। ব্রাজিলের খেলায় সেই আনন্দের প্রতিধ্বনি খুঁজে পেয়েছিল বাংলাদেশ।
সত্তর-আশির দশকের ব্রাজিলভক্তদের কাছে পেলে, জিকো, সক্রেটিস, ফালকাও—এসব নাম ছিল কিংবদন্তি। পরে এলেন রোমারিও, বেবেতো, রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনিও, কাকা, নেইমার। এক প্রজন্ম আরেক প্রজন্মকে গল্প শুনিয়েছে, “আমাদের সময় ব্রাজিল এমন খেলত।” এভাবেই ব্রাজিল-সমর্থন শুধু ফুটবল বিশ্লেষণ নয়, পারিবারিক স্মৃতি হয়ে উঠেছে।
আর্জেন্টিনা: ম্যারাডোনা, ইংল্যান্ড আর এক অদ্ভুত প্রতিশোধ
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-সমর্থনের সবচেয়ে বড় মোড় ১৯৮৬ বিশ্বকাপ। মেক্সিকোর আজটেকা স্টেডিয়ামে ২২ জুন আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ডের। ম্যাচটি হয়েছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধের চার বছর পর, যখন আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের রাজনৈতিক উত্তেজনা স্মৃতিতে তাজা। সেই ম্যাচে ডিয়েগো ম্যারাডোনা দুটি গোল করেন—একটি বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’, আরেকটি অর্ধেক মাঠ ড্রিবল করে করা ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি জেতে ২-১ ব্যবধানে এবং পরে বিশ্বকাপও জেতে।
বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই ম্যাচ শুধু ফুটবল ছিল না। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দীর্ঘ স্মৃতি বহন করা এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ইংল্যান্ডকে হারানো আর্জেন্টিনা হয়ে উঠেছিল এক ধরনের ‘আমাদের পক্ষের’ দল। ম্যারাডোনা যেন শুধু ইংলিশ ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে যাননি; তিনি কাটিয়ে গিয়েছিলেন ক্ষমতার অহংকার, সাম্রাজ্যের স্মৃতি, পরাজিত মানুষের ক্ষোভ।
এই জায়গাতেই আর্জেন্টিনা বাংলাদেশের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। ছোটখাটো, বেঁটে, জেদি, আবেগী এক মানুষ: ম্যারাডোনা—বিশ্বের বড় শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জিতছেন। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে এই গল্প ছিল খুব পরিচিত। তারা নিজেদের জীবনেও বড় শক্তির সামনে ছোট মানুষের লড়াই দেখেছে। তাই ম্যারাডোনা শুধু ফুটবলার হয়ে থাকেননি; তিনি হয়ে ওঠেন প্রতিরোধের প্রতীক।
বিটিভির সাদা-কালো পর্দা: একসঙ্গে খেলা দেখার সময়
আশির দশকে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না। যে বাড়িতে টিভি ছিল, বিশ্বকাপের রাতে সেই বাড়ি হয়ে উঠত ছোটখাটো একটি স্টেডিয়াম। উঠানে চাটাই পেতে বসত মানুষ। কেউ জানালা দিয়ে দেখত, কেউ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। অ্যান্টেনা একটু ঘুরিয়ে ছবি পরিষ্কার করার চেষ্টা, বিদ্যুৎ চলে গেলে হতাশা, গোল হলে গোটা পাড়ার চিৎকার—এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্মৃতির অংশ।
১৯৮৬ বিশ্বকাপ অনেক বাংলাদেশির কাছে প্রথম বড় টেলিভিশন-দেখা বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপেই ম্যারাডোনা তাঁর জাদু দেখালেন। ফলে আর্জেন্টিনা-সমর্থন শুধু খেলার সৌন্দর্য থেকে নয়, স্মৃতি থেকে জন্ম নিল। যে শিশু বাবার পাশে বসে ১৯৮৬-র বিশ্বকাপ দেখেছিল, সে বড় হয়ে ছেলেকে বলেছে ম্যারাডোনার গল্প। গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবেগ, আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দল।
ব্রাজিলের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। যারা পেলে সরাসরি দেখেনি, তারা পেলের গল্প শুনেছে। যারা জিকো দেখেছে, তারা রোনালদো যুগে নিজেদের সন্তানদের বলেছে, “ব্রাজিলের ফুটবল আলাদা, বৈচিত্র্যময়।” টেলিভিশন তাই বাংলাদেশে শুধু খেলা দেখায়নি; প্রজন্ম তৈরি করেছে।
কেন ইউরোপ নয়, দক্ষিণ আমেরিকা?
