Image description

নতুন বেতন স্কেলে নতুন নিয়মে ইনক্রিমেন্ট পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা। এক্ষেত্রে উচ্চ গ্রেডের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি সুবিধা ভোগ করবেন নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর মধ্য দিয়ে বাতিল হবে পুরনো পদ্ধতির সব গ্রেডে একই হারে ইনক্রিমেন্ট।

নবম বেতন স্কেলের প্রাথমিক খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সম্ভাব্য ইনক্রিমেন্ট মূল বেতনের ৫ শতাংশ। আর পঞ্চম গ্রেডের ইনক্রিমেন্ট ৪ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেডের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। এ ছাড়া দ্বিতীয় গ্রেডে হচ্ছে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং প্রথম গ্রেড নির্ধারিত থাকছে। বর্তমান স্কেলে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট সব গ্রেডে গড়ে ৫ শতাংশ কার্যকর আছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

সূত্র জানাচ্ছে, চাকরিজীবীদের ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের আগে সরকার সারা দেশে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ জন চাকরিজীবী, ৬১ হাজার ৫০০ জন সাধারণ নাগরিক ও ৩ হাজার ৫১৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের মতামত নিয়েছে। মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বর্তমান পদ্ধতির পক্ষে ছিলেন। অন্যদিকে ৫০ দশমিক ৪৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করা উচিত বলে মত দিয়েছেন। আর ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেছেন, জীবনযাত্রার খরচ অনুযায়ী মূল বেতনের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ভিত্তি হওয়া উচিত। তবে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের বার্ষিক বেতন বাড়ানোর হার বেশি হওয়া উচিত বলে মনে করছেন ৭৯ দশমিক ০৫ শতাংশ।

জানা গেছে, খসড়া চূড়ান্ত করতে এখন পুরোদমে কাজ করছে পে-স্কেল পর্যালোচনা সংক্রান্ত সচিব কমিটি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়। শিগগিরই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে, যা কার্যকর হবে ১ জুলাই থেকে। তবে এর আগে বেতন স্কেলের যৌক্তিকতা, ইনক্রিমেন্ট ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অফলাইন এবং অনলাইন জরিপ পরিচালনা করেছে সরকার। সে মতামতের ওপর ভিত্তি করেই অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে চিকিৎসা ভাতা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছিল। সেটি কমিয়ে ৩ হাজার টাকায় আনা হচ্ছে। আর সন্তানদের জন্য মাসিক শিক্ষা ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকা ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে কমিশনের সুপারিশ িছল ২ হাজার টাকা।

এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বেতন স্কেল বাড়ানোর পাশাপাশি বেতন কমিশনের সুপারিশের তুলনায় কিছু ভাতার হার কমানো হচ্ছে। তবে বর্তমান হারের তুলনায় সেটি বেশি। অবশ্য সব ধরনের ভাতা কার্যকর হবে ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে। প্রথম ধাপে অর্থাৎ মূল বেতনের শতভাগ দেওয়া হবে। পরবর্তী অর্থবছরে দেওয়া হবে ভাতা।

অষ্টম বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন সাবেক সিনিয়র অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, অতীতে চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো দুই ধাপে বাস্তবায়নের একাধিক রেকর্ড আছে। ফলে নবম পে-স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়ন নতুন কিছু নয়। মূলত আর্থিক সীমাবদ্ধতা থেকেই এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। বেতন স্কেল বাস্তবায়নে মূল্যস্ফীতি হয়— এমন নজির নেই। তবে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হবে, সেটি মেটাতে রাজস্ব আহরণে বেশি নজর দিতে হবে, যোগ করেন তিনি।

জানা গেছে, জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, নবম বেতন কাঠামোতে প্রথম গ্রেডের েবতন ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার এবং ২০তম গ্রেডের েবতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সর্বশেষ পে-স্কেল পর্যালোচনা সংক্রান্ত সচিব কমিটি প্রথম গ্রেডের বেতন ১ লাখ ৫০ হাজারে নামিয়ে আনার বিষয়টি পর্যালোচনা করছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া সর্বনিম্ন গ্রেডে ২০ হাজার টাকা থেকে কিছুটা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বেতন কমিশন নতুন স্কেলের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৮ ধরে করেছে। সেটি কমিয়ে সচিব কমিটি ১:৭.৫ করার চিন্তা করছে। তবে ১৯৭৩ সালে প্রথম বেতন কমিশনে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন অনুপাত ছিল ১:১৫.৪। আর সর্বশেষ ২০১৫ সালে বেতন কমিশনে তা ছিল ১:৯.৪।

সরকারের জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মরত ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০, বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে সর্বমোট বেতন-ভাতা হয় ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা। নতুন বেতন স্কেলে ২০তম গ্রেডের সম্ভাব্য কর্মচারীর মূল বেতন (২০ হাজার টাকা) ও ভাতা মিলে সর্বমোট বেতন-ভাতা হবে ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা।

একইভাবে ১৯তম গ্রেড থেকে ১নং গ্রেড পর্যন্ত ভাতা অনেক বাড়বে। তবে যুক্তিসংগত বিবেচনা ও সমতা বিধানের স্বার্থে এই বাড়ার হার তুলনামূলকভাবে কম হবে। কিছু কিছু ভাতা আছে, যা দশম বা ১১তম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা পেয়ে থাকেন। যেমন যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা, ধোলাই ভাতা, ঝুঁকিভাতা (যার যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)। এজন্য প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ভাতা বৃদ্ধির হার কমানো হচ্ছে।

এদিকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আগে সরকার অনলাইন জরিপ করেছে ৪ হাজার ১৪৩ জনের ওপর। সেখানে মাত্র ৪৯ জন, অর্থাৎ ১ দশমিক ১৮ শতাংশ মনে করছেন বর্তমান বেতন কাঠামোকে মাসিক প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে যথেষ্ট। বিপরীতে ৪ হাজার ৯৪ জন বা প্রায় ৯৯ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, বিদ্যমান বেতন দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ সম্ভব হচ্ছে না।

সেই জরিপে প্রশ্ন ছিল— বেতন কতটা বৃদ্ধি করা উচিত। জবাবে ৪ হাজার ৫৫ জনের মতামতের মধ্যে ৮৭ শতাংশ উত্তরদাতা বেতন বৃদ্ধির পক্ষে মত দিয়েছেন। আরও ১০ শতাংশ উত্তরদাতা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছেন। একই সঙ্গে অনেকেই সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৪ বা ১:৫ নির্ধারণ এবং ১৮ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন পুনর্গঠন ও একীভূত করার সুপারিশ করেছেন।

এদিকে বিবিএস পরিচালিত ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে-২০২৫’-এ দেশের জীবনযাত্রার ব্যয়ের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের গড় সদস্য সংখ্যা ৪ দশমিক ১৬ জন এবং গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। গ্রামীণ এলাকায় এই ব্যয় ৩২ হাজার ৫৩২, শহরে ৩৭ হাজার ৩৪৪ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। ছয় সদস্যের পরিবারের ক্ষেত্রে গড় মাসিক ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৩৪৭ টাকা, যা সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬৬ হাজার ২৫৩ টাকা। ফলে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কর্মচারীদের বাস্তব চাহিদা সামনে রেখে নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের ওপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।