Image description

রাজধানীর মোহাম্মদপুর যেন আতঙ্কের এক জনপদ। কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না অপরাধীদের তৎপরতা। চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে মাদক কারবার-এমন কোনো অপরাধ নেই, যা মোহাম্মদপুরে নেই। সরকারের হাই অ্যালার্ট, পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, প্যাট্রলিং জোরদারের পরও অপরাধীদের তৎপরতা যেন কমছেই না। বাসিন্দারা এখনো ছিনতাইয়ের ভয় নিয়ে বাসার বাইরে পা বাড়ান।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, তালিকাভুক্ত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পরেও অপরাধী না কমার পেছনে রয়েছে ভিন্ন কারণ। মোহাম্মদপুরের বেশির ভাগ এলাকায় বসবাস করে কয়েক লাখ উদ্বাস্তু। সেসব পরিবারের কিশোর ও যুবকরা বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপে নাম লেখিয়ে মোহাম্মদপুর জনপদকে ভয়ংকর করে তুলেছে। তাদের বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো তথ্য না থাকায় অনেকটাই অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। জানা যায়, দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর ছত্রছায়ায় চলছে নীরব চাঁদাবাজি। ছিঁচকে চোর-ছিনতাইকারীরাও মাদক কারবারে ঝুঁকে পড়ায় তাদের এ অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ে ভয় বাড়ছে জনমনে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, বিশাল আয়তনই মোহাম্মদপুর এলাকার আইনশৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ। পাশেই আদাবর থানা থাকলেও সেটির আয়তন মোহাম্মদপুর থানার তুলনায় ৩ ভাগের ১ ভাগ। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরের অর্ধেক এলাকায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউকের) অনুমোদন ছাড়াই আবাসন গড়ে উঠছে। তুরাগ নদীর পারে যত্রতত্র বসতি গড়ে তুলেছে বিভিন্ন এলাকার নদী সিকস্তি মানুষ। বিশেষ করে ভোলার নদীভাঙন এলাকাগুলোর বসতি এখানে সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়াও কম ভাড়ার কারণে নির্মাণশ্রমিকসহ অনেক নিম্ন আয়ের মানুষ সেখানে বসতি গড়েছে। এই ঘনবসতিপূর্ণ বিশাল বস্তি এলাকাই এখন মোহাম্মদপুরের অপরাধ সাম্রাজ্যের প্রধান আতঙ্কের নাম। জানা যায়, এই এলাকা থেকে থানা-পুলিশ প্রতিদিন গড়ে ২৪ জন করে গ্রেপ্তার করছে। এ ছাড়া র‌্যাব ও ডিবির অভিযানেও উল্লেখযোগ্য হারে অপরাধীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে। কিন্তু সুযোগসন্ধানী এই উদ্বাস্তু পরিবারের কিশোর অপরাধীরা কোনো কিছুকেই পরোয়া করছে না। হিরোইজম দেখাতে কোমরে চাপাতি ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ে ঘুরছে তারা। আর যখনই সুযোগ পাচ্ছে পথচারীদের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। 

মোহাম্মদপুর থানায় গ্রেপ্তার হওয়া মোট অপরাধীদের ৮০ শতাংশই এই উদ্বাস্তু বলে জানিয়েছে পুলিশ। মোহাম্মদপুর থানা সূত্র জানায়, বছিলা গার্ডেন সিটি, রিভারভিউ পয়েন্ট, রামচন্দ্রপুর, একতা হাউজিং, মোহাম্মদপুর ফিউচার, রাজধানী হাউজিং, শাহজালাল হাউজিং, বছিলা, রায়েরবাজার বধ্যভূমি, চাঁদ উদ্যান, নবীনগর হাউজিং, ঢাকা উদ্যোন, চন্দ্রিমা মডেল টাউন এলাকাই মোহাম্মদপুরের অপরাধীদের অভয়ারণ্য। এসব এলাকাজুড়েই উদ্বাস্তুদের বসবাস। সম্প্রতি বছিলা এলাকায় একটি পুলিশ ক্যাম্প করা হলেও অন্য এলাকাগুলো থাকছে অনেকটা নজরদারির বাইরে। সেখানে বসবাসকারীরা ওই সব এলাকার ভোটার না হওয়ায় কোনো তথ্যও নেই পুলিশের কাছে। ফলে বিভিন্ন অলিগলিতে ছিনতাই করা অফরাধীদেও গ্রেপ্তারেও বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে। এ ছাড়াও মাদকের গডফাদারদের সবচেয়ে বড় হটস্পট জেনেভা ক্যাম্প। সেখানে প্রতিদিনই যেন মাদক গডফাদারদের নিত্যনতুন নাম সামনে আসে। রয়েছে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইও।