বাংলাদেশে জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ডস বা ইংল্যান্ডের সমর্থক নেই, তা নয়। কিন্তু দেশজুড়ে আবেগের তীব্রতায় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সঙ্গে তাদের তুলনা কঠিন। এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে।
প্রথমত, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ দুটির সঙ্গে বাংলাদেশিরা এক ধরনের তৃতীয় বিশ্বের আত্মীয়তা অনুভব করেছে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ধনী ইউরোপীয় ক্ষমতাকেন্দ্র নয়; তারা রাজনৈতিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য, বৈষম্য, স্বপ্ন আর প্রতিভার দেশ। বাংলাদেশও স্বাধীনতার পর দারিদ্র্য, দুর্যোগ, সংগ্রাম পেরিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। তাই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার গল্প দূরের হলেও মানসিকভাবে কাছের মনে হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ইউরোপীয় দলগুলো অনেক সময় শৃঙ্খলা, কৌশল, শক্তি ও আধিপত্যের প্রতীক। দক্ষিণ আমেরিকান দলগুলোকে বাংলাদেশিরা দেখেছে আবেগ, শিল্প, বিদ্রোহ ও সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে। ব্রাজিলের আনন্দ আর আর্জেন্টিনার নাটকীয়তা—এই দুই রং বাংলাদেশের ফুটবল-মনস্তত্ত্বকে ভাগ করে নিয়েছে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের বিশ্বকাপ-দেখার প্রথম বড় স্মৃতিগুলোই তৈরি হয়েছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে। কোনো জাতির ফুটবলপ্রেম যুক্তির চেয়ে স্মৃতিতে বেশি টিকে থাকে। যে দলকে প্রথম ভালো লাগে, অনেক সময় সেই দলই সারাজীবনের দল হয়ে যায়।
পতাকা: শুধু কাপড় নয়, সামাজিক ঘোষণা
বাংলাদেশে বিশ্বকাপ মানেই পতাকা। বাড়ির ছাদ, দোকানের সামনে, স্কুলের দেয়াল, গ্রামীণ রাস্তা—সবখানে দেখা যায় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের রং। কেউ বাড়ি রাঙান ব্রাজিলের সবুজ-হলুদে, কেউ পুরো গ্রাম সাজান আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদায়। অনেক সময় পতাকা এত বড় হয় যে সেটিই সংবাদ হয়ে যায়।
পতাকা এখানে শুধু সমর্থনের চিহ্ন নয়; এটি সামাজিক ঘোষণা। আপনি কোন দল করেন, তা দিয়ে বন্ধুত্ব, ঠাট্টা, তর্ক, কখনো পারিবারিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও তৈরি হয়। এক ভাই আর্জেন্টিনা, আরেক ভাই ব্রাজিল; বাবা ব্রাজিল, ছেলে আর্জেন্টিনা; স্বামী-স্ত্রী আলাদা দল—এসব গল্প বাংলাদেশে খুব সাধারণ।
এখানেই এই আবেগের সুন্দর ও বিপজ্জনক দুই দিক দেখা যায়। ফুটবল আনন্দ দেয়, মানুষকে একত্র করে, কিন্তু অন্ধ উত্তেজনা কখনো কখনো সংঘর্ষ, দুর্ঘটনা, প্রাণহানির কারণও হতে পারে, হয়েছেও। তাই বিশ্বকাপের আবেগ যত বড়, দায়িত্বও তত বড়।
মেসি যুগ: দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে কান্না
