Image description

একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু। রাজধানীর মগবাজার আদ-দ্বীন হাসপাতালে তোলপাড়। গত ২৬ মে রাতের এই ঘটনায় জল গড়িয়েছে অনেক দূর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর লাইসেন্স বাতিল করায় থমকে গেছে কার্যক্রম। ওই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল, কেন পরিস্থিতি এতদূর গড়াল, তা নিয়ে স্ট্রিম ছয় নবজাতকের মা-বাবা, সে সময়ে তাদের সঙ্গে থাকা স্বজন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছে।

হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড-২ এ এক মাস আগে মারা যায় তিন মেয়ে ও তিন ছেলে নবজাতক। এক মায়ের যমজ ছেলেসহ প্রত্যেকের বয়স হয়েছিল তিন থেকে চার দিন। সন্তান হারানো মায়েরা জানিয়েছেন, ঠান্ডা লাগায় তাদের অনুরোধে এসি বন্ধ করা হয়। সন্তানেরা কান্না শুরুর পর নার্স ডেকে পাননি। বমি শুরু হলে নিজেরাও খেই হারিয়ে ফেলেন। কান্নাকাটি করলেও চিকিৎসক-নার্সের দেখা মেলেনি। তবে এই ঘটনায় হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলকে এসব মায়েরা সমর্থন করেন না বলে জানিয়েছেন। তাদের চাওয়া, দায়িত্বে যাঁরা অবহেলা করেছেন, তারা শাস্তির আওতায় আসুক। সরকার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যবস্থা নিক।

রোগী আসা থামেনি, সেবায় বিকল্প উদ্যোগ

হাসপাতাল বন্ধ। প্রশ্ন আসে– রোগী আসাও কি বন্ধ? সরেজমিন রোববার (২৮ জুন) মগবাজার আদ-দ্বীনে বেশ কয়েক রোগীর সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। রোগীরা জানান, ফলোআপ চিকিৎসার বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আসতে বলছে। আসার পর অ্যাম্বুলেসে করে জুরাইন পোস্তগোলা আদ-দ্বীন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করছে বিনামূল্যে।

এই-সংক্রান্ত সেবা দিতে হাসপাতালের তিনটি ফটকেই ব্যানার টানানো রয়েছে। তাতে লেখা, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশ মোতাবেক আদ-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মগবাজার–এর সকল সেবা বন্ধ আছে। চলমান সেবার স্বার্থে এই হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স দ্বারা আদ-দ্বীন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল জুরাইন, পোস্তগোলা নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।’

সাভার থেকে আসা শ্রাবণী আক্তার দুপুরে স্ট্রিমকে বলেন, ঈদুল আজহার পরদিন জরুরি প্রসূতিসেবা নিয়েছি। হঠাৎ হাসপাতাল বন্ধে বিপদে পড়ি। যোগাযোগ করলে আসতে বলেন। অ্যাম্বুলেন্সে পোস্তগোলায় নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।’ পরে বিকেলে ফোনে তিনি বলেন, ‘আগে যাঁকে দেখিয়েছি, পোস্তগোলায় তাঁকে পেয়ে ভালো লেগেছে। কিন্তু ভোগান্তি তো হলো।’

হাসপাতালের তিনটি ফটকেই ব্যানার টানানো বিকল্প উপায়ে চিকিৎসাসেবা বিষয়ে। স্ট্রিম ছবিহাসপাতালের তিনটি ফটকেই ব্যানার টানানো বিকল্প উপায়ে চিকিৎসাসেবা বিষয়ে। স্ট্রিম ছবি

সংশ্লিষ্টরা জানান, মগবাজার আদ-দ্বীনে স্বাভাবিক সময়ে আউটডোরে দিনে গড়ে দুই হাজার রোগী সেবা নিতেন। ভর্তি হতেন ১৪০-১৫০ জন। সি-সেকশান বা সিজারিয়ানে ৩৫-৪০ এবং স্বাভাবিক প্রসব হতো গড়ে দিনে ২২-২৫টি। এখন দিনে ২০০ থেকে ২৫০ রোগী মগবাজারে আসছেন। তাদের বিকল্প ব্যবস্থায় পোস্তগোলায় নেওয়া হচ্ছে। এখানকার সিনিয়র চিকিৎসকরা সেখানে সেবা দিচ্ছেন।