পুলিশের তথ্য বলছে, মাদক কারবারিদের মধ্যে তৎপর রয়েছে আরিফুল ইসলাম আরিফ, হাবিবুল ইসলাম রানা, মো. ইউসূফ, আঁখি চৌধুরী, ইয়াকুব আলী, ফরিদ হোসেন শরিফ, ইসমাইল হোসেন, বিল্লাল, আলে নূর বৃষ্টি, কালা আয়শা, কারেন্ট মনির, কাকলী আক্তার, মোসা. রুনা, জসিম হাওলাদার। কিশোর গ্যাং ও ছিনতাই চক্রের লিডারের তালিকায় রয়েছে আনোয়ার হোসেন, আহম্মেদ, রক্তচোষা জনি, ইউনুস, মাওরা সোহেল, দাত ভাঙা বিল্লাল, রগকাটা সুমন, রাহুল, পিঞ্জিরা রাব্বি, রবিউল ইসলাম, পাঠা আলামিন, চায়না সোহেল, লারা আসাদ, ছলে সালমান, দিলা, আরমান মৃধা, তুষার, রাফাত, গুটি হাসান, পারভেজ, ফজলে রাব্বির। এদের অনেকেই এখন কারাগারে।

 এ ছাড়াও আর্মি আলমগীর, নবী গ্রুপ, কবজি কাটা আনোয়ার গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, লারা দে গ্রুপ, আকবর গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, ল ঠেলা গ্রুপ, আশরাফ গ্রুপ, মিরাজ গ্রুপ, সুমন গ্রুপের দুই শতাধিক সদস্য এখনো তৎপর। এসব অপরাধীর অনেকেই শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন ও পিচ্চি হেলালের অনুসারী। চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণেও এসব গ্রুপকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

মোহাম্মদপুর থানার তথ্য মতে, গত মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত ৩ মাসে ২ হাজার ১০১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে থানা-পুলিশ। এর মধ্যে চাঁদাবাজ ২৫ জন চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারি ১৩৮ জন। ডিএমপির অধ্যাদেশ অনুযায়ী গ্রেপ্তার দেখানো হয় ১ হাজার ১৯৩ জনকে। তবে পুলিশের একাধিক সূত্র স্বীকার করেছে যে পুলিশের নজরদারি ঘাটতির সঙ্গে অপরাধে নতুন মাত্রা যোগ করেছে রিভারভিউ পয়েন্ট দিয়ে সহজেই নদী পার হয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ। অনেক অপরাধী তুরাগ নদের বিপরীত পাড়ে বসবাস করে। সুযোগ বুঝে মোহাম্মদপুরে অপরাধ করে এই রিভারভিউ পয়েন্ট দিয়ে পালিয়ে চলে যায়। এ ছাড়া বিশাল এলাকার নিয়ন্ত্রণে মোহাম্মদপুর থানার মোট জনবল মাত্র ১৬০ জন। এর মধ্যে এসআই ও এএসআই রয়েছেন ৮০ জন। থানায় গাড়ি রয়েছে ১০টি। এই জনবল ও গাড়ি দিয়ে বিশাল আয়তনের এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

ডিবির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মো. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘মোহাম্মদপুর ও আদাবর ক্রাইম জোন হওয়ায় আমরা সব সময় সর্বোচ্চ গোয়েন্দা নজরদারি অব্যহত রাখি। এখন সেভাবে ঘটনা ঘটছে না। তবে যখনই ঘটনা ঘটেছে, প্রতিটি ঘটনায় অপরাধীরা আইনের আওতায় এসেছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে। ডিএমপির মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি মো. জুয়েল রানা বলেন, মোহাম্মদপুর থানা ভেঙে নতুন কয়েকটি থানা গড়ে না তুললে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কেননা সক্ষমতার চেয়ে ৪-৫ গুণ বেশি পরিশ্রম করেও মোহাম্মদপুর থানা হিমশিম খাচ্ছে।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি মেজবাহ উদ্দিন বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় থানা পুলিশ সব সময় সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে অপরাধও ঢাকার অন্য অনেক এলাকার তুলনায় কম। এরপরও দুই-একটি ঘটনা ঘটলেই মোহাম্মদপুর নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়। তবে তিনি স্বীকার করেন চুরি-ডাকাতি-ছিনতাইয়ের চেয়ে মাদক কারবার এখন মোহাম্মদপুরে মাথাচাড়া দিচ্ছে। একই সঙ্গে জেনেভা ক্যাম্পসহ অন্য এলাকার মাদক কারবারিদের নিয়মিত গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে।