দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠাগারে তিনটি নির্দিষ্ট বই রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুটি বই প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে নিয়ে লেখা এবং একটি লিখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গত ৩ জুন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে (ডিপিই) এ বিষয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠাগারে যেন এই তিনটি বইয়ের অন্তত এক সেট রাখা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বই তিনটি হলো ‘প্রেসিডেন্ট জিয়া: রাজনৈতিক জীবনী’, ‘বেগম খালেদা জিয়া: জীবন ও সংগ্রাম’ এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
মাহফুজ উল্লাহর লেখা প্রথম দুটি বই জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জীবনী এবং তৃতীয় বইটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের লেখা। তিনটি বই-ই জাতীয়তাবাদী প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে স্বাক্ষরকারী উপসচিব রোশন আরা পলি দ্য ডেইলি স্টারকে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তবে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
যোগাযোগ করা হলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহিনা ফেরদৌসী বলেন, অধিদপ্তর শুধু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাটি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠাগারে ওই তিনটি বইয়ের এক সেট রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। চিঠিটি আমার কাছে আসার পর আমরা কেবল তা অনুমোদন করে মাঠপর্যায়ে পাঠিয়ে দিয়েছি।’
আগের সরকারের সময়ে যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বই রাখা হতো, এই পদক্ষেপ অনেকটা সে রকম কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ই হলো নীতিনির্ধারক কর্তৃপক্ষ। আমরা শুধু তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করি এবং তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করি। যেহেতু প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনাটি আমার কাছে এসেছে, আমি শুধু তা অনুমোদন করেছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, স্কুল পাঠাগারে কোনো একটি রাজনৈতিক ঘরানার নয়, বরং দেশের সব বড় জাতীয় নেতাদের বই রাখা উচিত।
তিনি বলেন, সম্পূরক পাঠ্য হিসেবে স্কুল পাঠাগারে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার বই থাকতেই পারে। তবে প্রশ্ন হলো অন্য জাতীয় নেতাদের বই কেন অন্তর্ভুক্ত করা হলো না।
রাশেদা কে চৌধুরী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘একজন নাগরিক হিসেবে আমি সব সময় ভারসাম্য চাই। আমাদের শিক্ষার্থীদের এবং নতুন প্রজন্মকে অবশ্যই সঠিক ইতিহাস জানতে হবে। শুধু এই তিনজন কেন? মওলানা ভাসানী কেন নয়? জেনারেল ওসমানী কেন নয়? চার জাতীয় নেতা কেন নয়? সবকিছুই থাকুক। নতুন প্রজন্ম যথেষ্ট বুদ্ধিমান, তারাই সিদ্ধান্ত নেবে।’
তিনি আরও বলেন, জিয়াউর রহমানের অবদান ঢেকে রাখা হয়েছিল এবং শিক্ষার্থীদের অবশ্যই তার সম্পর্কে জানতে হবে। তবে অন্যদের অবদানও তুলে ধরা উচিত। তার মতে, বিষয়টিকে আবারও একতরফা করা উচিত নয়। ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
এ সিদ্ধান্তের পেছনে কারণ জানতে গত রাতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে দ্য ডেইলি স্টার। তবে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি তিনি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. শাখাওয়াত হোসেনও ফোন ধরেননি।
উল্লেখ্য, এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর লেখা বই ও উপকরণ নিয়ে একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে ক্ষমতাসীন দলের বয়ান প্রচার করার অভিযোগে সে সময় বিষয়টি বেশ সমালোচিত হয়।
২০১৯ সালের আগস্ট মাসে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর দেশের সব সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য ২৭টি বই কেনার নির্দেশ দেয়। ওই ২৭টি বই-ই ছিল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত।
২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ছেপেছিল জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
এ ছাড়া ২০১৪ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এক আমলার লেখা বঙ্গবন্ধুর ওপর তিনটি বই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সংগ্রহ করার জন্য বলেছিল। ২০১৭ সালের জুন মাসে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়-বিষয়ক তৎকালীন সংসদীয় স্থায়ী কমিটি প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ও অফিসে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি প্রদর্শনের সুপারিশ করেছিল।