ম্যারাডোনার পর বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-সমর্থনের সবচেয়ে বড় আবেগের নাম লিওনেল মেসি। বার্সেলোনার জাদু, ছোটখাটো শরীর, শান্ত স্বভাব, বারবার জাতীয় দলের হয়ে ব্যর্থতা, ফাইনালে হারা, অবসর ঘোষণা, ফিরে আসা—সব মিলিয়ে মেসি বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক ধরনের কষ্টের নায়ক হয়ে ওঠেন।
বাংলাদেশের মানুষ মেসির ব্যর্থতাকে নিজের দুঃখের মতো নিয়েছে। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, কোপা আমেরিকার হতাশা—এসবের পর মেসির চোখের কান্না বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণের আবেগ হয়ে উঠেছিল। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের পর সেই অপেক্ষা কিছুটা শেষ হয়। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যখন ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, তখন বাংলাদেশজুড়ে মহোৎসব হয়েছিল৷
মেসির বিশ্বকাপজয় শুধু আর্জেন্টিনার জয় ছিল না; বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-সমর্থকদের কাছে এটি ছিল বহু বছরের অপূর্ণতার সমাপ্তি। তারা যেন নিজেরাই জিতেছে। সামাজিক মাধ্যমে, রাস্তায়, চায়ের দোকানে, ক্যাম্পাসে—সব জায়গায় সেই আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে।
এই আবেগ আর্জেন্টিনাতেও নজর কাড়ে। ২০২২ বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের মানুষের আর্জেন্টিনা-সমর্থন নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়। পরে ২০২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ৪৫ বছর পর আর্জেন্টিনার দূতাবাস আবার চালু হয়; ১৯৭৮ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই দূতাবাস পুনরায় খোলার পেছনে দুই দেশের সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-ভালোবাসাও আলোচনায় আসে।
ব্রাজিলের অপেক্ষা, নরওয়ের রাতে ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন
আর্জেন্টিনা ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জিতে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটালেও ব্রাজিলের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হয়েছে। ২০০২ সালের পর ব্রাজিল আর বিশ্বকাপ জেতেনি। তবু বাংলাদেশে ব্রাজিল-সমর্থন কমেনি। কারণ ব্রাজিলকে বাংলাদেশিরা শুধু ট্রফির কারণে ভালোবাসে না; ভালোবাসে খেলার ধরনের জন্য, ঐতিহ্যের জন্য, হলুদ জার্সির আলোর জন্য।
কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই হলুদ আলো আরেকবার থেমে গেল৷ সোমবার শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে ব্রাজিল বিদায় নিয়েছে। ম্যাচের একটা বড় সময় পর্যন্ত ব্রাজিলের সামনে সুযোগ ছিল। পেনাল্টি পেয়েও কাজে লাগাতে পারেনি। তারপর শেষ দশ মিনিটে আর্লিং হলান্ড যেন একাই ব্রাজিলের স্বপ্নের ওপর বরফের দরজা টেনে দিলেন। তাঁর দুই গোল নরওয়েকে নিয়ে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে, আর পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে পাঠিয়ে দিল বাড়ি।