সরকার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তদন্তে অবহেলা স্পষ্ট

ছয় নবজাতক মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কমিটির প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও কর্তব্যরত নার্স-স্টাফদের অবহেলার তথ্য উল্লেখ রয়েছে। সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়ার্ডটি আবদ্ধ, বাইরের আলো-বাতাস প্রবেশের সুযোগ ছিল না। ভেতরের পরিবেশ গুমোট, এসি পুরোনো এবং কক্ষের আয়তনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। ২৬ মে রাত ২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত এসি বন্ধ রাখায় নবজাতকদের শ্বাস-প্রশ্বাস কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ওয়ার্ডের রোগীদের জন্য কোনো চিকিৎসক ছিলেন না। নবজাতকদের অসুস্থ হওয়া থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোনো চিকিৎসক দেখতে যাননি। মায়েরা নার্স ও স্টাফদের ডেকেও পাননি। তাদের গাফিলতি ও প্রশাসনের দায়িত্বহীন আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে কমিটি।

আমরা এখনো পুরো টাকা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করিনি। এতগুলো টাকা তো একসঙ্গে দেওয়া কঠিন। আমরা কাউকে বঞ্চিত করব না। বাকি টাকা দিয়ে দেব।তারিকুল ইসলাম মুকুল, আদ-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক

অন্যদিকে, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর কারণ খুঁজতে পাঁচ সদস্যের কমিটি করে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এখনো কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা স্ট্রিমকে জানিয়েছেন, কমিটির সদস্যরা তদন্তে কর্তব্যরত নার্স ও স্টাফদের অবহেলার প্রমাণ পেয়েছেন। পরে নিজস্ব ও সরকারি তদন্তের ভিত্তিতে দুই নার্স ও এক বুয়াকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

এই ব্যাপারে আদ-দ্বীন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আশরাফুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘ঘটনার রাতে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডটিতে দুই নার্স ও এক বুয়া দায়িত্বে ছিলেন। তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে অবহেলাজনিত কারণে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।’ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি– প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে আগের দিন রাত ১০টায় গাইনি চিকিৎসক রাউন্ড দিয়েছিলেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী, এই ধরনের ওয়ার্ডে ২৪ ঘণ্টা নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসক রাখা হয় না। রাউন্ড, অনকল ও সিজার চিকিৎসক ছিলেন। কোনো চিকিৎসক এককভাবে নিয়োজিত ছিলেন না বলে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।’

সরকারের তদন্ত প্রতিবেদনের পরে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে– প্রশ্নে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘যেসব ওয়ার্ডে জানালা ও ভেন্টিলেটর ছিল না, সেখানে স্থাপন করা হয়েছে। সব ওয়ার্ডে অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড পরিমাপের প্রযুক্তি (গ্যাস ডিটেক্টর অ্যান্ড মনিটর) বসানো হয়েছে। কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেলে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম বেজে সতর্ক করবে।’

ওই রাতে কী ঘটেছিল, মাসহ স্বজনের বর্ণনা

মৃত ছয় নবজাতকের মধ্যে মিম আক্তারের মেয়েসন্তান রয়েছে। মুন্সীগঞ্জ বাড়ি হলেও ঢাকার কেরানীগঞ্জে কাপড়ের ব্যবসা করেন তাঁর স্বামী মো. আকাইদ। প্রথম সন্তান নিয়ে ঈদে বাড়ি ফিরবেন বলে দারুণ উচ্ছ্বসিত ছিলেন। কিন্তু মুহূর্তে তা বিষাদে রূপ নেয়।

স্ট্রিমের সঙ্গে আলাপে মিম জানান, পরিবারের সদস্যদের অভিজ্ঞতা থেকে আগ্রহী হয়ে আদ-দ্বীনে শুরু থেকে প্রসূতিসেবা নেন। কখনো এমন মর্মন্তুদ ঘটনা নিজের জীবনে ঘটবে, কল্পনাও করেননি।

