Image description

দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময়ে চলা ফ্যাসিবাদী শাসনামলে লুটপাটের মূল টার্গেট ছিল ব্যাংক খাত। আর এর মধ্যে বেশি লুটপাটের শিকার হয়েছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো। এর ফলে তারল্য সংকটে চরম আর্থিক হুমকির মুখে পড়ে ইসলামিক ব্যাংকগুলো। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেড়িয়ে আসে প্রকৃত চিত্র। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে রীতিমত অপারগ হয়ে পড়েছিল শরিয়াহভিত্তিক ইসলামিক ব্যাংকগুলো।

অন্যদিকে গ্রাহকদেরও আমানতের অর্থ উত্তোলণের চাপ বাড়তে ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশেষ ফান্ড গঠন এবং ধার দিয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনে। এছাড়া আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে গঠন করা হয় ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। সবমিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর সবধরনের লেনদেন স্বাভাবিক রাখতে এবং চাপ নিয়ন্ত্রণে বিশাল অংকের টাকা ধার দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতিসহ বিভিন্ন চাপের কারণে ধারের টাকা ফেরত দিতে পারছে না ব্যাংকগুলো।

তথ্য অনুযায়ী, এই পর্যন্ত শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোকে এক লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। খেলাপি ঋণ আদায়, আমনত ফেরত দেওয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারের টাকার বোঝা, সব মিলিয়ে তীব্র চাপে রয়েছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোকে ১ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তিনভাবে অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংক লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (আইবিএলএফ), মুদারাবাহ লিকুইডিটি সাপোর্ট (এমএলএস) এবং স্পেশাল লিকুইডিটি সাপোর্ট (এসএলএস) এর মাধ্যমে এই সহায়তা দেওয়া হয়। মোট সহায়তার মধ্যে আইবিএলএফের অংশ ছিল সর্বাধিক ৮৯.৯৩ শতাংশ এবং এসএলএসের অংশ ছিল ৯.৮৮ শতাংশ। এছাড়া এমএলএসের অংশ ছিল খুবই কম।

২০২৫ সালে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সচল রাখতে ২১ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নিয়মিত তারল্য উপকরণের মাধ্যমে তারল্য সহায়তা থেকে প্রচলিত ব্যাংকগুলো ব্যবহার করেছে ৯১.৮৯ শতাংশ। যেখানে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ ছিল মাত্র ৮.১১ শতাংশ। এছাড়াও, ২০২৫ সালে ১১টি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জরুরি তারল্য সহায়তা (ইএলএ) পেয়েছে, যার মোট পরিমাণ ১৮ হাজার ৩শ’ ৩৩ কোটি টাকা।

‘ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট’ তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ সুদহার, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয় এবং বিনিয়োগে ধীরগতির প্রভাব অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। এদিকে ব্যাংকখাতের ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। ২০২৪ সালে সিআরএআর ছিল ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা নেমে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি কার্যত নির্দেশ করে যে অনেক ব্যাংক তাদের ঝুঁকি মোকাবিলার মতো পর্যাপ্ত মূলধন ধরে রাখতে পারছে না। একই সঙ্গে মূলধন সংরক্ষণ বাফারও শূন্যে নেমে এসেছে। এ সংকটের পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক এবং কয়েকটি বেসরকারি ও ইসলামী ব্যাংক।
ব্যাংকিং খাতের লেভারেজ রেশিও নেতিবাচক হয়ে ৩ দশমিক ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে সম্পদের ওপর মুনাফা (আরওএ) ও ইক্যুইটির ওপর মুনাফা (আরওই) উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

লোকসানে শীর্ষে যেসব ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট’ অনুযায়ী, গত বছর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের নিট লোকসান হয়েছে ৬৬ হাজার ৩শ’ ৮৬ কোটি টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ৩১ হাজার কোটি, এক্সিম ব্যাংকের ২৮ হাজার ৯শ’ ৯ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি এবং ইউনিয়ন ব্যাংক ৪ হাজার ৬শ’ ৮৫ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। সাধারণ ব্যাংকের মধ্যে লোকসানে এর পরের অবস্থানে থাকা এবি ব্যাংকের ৩ হাজার ৭০৬ কোটি, আইএফআইসির ২ হাজার ৫৬১ কোটি, ন্যাশনালের ২ হাজার ৪৩০ কোটি, প্রিমিয়ারের ৯৯৩ কোটি এবং পদ্মা ব্যাংকের ৯৩০ কোটি টাকা নিট লোকসান হয়েছে।

সিআরএআর ঋণাত্মক ৪৩.১৮ শতাংশ
প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংক খাত নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত সিআরএআর নেমে ঋণাত্মক ৪৩ দশমিক ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। যদিও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ব্যাংক বাদ দিলে সিআরএআর দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ, তবুও পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। আমানত প্রবৃদ্ধি কমেছে, বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি কমেছে এবং শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটিও নেতিবাচক হয়েছে।

এছাড়া এসব ব্যাংক বাধ্যতামূলক তারল্য সূচক লিকুইডিটি কভারেজ রেশিও (এলসিআর), নেট স্ট্যাবল ফান্ডিং রেশিও (এনএসএফআর) এবং ইনভেস্টমেন্ট-ডিপোজিট রেশিও (আইডিআর) ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। যেহেতু ইসলামী ব্যাংকগুলো দেশের ব্যাংক ব্যবস্থার বড় অংশ দখল করে আছে, তাই এ খাতের সংকট পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

খেলাপি ঋণই ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে খেলাপি ঋণই রয়ে গেছে। স্ট্রেস টেস্টে দেখা গেছে, খেলাপি ঋণ আরও বাড়লে মূলধন পরিস্থিতি ভয়াবহভাবে অবনতি ঘটবে। বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিও অত্যন্ত বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে করপোরেট খাতে ঋণের উচ্চ ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে। মোট ঋণের প্রায় ৪৬ শতাংশ করপোরেট খাতে কেন্দ্রীভূত, কিন্তু ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ৬৭ শতাংশই এ খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্যাংকের বাইরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। ২০২৫ সালের শেষে এ খাতের খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশে পৌঁছেছে। মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে ঋণাত্মক ২৩ দশমিক ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া মোট আমানত ৭ দশমিক ০৩ শতাংশ কমে গেছে। বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণের কারণে মুনাফাও নেতিবাচক হয়েছে।

শীর্ষনিউজ