যোগ করা সময়ে নেইমার পেনাল্টি থেকে গোল করেছিলেন। কিন্তু সেই গোল ছিল বেশি করে সান্ত্বনার, কম করে প্রত্যাবর্তনের। স্কোরলাইন তখনও বলছিল—ব্রাজিল ১, নরওয়ে ২। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মাঠের এক পাশে নরওয়ের উল্লাস, অন্য পাশে ব্রাজিলের নিঃশব্দতা। নেইমারের চোখের জল যেন শুধু একজন খেলোয়াড়ের কান্না ছিল না; বাংলাদেশের অসংখ্য ব্রাজিল-সমর্থকের রাতজাগা অপেক্ষারও কান্না ছিল।
এ বিদায় আরও ভারী, কারণ ১৯৯০ সালের পর ব্রাজিল প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই থেমে গেল। যে দলকে ঘিরে বাংলাদেশের বহু বাড়ির ছাদে পতাকা উঠেছিল, যে হলুদ জার্সি দেখে অনেক শিশু প্রথম ফুটবল ভালোবেসেছিল, সেই দল এবার পথ হারাল শেষ ষোলোতেই। তবু এই হারেও ব্রাজিল-সমর্থনের শেষ নেই। কারণ বাংলাদেশের ব্রাজিলভক্তরা শুধু জয়ের সমর্থক নয়; তারা স্মৃতির সমর্থক, সৌন্দর্যের সমর্থক, বহু প্রজন্ম ধরে বলা এক গল্পের সমর্থক।
১৯৯৪ সালে রোমারিও-বেবেতো, ২০০২ সালে রোনালদো-রিভালদো-রোনালদিনিও—এই জুটিগুলো বাংলাদেশের টেলিভিশন-প্রজন্মের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। রোনালদোর চুলের কাট, গোলের পর হাত ছড়ানো উদ্যাপন, রোনালদিনিওর হাসি—এসব শুধু খেলার মুহূর্ত ছিল না; এগুলো ছিল স্মৃতির ছবি।
ব্রাজিল-সমর্থকেরা আজও বললেন, ‘ব্রাজিল মানে সুন্দর ফুটবল।’ হয়তো বাস্তব ফুটবল অনেক বদলেছে, হয়তো ব্রাজিল আগের মতো নেই, তবু স্মৃতির ব্রাজিল এখনও সেই আগের মতোই বেঁচে আছে বাংলাদেশে। ২০২৬ সালের নরওয়ের রাত সেই স্মৃতিকে আহত করেছে, মুছে দেয়নি। ফুটবলে স্মৃতি কখনো কখনো বর্তমানের চেয়েও শক্তিশালী।
স্যাটেলাইট টিভি থেকে ফেসবুক: আবেগের নতুন মঞ্চ
নব্বই দশক ও দুই হাজারের দশকে স্যাটেলাইট টিভি আসার পর বিশ্ব ফুটবল বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। আগে বিশ্বকাপ ছিল চার বছর পরপর দেখা এক মহোৎসব; পরে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবল, কোপা আমেরিকা, প্রীতি ম্যাচ, চ্যাম্পিয়নস লিগ—সবই দেখার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু আশ্চর্য হলো, ক্লাব ফুটবলে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বা লিভারপুলের সমর্থন বাড়লেও বিশ্বকাপে আবার ফিরে আসে পুরোনো দুই রং—আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল।
সোশ্যাল মিডিয়া এই আবেগকে আরও বিস্ফোরিত করেছে। আগে চায়ের দোকানে যে তর্ক হতো, এখন তা ফেসবুক পোস্ট, মিমস, রিলস, কমেন্ট যুদ্ধ ও প্রোফাইল ছবিতে চলে গেছে। ম্যাচের আগে বিশ্লেষণ, ম্যাচের পরে ট্রল, হারলে নীরবতা, জিতলে রাতভর স্ট্যাটাস—বাংলাদেশের বিশ্বকাপ এখন মাঠের বাইরেও খেলা হয়।
ব্রাজিলের নরওয়ে-বিদায়ের রাতও তাই শুধু মাঠে শেষ হয়নি। বাংলাদেশের ফেসবুকে শেষ বাঁশির পর শুরু হয়েছে আরেক খেলা—কেউ কাঁদছে, কেউ ঠাট্টা করছে, কেউ বলছে “চার বছর পর আবার”, কেউ আবার পুরোনো রোনালদো-রোনালদিনিওর ভিডিও শেয়ার করে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। ফুটবল এখানে জয়-পরাজয়ের খবর নয়; এটি সামাজিক আবেগের ভাষা।
এই অনলাইন সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মকে আবারও আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের দিকে টেনে নিয়েছে। তারা হয়তো পেলে বা ম্যারাডোনাকে দেখেনি, কিন্তু ইউটিউবে তাদের হাইলাইট দেখেছে। তারা মেসি-নেইমারকে লাইভ দেখেছে। তাই পুরোনো আবেগ নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন রূপ পেয়েছে।
পরিবারে পরিবারে দল: উত্তরাধিকার ও বিদ্রোহ
বাংলাদেশে অনেকেই দল বেছে নেয় না; দল তাকে বেছে নেয়। বাবা যে দলের, সন্তানও অনেক সময় সেই দলের। আবার অনেক পরিবারে এর উল্টোটাও আছে—বাবা ব্রাজিল, ছেলে আর্জেন্টিনা; ভাই আর্জেন্টিনা, বোন ব্রাজিল। এই দলভাগ কখনো ঝগড়া, কখনো মজা, কখনো পারিবারিক উৎসব।
শিশুর গায়ে মেসির জার্সি, স্কুলব্যাগে নেইমারের স্টিকার, জন্মদিনের কেকে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার রং—এসব দেখায় ফুটবল এখানে শুধু খেলা নয়, পারিবারিক সংস্কৃতি। বিশ্বকাপ এলে পরিবারের পুরোনো গল্পগুলোও ফিরে আসে—“১৯৮৬ সালে আমরা এভাবে খেলা দেখেছিলাম”, “২০০২ সালে রোনালদো কী খেলেছিল”, “২০১৪ ফাইনালে কী কষ্ট পেয়েছিলাম।”
এবার সেই গল্পে যোগ হলো আরেকটি দুঃখের লাইন—২০২৬ সালে নরওয়ের কাছে ব্রাজিল হেরে গিয়েছিল।” হয়তো কোনো ব্রাজিল-সমর্থক বাবা এই কথা বলতে বলতে ছেলের সামনে দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন। হয়তো কোনো আর্জেন্টিনা-সমর্থক ভাই মজা করবে। কিন্তু কয়েক দিন পর আবার সেই একই মানুষ ব্রাজিলের পুরোনো গোল দেখবে, হলুদ জার্সিটা ভাঁজ করে রেখে দেবে পরের বিশ্বকাপের আশায়।
এভাবে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল বাংলাদেশে শুধু বিদেশি দল নয়; তারা হয়ে উঠেছে পারিবারিক স্মৃতির অংশ।
স্থানীয় ফুটবলের পতন, বিদেশি স্বপ্নের উত্থান
এই আবেগের ভেতরে একটি বেদনার গল্পও আছে। বাংলাদেশ একসময় ফুটবলপাগল দেশ ছিল। ক্লাব ফুটবল ছিল জনপ্রিয়, জাতীয় দলের ম্যাচেও উত্তেজনা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ফুটবলের মান, সংগঠন, দর্শকসংস্কৃতি, মাঠ—সবকিছু দুর্বল হয়েছে। অন্যদিকে ক্রিকেট আন্তর্জাতিক সাফল্য এনে দেওয়ায় জাতীয় আবেগের বড় অংশ ক্রিকেটে চলে যায়।
ফুটবলপাগল মানুষ তবু ফুটবল ছাড়েনি। তারা স্থানীয় ফুটবলে যে স্বপ্ন খুঁজে পায়নি, বিশ্বকাপে তা খুঁজেছে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলে। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে নেই, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বকাপ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়নি। বরং অন্যের সাফল্যে নিজের আনন্দ বসিয়েছে।
এখানে প্রশ্ন আছে—এই বিপুল ফুটবলপ্রেমকে কি বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়নে ব্যবহার করা যায় না? যে দেশে মানুষ রাত জেগে মেসির জন্য কাঁদে, নেইমারের জন্য তর্ক করে, ব্রাজিলের পতাকা বানাতে টাকা খরচ করে, আর্জেন্টিনার জয়ে মিছিল করে—সে দেশে ফুটবল একেবারে মৃত হতে পারে না। সমস্যা আবেগের অভাব নয়; সমস্যা সেই আবেগকে সংগঠিত করার অভাব।
