Image description

নাঈমুল আলম মিশু

২০১১ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাশ হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আনা এ সংশোধনীটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম সংবেদনশীল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলা একটি বিল। এই সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের আদি সংবিধানের বেশ কিছু ধারা যেমন পুনরুদ্ধার করা হয়, ঠিক তেমনই এমন কিছু নতুন বিধান যুক্ত করা হয়, যা নিয়ে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও নাগরিক সমাজে তীব্র বিতর্ক রয়েছে।

পঞ্চদশ সংশোধনীর প্রেক্ষাপট কী ছিল

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করতে ‘সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন’ নামে ১৯৯৬ সালের ২৮ মার্চ সংবিধানের সংশোধনী আনা হয়েছিল। ১৯৯৯ সালে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট আবেদন হয়। শুনানি শেষে হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট ত্রয়োদশ সংশোধনীকে ‘বৈধ’ বলে রায় দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখেন। ২০০৫ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালে সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হয়। কিন্তু ওই সময় থেকে এক-এগারোর সরকারের সময় পর্যন্ত বিষয়টি চাপা পড়ে থাকে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর ২০০৫-এ করা আপিলটি মঞ্জুর করে শুনানি শুরু হয়। সরকার গঠনের পর ২০১০ সালে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত জিয়াউর রহমানের শাসনামলে আনা সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে।

সুপ্রিম কোর্টের এ রায়ের পর ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের চরিত্র ফিরিয়ে আনা এবং উচ্চ আদালতের রায়কে সংবিধানে প্রতিফলিত করার লক্ষ্যে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই ২০১১ সালের জুন মাসে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল সংসদে পাশ হয়।

কী কী পরিবর্তন ছিল এ সংশোধনীতে

এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এগুলো ছিল:

সংশোধনীতে সংবিধানে থাকা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা। এর মাধ্যমে পরবর্তী নির্বাচনগুলো দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের পথ উন্মুক্ত করা হয়।

১৯৭২ সালের আদি সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ফিরিয়ে আনা হয়। তবে একই সাথে সংবিধানে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ বহাল রাখা হয় এবং শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির-রহমানির রহিম’ বহাল রাখা হয়।

সংবিধানের ৪(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সব সরকারি অফিসে তাঁর প্রতিকৃতি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়।

সংবিধানের ৭(খ) অনুচ্ছেদ যুক্ত করে বলা হয় যে, সংবিধানের প্রস্তাবনা, মূল অনুচ্ছেদগুলো ও মৌলিক অধিকার-সংক্রান্ত বিষয়গুলো কখনোই সংশোধন করা যাবে না।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ক-তে কোনো ব্যক্তি অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা দখল করলে বা সংবিধান স্থগিত করলে সেটিকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’র অপরাধ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তির (মৃত্যুদণ্ড) বিধান রাখা হয়।

এ ছাড়া জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর পাশাপাশি বাংলাদেশের নাগরিকদের ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

কেন বিতর্ক হয়েছিল

পঞ্চদশ সংশোধনী পাশের পর থেকেই বিরোধী দলসমূহ ও সুশীল সমাজের একটি বড়ো অংশ এর তীব্র বিরোধিতা করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ছিল সবচেয়ে বড়ো বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৯৬ সালে সব দলের ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাতিল করার ফলে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল অভিযোগ করে যে, দলীয় সরকারের অধীনে বাংলাদেশে আর কখনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না। এর ফলে দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বিশ্বাসহীনতার এক দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সরাসরি ফলে বিএনপিসহ বেশির ভাগ দল ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে। এর ফলে ১৫৪ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এক নজিরবিহীন ঘটনা। এরপর ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও দেশে-বিদেশে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়। সমালোচকদের মতে, এই সংশোধনীর মাধ্যমেই দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল।

ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা এবং একই সাথে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ ও ‘বিসমিল্লাহির-রহমানির রহিম’ বহাল রাখাকে অনেক সংবিধান-বিশেষজ্ঞ একটি ‘আইনগত বৈপরীত্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রধর্ম রাখার সমালোচনা করেন, অন্যদিকে রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনার বিরোধিতা করে। এর ফলে উভয় পক্ষ থেকেই এ সংশোধনী সমালোচিত হয়।

সংবিধানের এক-তৃতীয়াংশ অনুচ্ছেদকে চিরতরে সংশোধন-অযোগ্য ঘোষণা করা নিয়ে তীব্র আইনি বিতর্ক তৈরি হয়। আইনবিদদের মতে, একটি সংসদ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংবিধানকে একদম অবরুদ্ধ করে দিতে পারে না। এটি সংসদীয় গণতন্ত্রের সার্বভৌমত্বের ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। অনেকে অভিযোগ করেন, ভবিষ্যতে যেন কেউ এ সংশোধনীগুলো পরিবর্তন করতে না পারে, সে জন্যই এমন রক্ষাকবচ তৈরি করা হয়েছিল।

অবৈধ ক্ষমতা দখল রুখতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার ধারা যুক্ত করা হলেও সমালোচকদের দাবি ছিল এটি আসলে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার একটি হাতিয়ার। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা পাকা করে এবং পরে সংবিধান পরিবর্তনের পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাংলাদেশের রাজনীতিতে মেরুকরণকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে ‘গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা’, ‘উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়ন’ ও ‘অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখল বন্ধের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ হিসেবে দাবি করা হলেও, এর রাজনৈতিক পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মধ্য দিয়ে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যকার সমঝোতার পথ বন্ধ হয়ে যায়, যা পরে একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন এবং গভীর রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়। একইসাথে দেশের গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রে এক অচলায়তন তৈরি হয়, যার পরিণতি ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট।