২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির’ ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ‘অবাস্তব ও প্রতারণার দলিল’ বলে অভিহিত করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, এ বাজেটে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধির চেয়ে ভোগ-বিলাস এবং আমদানিনির্ভর পরিকল্পনাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ১৯৭১ সালের পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত দলীয়করণ ও দখল করার ফলে দেশে দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল। পরবর্তীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে মুক্তবাজার অর্থনীতি ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আপনি সমাজে কনজাম্পশন ডিমান্ড (ভোগের চাহিদা) তৈরি করছেন, কিন্তু প্রোডাকশন বা ইনভেস্টমেন্ট ডিমান্ড সৃষ্টি করছেন না। মানুষ এই অর্থ দিয়ে ভারতীয় বা চীনা পণ্য কিনবে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং একটি নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী তৈরি হবে। আমাদের প্রয়োজন ছিল তরুণদের প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণের মাধ্যমে উৎপাদন খাতে সম্পৃক্ত করা।
দেশ থেকে অর্থ পাচারের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের টাকা লুটপাটকারী ও গণহত্যাকারীদের অপরাধকে আমি অভিন্ন মনে করি। এস আলম, বেক্সিমকো, ওরিয়ন বা নাসা গ্রুপের মতো যেসব প্রতিষ্ঠান অর্থ পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। এজন্য তাদের সম্পদ জাতীয়করণ এবং নতুন আইন প্রণয়ন করে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে।
বিদ্যুৎ খাতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ১২ টাকায় বিদ্যুৎ কিনে ৬ টাকায় বিক্রি করছে। এই ঘাটতি পূরণে জনগণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানো হচ্ছে। আদানি ও সামিট গ্রুপের সঙ্গে করা অসম চুক্তিগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লড়াই করতে হবে। এগুলো শুধু দুর্নীতি নয়, পরিকল্পিত কাঠামোগত লুটপাট। বিদ্যুতের দাম কমানো না গেলে দেশে নতুন শিল্প বিনিয়োগও বাড়বে না।
পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তিনি বলেন, সীমান্তে বিএসএফ ১০ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী বাংলাদেশকে নিয়ে ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন এবং ইসরায়েলের মতো শিক্ষা দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এসব বক্তব্যের দাঁতভাঙা জবাব দিতে হবে। পাশাপাশি ভারতের নতুন হাইকমিশনারের উচিত গত ১৬ বছর আওয়ামী লীগকে অনৈতিকভাবে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সহায়তার জন্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া।
তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে গঠিত জুলাই ফাউন্ডেশন অর্থসংকটে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ ফাউন্ডেশনের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাদুঘর’ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করারও দাবি জানান।
নাহিদ ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে অর্থনৈতিক সংস্কার সম্ভব নয়। দুর্নীতি রোধে দুদক ও বিচার বিভাগের সংস্কার জরুরি। জুলাই সনদের অঙ্গীকার অনুযায়ী বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। অন্যথায় এই বিশাল বাজেট সাধারণ মানুষের কোনো উপকারে আসবে না।