২০২৬ বিশ্বকাপ: পুরোনো প্রেমের নতুন পরীক্ষা
২০২৬ বিশ্বকাপ বাংলাদেশের সমর্থকদের জন্য আলাদা আবেগ নিয়ে এসেছে। আর্জেন্টিনার জন্য এটি মেসির শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে—এই ভাবনাই আর্জেন্টিনা সমর্থকদের আবেগ আরও তীব্র করেছে। অন্যদিকে ব্রাজিল সমর্থকেরা শিরোপা-খরার অবসানের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু নরওয়ের কাছে শেষ ষোলোতে হেরে সেই অপেক্ষা এখন আরও দীর্ঘ হলো।
এখন বাংলাদেশের ব্রাজিল-সমর্থকদের জন্য বিশ্বকাপের বাকি দিনগুলো অন্য রকম। খেলা থাকবে, গোল থাকবে, আর্জেন্টিনার ম্যাচ থাকবে, অন্য বড় দলের লড়াই থাকবে; কিন্তু হলুদ জার্সির মানুষগুলোর জন্য উৎসবের ভেতরে একটু শূন্যতা থেকে যাবে। চায়ের দোকানে তারা হয়তো আগের মতো জোরে তর্ক করবে না। ফেসবুকে হয়তো কিছুদিন কম লিখবে। কিন্তু ফুটবলের প্রেমে এই নীরবতাও একধরনের ভাষা।
দলের জয়-পরাজয়ের বাইরেও ২০২৬ বিশ্বকাপ আবার প্রমাণ করছে, বাংলাদেশ এখনও ফুটবল ভালোবাসে। স্থানীয় মাঠে দর্শক কমে যেতে পারে, জাতীয় দলের সাফল্য না-ও থাকতে পারে, কিন্তু বিশ্বকাপ এলে দেশের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ফুটবলপ্রেম জেগে ওঠে। এই জেগে ওঠা শুধু খেলার নয়; এটি স্মৃতির, পরিচয়ের, উৎসবের।
শেষ কথা: দূরের দুই দেশ, খুব কাছের আবেগ
বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থনকে অনেকে মজা করে দেখে, কেউ কেউ বাড়াবাড়ি বলে। কিন্তু একটু গভীরে গেলে দেখা যায়, এটি শুধু বিদেশি দলের প্রতি অন্ধ ভক্তি নয়। এর ভেতরে আছে ইতিহাস, গণমাধ্যম, ঔপনিবেশিক স্মৃতি, দরিদ্র দেশের আত্মমর্যাদা, পারিবারিক উত্তরাধিকার, সামাজিক উৎসব এবং ফুটবলের সেই অনির্বচনীয় সৌন্দর্য, যা ভাষা-ভূগোল-রাজনীতি অতিক্রম করতে পারে।
ব্রাজিল বাংলাদেশিদের শিখিয়েছে, আনন্দ দিয়েও জেতা যায়। আর্জেন্টিনা শিখিয়েছে, ক্ষত নিয়েও লড়াই করা যায়। পেলে দেখিয়েছেন দারিদ্র্য পেরিয়ে রাজা হওয়া যায়। ম্যারাডোনা দেখিয়েছেন ছোট মানুষও সাম্রাজ্যের চোখে চোখ রাখতে পারে। মেসি দেখিয়েছেন দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে কান্নাও জয়ে বদলে যেতে পারে। আর ২০২৬ সালের নরওয়ের রাত মনে করিয়ে দিল—সবচেয়ে প্রিয় দলও কখনো হেরে যায়, কিন্তু ভালোবাসা সব সময় স্কোরলাইনে শেষ হয় না।
তাই বিশ্বকাপের রাতে বাংলাদেশের কোনো গ্রামে যখন একটি শিশু বাবার পুরোনো আর্জেন্টিনা জার্সি পরে টিভির সামনে বসে, অথবা কোনো মফস্বলে এক তরুণ ব্রাজিলের পতাকা টাঙিয়ে হারের পরও খুলে ফেলতে দেরি করে, তখন তারা শুধু একটি বিদেশি দলকে সমর্থন করে না। তারা আসলে ফুটবলের ভেতর দিয়ে নিজেদের স্বপ্ন, নিজেদের বেদনা, নিজেদের উৎসবকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়।
বাংলাদেশ বিশ্বকাপে নেই—এ কথা পরিসংখ্যানের সত্য। কিন্তু বিশ্বকাপ বাংলাদেশে নেই—এ কথা ঘুণাক্ষরেও সত্য নয়।