মিম জানান, ওই রাতে মায়েদের অনুরোধে এসি বন্ধ করা হয়েছিল। তাঁর সন্তান কান্না করলে স্বাভাবিক ভেবে আদর করে ঘুম পাড়ান। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে আবার কান্না শুরু করে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘তিন দিনের সন্তান। কাঁদতে কাঁদতে বমি শুরু করে। আমিও কাঁদতে থাকি। নার্সদের ডাকলেও কেউ আসেননি। পরে নিজেই ওকে নিয়ে এনআইসিইউতে যাই। সেখানকার নার্সরা আগে বিল দিতে বলেন। ততক্ষণে মারা গেছে আমার কলিজার টুকরা। কিন্তু বিল নেওয়ার জন্য তাঁরা এটি গোপন রাখে।’

 

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে ৭ লাখ টাকা পাওয়ার কথা জানিয়ে মিম আরও বলেন, ‘এই হাসপাতাল গরিব ও মধ্যবিত্তের হাসপাতাল। বন্ধ থাকলে হাজার হাজার মানুষ স্বল্প খরচের চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবে। ডেকেও যাদের পাইনি, তাদের আগে ধরা হোক। শাস্তি দেওয়া হোক। লাইসেন্স বাতিল কখনো ন্যায়বিচার হতে পারে না।’

ঢাকার দোহার থেকে স্ত্রী ফারিহা খাতুনকে ভর্তি করেন সাইদুল ইসলাম। কোলজুড়ে আসে ফুটফুটে কন্যাসন্তান। প্রথম সন্তানকে হারানোর শোক এখনো ভুলতে পারছেন না এই দম্পতি। স্ট্রিম এই দম্পতির সঙ্গে যোগাযোগ করে মন্তব্য পায়নি। তবে ফারিহার সঙ্গে হাসপাতালে ছিলেন তাঁর ননদ জান্নাতুল। স্ট্রিমকে তিনি জানান, পারিবারিকভাবে তাঁরা সব সময় আদ-দ্বীনে চিকিৎসা নেন। মা, বড় বোনসহ নিজেই এখানে সেবা নিয়েছেন। ওই রাতের ঘটনার বিষয়ে জান্নাতুল বলেন, ‘গভীর রাতে দেখি, শিশুরা কাঁদছে। বমি করছে। একপর্যায়ে শরীর নীল হয়ে আসে। কাউকে ডেকে আমরা পাইনি। আস্তে আস্তে ফুলগুলো নিস্তেজ হয়ে পড়ল।’

 

মগবাজার আদ-দ্বীনে স্বাভাবিক সময়ে আউটডোরে দিনে গড়ে দুই হাজার রোগী সেবা নিতেন। ভর্তি হতেন ১৪০-১৫০ জন। সি-সেকশান বা সিজারিয়ানে ৩৫-৪০ এবং স্বাভাবিক প্রসব হতো গড়ে দিনে ২২-২৫টি। এখন দিনে ২০০ থেকে ২৫০ রোগী মগবাজারে আসছেন। তাদের বিকল্প ব্যবস্থায় পোস্তগোলায় নেওয়া হচ্ছে।

 

মাছ বিক্রেতা হাসান সরদারের বাড়ি বরিশাল। পরিবার নিয়ে রাজধানীর নন্দীপাড়ায় থাকেন। আদ-দ্বীন হাসপাতালে সিজারিয়ানের মাধ্যমে তাঁর স্ত্রী নাজমা বেগম ঈদুল আজহার চার দিন আগে যমজ ছেলেসন্তান প্রসব করেন। বাড়ি ফিরে ঈদুল আজহা উদযাপনের প্রস্তুতির মধ্যেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে হাসানের। আকিকার সব প্রস্তুতি থাকলেও, হাসপাতাল থেকে নামহীন দুই সন্তান নিয়ে বাড়ি ফেরেন তাঁরা।

যোগাযোগ করা হলে হাসান সরদার স্ট্রিমকে জানান, সরকারের তরফ থেকে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করে দুই সন্তানের জন্য ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা দিতে চেয়েছে। কিন্তু ৭ লাখ দিয়ে বাকিটা লাইসেন্স ফিরে পেলে দেবে বলছে।

