Image description

আপনার ঘরের টবের গাছটি যদি সামান্য অযত্নেই মরে যায়, তবে একটু সান্ত্বনা পেতে পারেন এই ভেবে যে— সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর উদ্ভিদ জগৎ কিন্তু সহজে বিলুপ্ত হচ্ছে না। এমনকি কোটি কোটি বছর পর সূর্যের তীব্র তাপে যখন পৃথিবীর মহাসাগরগুলো ফুটতে শুরু করবে, তখনও হয়তো টিকে থাকবে সবুজ উদ্ভিদ।

সম্প্রতি ‘জার্নাল অফ জিওফিজিক্যাল রিসার্চ: অ্যাটমোসফিয়ারস’ নামক সাময়িকীতে প্রকাশিত দুই গ্রহ বিজ্ঞানীর একটি গবেষণাপত্রে এমনটাই দাবি করা হয়েছে।
তারা বিভিন্ন জলবায়ু মডেল ব্যবহার করে পৃথিবীর উদ্ভিদ জগতের সর্বোচ্চ আয়ুষ্কাল পরিমাপ করার চেষ্টা করেছেন।

গবেষণার সিমুলেশন বা কৃত্রিম পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পৃথিবীর শেষ উদ্ভিদটি আজ থেকে প্রায় ১৮৭ কোটি বছর পর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। আজ থেকে প্রায় ২০০ কোটি বছর পর আমাদের সূর্য বর্তমানের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি উজ্জ্বল এবং উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। সূর্যের এই অতিরিক্ত তাপ ও আলো সরাসরি উদ্ভিদ জগতকে পুড়িয়ে মারবে অথবা তাদের শ্বাসরোধ করে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেবে।

বর্তমানে পৃথিবীর মোট প্রাণের প্রায় ৮০ শতাংশই উদ্ভিদের দখলে। তাই টিকে থাকার জন্য উদ্ভিদের প্রচুর সূর্যালোক, পানি ও কার্বন ডাই অক্সাইড প্রয়োজন। কিন্তু সূর্য ক্রমাগত উত্তপ্ত হতে থাকলে পৃথিবী কতদিন এই উপাদানগুলোর জোগান ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়েই গবেষণাটি করা হয়েছে।

সিয়াটল-ভিত্তিক অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ব্লু মার্বেল স্পেস’-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী জ্যাকব হাক-মিসরা এবং গ্রহ জলবায়ু বিজ্ঞানী এরিক উলফ এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন। তারা একটি ত্রিমাত্রিক মডেল ব্যবহার করে আগামী ২০০ কোটি বছরে পৃথিবীর জলবায়ু কেমন হতে পারে তা হিসাব করেছেন।

এই মডেলে সূর্যের ক্রমবর্ধমান উজ্জ্বলতা এবং বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্বের পরিবর্তনের বিষয়টি নিখুঁতভাবে ধরা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখানে মানুষের তৈরি কার্বন নিঃসরণকে বাদ দিয়ে পৃথিবীর প্রাকৃতিক কার্বোনেট-সিলিকেট চক্র বিবেচনা করেছেন।

এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই অক্সাইড প্রতিনিয়ত সাগরে মিশে যায়, সমুদ্রের তলদেশে এটি পাথরে রূপান্তরিত হয়ে জমা হয় এবং পরবর্তীতে টেকটনিক প্লেটের চলন ও আগ্নেয়গিরির উদগিরণের মাধ্যমে আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে।

যেহেতু পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে এই শিলা ক্ষয় বা অবক্ষয় প্রক্রিয়াটি কতটা শক্তিশালী হবে তা নিশ্চিত নয়, তাই গবেষকরা দুটি ভিন্ন পরিস্থিতি ধরে সিমুলেশন চালিয়েছেন।

প্রথম পরিস্থিতি তথা শক্তিশালী অবক্ষয় মডেলে পৃথিবীর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে, কিন্তু বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ ক্রমাগত কমতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে কার্বনের অভাবে গাছপালা খাদ্য তৈরি করতে পারবে না এবং আজ থেকে প্রায় ১৮৪ কোটি বছর পর উদ্ভিদ জগৎ ধ্বংস হয়ে যাবে।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় পরিস্থিতি তথা দুর্বল অবক্ষয় মডেলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা স্থিতিশীল থাকে, কিন্তু পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যখন ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) স্পর্শ করবে, তখন কোনো স্থলজ উদ্ভিদ আর বেঁচে থাকতে পারবে না। এই মডেল অনুযায়ী উদ্ভিদের সর্বোচ্চ আয়ুষ্কাল দাঁড়ায় প্রায় ১৮৭ কোটি বছর, যা পূর্ববর্তী অনেক গবেষণার চেয়েও বেশি।

গবেষকদের মতে, পৃথিবীর সালোকসংশ্লেষণকারী উদ্ভিদ জগৎ ততক্ষণ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে, যতক্ষণ না পৃথিবী তার সমস্ত পানি হারাতে শুরু করছে। অর্থাৎ, উদ্ভিদের সর্বোচ্চ আয়ুষ্কাল পৃথিবীর মহাসাগরগুলোর টিকে থাকার মেয়াদের সমান।

তবে এই গবেষণার একটি বড় সীমাবদ্ধতা বা চমকপ্রদ দিক হলো— গবেষকরা এখানে উদ্ভিদের ভবিষ্যৎ বিবর্তন কিংবা মানুষের উন্নত প্রযুক্তির প্রভাবকে হিসাবের বাইরে রেখেছিলেন। বাস্তব পৃথিবীতে এই দুটি বিষয় উদ্ভিদের আয়ু আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

ভবিষ্যতের জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে উদ্ভিদ নিজের তাপমাত্রা এবং চাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে গাছপালা উঁচু পাহাড়ে, এমনকি স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার বা বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগের বায়বীয় পরিবেশেও মানিয়ে নিতে পারে।

সেখান থেকে উদ্ভিদের বীজ বা জীবনকণা কম মহাকর্ষীয় বস্তু যেমন— ধূমকেতু, চাঁদ কিংবা মহাশূন্যের অন্যান্য স্থানেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়া মানুষ বা ভবিষ্যতের কোনো বুদ্ধিমান সভ্যতা চাইলে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারে।

যেমন বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে প্রতিফলক অ্যারোসল ছিটানো, মহাকাশে বিশাল সানশেড বা ছাতা স্থাপন করে সূর্যরশ্মি আটকে পৃথিবীকে শীতল রাখা, পৃথিবীকে ঠেলে সূর্য থেকে আরও দূরের কোনো কক্ষপথে নিয়ে যাওয়া অথবা সূর্যের ভর নিয়ন্ত্রণ করে তার তাপমাত্রা ও উজ্জ্বলতা স্থির রাখা।
যদিও কোটি কোটি বছর পরের ভবিষ্যৎ নিশ্চিতভাবে বলা অসম্ভব, তবুও এই গবেষণা আমাদের আশাবাদী করে।

ইতিহাসে দেখা গেছে, আজ থেকে ৫ কোটি ৬০ লাখ বছর আগেও তীব্র তাপমাত্রার কারণে পৃথিবীতে উদ্ভিদের বিকাশ থমকে গিয়েছিল, কিন্তু জীবন সবসময়ই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। গবেষকরা উপসংহারে বলেছেন যে, পৃথিবীর জীবন অত্যন্ত সহনশীল।

উচ্চ তাপমাত্রা বা কার্বন ডাই অক্সাইডের অভাবজনিত কারণে উদ্ভিদের যে সীমাবদ্ধতা আমরা আজ দেখছি, তা ভবিষ্যতের উদ্ভিদের জন্য চূড়ান্ত কোনো সীমা নাও হতে পারে। তারা মূলত এটাই বলতে চেয়েছেন যে, আমাদের গ্রহের মূল ভবিষ্যৎ অনুযায়ী জীবন অন্তত ততদিন টিকে থাকবে, যতদিন এই পৃথিবী টিকে থাকবে।