তিনি বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। সন্তানদের নিয়ে যা হওয়ার, হয়েছে। ব্যথা নিরসনে মাথা কাটা কখনো সমাধান হতে পারে না। সরকার আমাদের ক্ষতিপূরণ আদায়ে পাশে দাঁড়াবে, এটাই প্রত্যাশা করি।’

ছয় নবজাতকের মৃত্যুতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দেয় আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পাঁচ পরিবারকে শুরুতেই ৭ লাখ করে দিয়েছে। তবে লাইসেন্স বাতিলের পর আর কাউকে টাকা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের ভাষ্য, বাকি টাকা চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাইসেন্স বাতিলের অজুহাত দিচ্ছে। কবে টাকা পাবেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

সদরঘাটে পাইকারি কাপড়ের দোকানে কাজ করেন কেরানীগঞ্জের মোহাম্মদ শান্ত। পরিবার ও স্বজনের পরামর্শে স্ত্রী জান্নাত অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকেই আদ-দ্বীনে সেবা নেন। ঈদের আগে ভর্তির পর প্রথম ছেলেসন্তান আসে জান্নাতের কোলজুড়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেননি শান্ত। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, এক মাসেও আমার স্ত্রী স্বাভাবিক হতে পারছে না। সারাক্ষণ সন্তানের জন্য কান্না করে। ৭ লাখ টাকা পেয়েছি। বাকি টাকা চাইলে হাসপাতালের লোকেরা আমাকে বলেন– ‘আমাদের লাইসেন্স বাতিল। হাসপাতালের কর্মীদেরও দেখা লাগছে। একটু সময় দেন, আমরা ইনশাআল্লাহ টাকা দেওয়ার চেষ্টা করব’।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের পরিচালক (এইচআর অ্যান্ড কোম্পানি এ্যাফের্য়াস) তারিকুল ইসলাম মুকুল স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা এখনো পুরো টাকা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করিনি। এতগুলো টাকা তো একসঙ্গে দেওয়া কঠিন। আমরা কাউকে বঞ্চিত করব না। বাকি টাকা দিয়ে দেব।’ টাকা দিতে লাইসেন্স বাতিলকে অজুহাত করছেন প্রশ্নে তিনি কল কেটে দেন। পরে একাধিকবার চেষ্টা করলেও রিসিভ হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস স্ট্রিমকে বলেন, ‘উনারা (আদ-দ্বীন) ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে কী অঙ্গীকার করেছেন, কত টাকা দেবে বা দিয়েছে, তা আমরা জানি না।’

ক্ষতিপূরণ দেয়নি, যোগাযোগও করেনি সরকারের কেউ

বিভিন্ন সময়ে আলোচিত ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। মরদেহ দাফন-কাফনেও আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে স্থানীয় প্রশাসন। তবে আদ-দ্বীনে মৃত ছয় নবজাতকের পরিবার সরকারের তরফ থেকে এখন কোনো সহায়তা পায়নি। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটি কল করে তথ্য নিয়েছে। এর বাইরে সরকারের কেউ যোগাযোগ করেনি।

সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর পল্টন থানায় মামলা করেছেন উত্তরা কামারপাড়ার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের তো বিচার হয় না। বিচার মানুষের হয়। যেসব মানুষের অবহেলায় আমি সন্তান হারালাম, আমি তাদের কঠিন বিচার চাই। সেটি না করে হাসপাতাল বন্ধ, কেমন বিচার? সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কর্তব্যরত চিকিৎসক-নার্সদের গ্রেপ্তার করতে হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি বলেন, ‘ক্ষতিপূরণ সরকারি নীতি নির্ধারণের বিষয়। সেটি ওপর মহল থেকে দেখা হচ্ছে। অধিদপ্তরের জায়গা থেকে এই বিষয়ে আমার মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’

লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন

মৃত নবজাতকদের পরিবার জানিয়েছে, একটি ঘটনার জন্য হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল কখনো সুষ্ঠু বিচার হতে পারে না। ব্যথা নিরসনের সমাধান কখনো মাথা কেটে ফেলা না। বরং লাইসেন্স বাতিল করায় এই ঘটনায় অভিযুক্তরা আইনের বাইরে থেকে গেলেন। সরকারের উচিত ছিল সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক-নার্সদের বিচারের আওতায় এনে অন্যান্য হাসপাতালের জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করা।

মৃত এক নবজাতকের বাবা হাবিুবর রহমান। তিনি রাজধানীর উত্তরা থাকেন। ব্যবসার পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের রাজনীতিতে যুক্ত। হাবিবুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘আদ-দ্বীনের খরচ এবং চিকিৎসার মান অন্যান্য হাসপাতালের তুলনায় ভালো। উত্তরায় অনেক হাসপাতাল থাকার পরও আমি তাদের প্রতি আস্থা রেখেছি। আমার আরও দুটি সন্তান এই হাসপাতালেই হয়েছে। কিন্তু তৃতীয় সন্তানকে বাঁচাতে পারলাম না।’

প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘সরকার যেখানে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলছে, সেখানে হাসপাতাল বন্ধ হাস্যকর সিদ্ধান্ত। আদ-দ্বীন তো ছোট প্রতিষ্ঠান না। এখানে হাজার হাজার কর্মী ও শিক্ষার্থী আছে। হাসপাতাল বন্ধ হলে, তাদের কর্ম কে দেবে? সরকারের আরেকবার সিদ্ধান্তটি বিবেচনা করা উচিত।’

উনারা (আদ-দ্বীন) ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে কী অঙ্গীকার করেছেন, কত টাকা দেবে বা দিয়েছে, তা আমরা জানি না।অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক

সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ বা এ ধরনের কোনো আশ্বাস পাননি বলে জানান হাবিবুর। তিনি বলেন, শুধু বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে বলতে শুনছি, তিনি আপনাদের পাশে আছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আপনাদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হবে। হাসপাতালে ফোন দিলে বলছে, লাইসেন্স ফেরত পেলে দিয়ে দেব। কিন্তু কবে পাব, তা জানি না।

মিম আক্তার বলেন, ‘আমি মা, সন্তান হারানোর কষ্ট জানি। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তারপরও বলব, আমরা যা হারিয়েছি, তা ফিরে পাব না। কিন্তু একটি ঘটনায় হাসপাতাল কেন বন্ধ করা হলো? এটি গরিব ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য উপযুক্ত হাসপাতাল। স্বল্পখরচে ভালো মানের চিকিৎসা পাওয়া যায়। সরকারের উচিত, আদ-দ্বীনকে নিয়মের মধ্যে এনে হাজার হাজার মানুষের ভোগান্তি দূর করা।’

বিদেশি শিক্ষার্থীরা বিপাকে

আদ-দ্বীন উইমেন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের পর বিপাকে পড়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ইন্টার্নশিপে থাকা বিদেশি শিক্ষার্থীরা। তাঁরা স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, স্বাস্থ্যসচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ঘুরেও সুরাহা পাচ্ছেন না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজে ৩১ বিদেশি শিক্ষার্থী ইন্টার্ন করছেন। তাদের মধ্যে ৩০ জন ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর ও একজন মালদ্বীপের নাগরিক। প্রতিষ্ঠানটিতে দেশি-বিদেশি মিলে ইন্টার্ন শিক্ষার্থী তিন শতাধিক।

সংশ্লিষ্ট দেশের চিকিৎসা কাউন্সিলের নিয়ম অনুযায়ী, মেডিকেল ডিগ্রি অর্জনের পর অনুমোদিত হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু হঠাৎ হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল হওয়ায় চিকিৎসক হিসেবে নিবন্ধন পাওয়া এবং ভবিষ্যতে স্বাধীনভাবে চিকিৎসা পেশা পরিচালনার আইনি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

একাধিক বিদেশি শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, নিয়ম অনুযায়ী, এমবিবিএস শেষে একই মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে তাদের ইন্টার্নশিপ করতে হয়। অন্যথায় নিজ দেশে ফিরে চিকিৎসা পেশায় যুক্ত হওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু আদ-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তাঁরা।

অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘আইনিভাবে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে এবং আপিলের সুযোগ রয়েছে। আপিল হলে সরকার দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।’