Image description

নারী ও শিশু নির্যাতনের বেশিরভাগ মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও ডিএনএ (ডি-অক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড) প্রতিবেদন না পাওয়ায় আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিতে পারছে না পুলিশ। ২০২২ সাল থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ১৬ থানার ২৪১টি মামলার তদন্ত এ কারণে আটকে রয়েছে।

মামলার অধিকাংশের তদন্ত প্রায় শেষ হলেও ডিএনএ রিপোর্ট না থাকায় আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিতে পারছেন না তদন্ত কর্মকর্তারা। আটকে থাকা মামলাগুলোর বড় অংশই নারী ও শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভাগীয় পর্যায়ে ডিএনএ ল্যাব না থাকায় সব নমুনা ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। এতে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে, আর ন্যায়বিচারের অপেক্ষাও বাড়ছে ভুক্তভোগীদের।

 

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানা যায়, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে নমুনা পাঠানো হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে প্রতিবেদন আসতে দীর্ঘ সময় লাগায় তদন্তে জট তৈরি হচ্ছে।

সম্প্রতি বাকলিয়া থানার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় ডিএনএ প্রতিবেদন মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে পুলিশের হাতে পৌঁছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দ্রুত প্রতিবেদন পাওয়ায় পুলিশ পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ঘটনার মাত্র ২৬ দিনের মাথায় গত ১৭ জুন চট্টগ্রাম মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল আসামি মনির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তবে এমন নজির ব্যতিক্রম বলেই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ২২ মে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার মান্ডাটিলা এলাকায় পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া মো. হাসানের মামলার ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হলেও এখনো প্রতিবেদন মেলেনি। ফলে মামলার তদন্তও এগোতে পারছে না। বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল করিম বাংলানিউজকে জানান, গত ২২ মে পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে প্রতিবেশী মো. হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ভুক্তভোগী শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। মামলার তদন্তের স্বার্থে ডিএনএ পরীক্ষা করা হলেও এখনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল করা সম্ভব হচ্ছে না। সিএমপির উপ-কমিশনার (ক্রাইম) মো. রইছ উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, সিএমপির ২৪১টি মামলার তদন্ত শুধু ডিএনএ প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পেলেই অধিকাংশ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া সম্ভব হবে। দ্রুত রিপোর্ট পাওয়ার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।

 

অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, ডিএনএ প্রতিবেদন অপরাধ তদন্তের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলোর একটি। এটি পেতে দীর্ঘ সময় লাগলে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া অকারণে বিলম্বিত হয়। বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোতে ডিএনএ পরীক্ষা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ল্যাবের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন তারা।

শিশু ও মানবাধিকারকর্মী এবং সাউথ এশিয়ান ভয়েস ফর চিলড্রেনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শাহজাহান বাংলানিউজকে বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ডিএনএ প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আলামত। কিন্তু বিভাগীয় পর্যায়ে ডিএনএ ল্যাব না থাকায় সব নমুনা ঢাকায় পাঠাতে হয়। এতে প্রতিবেদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে আধুনিক ডিএনএ ল্যাব স্থাপন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

চট্টগ্রাম জেলা আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তানভীর হোছাইন বাংলানিউজকে বলেন, ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ডিএনএ প্রতিবেদন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলামত। দীর্ঘদিন প্রতিবেদন না পাওয়ায় তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। এতে ভুক্তভোগীরা সময়মতো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর ডিএনএ প্রতিবেদন দ্রুত সরবরাহে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর মাহমুদ-উল আলম চৌধুরী মারুফ বাংলানিউজকে বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন ছাড়া অনেক মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ে অভিযোগপত্র দিতে পারেন না। এতে তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারকাজ পিছিয়ে যায়। দ্রুত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে বিচারপ্রক্রিয়াও অনেক দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

প্রসঙ্গত,২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরের জন্য পৃথক দুটি শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের গেজেট প্রকাশ করা হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ট্রাইব্যুনাল দুটির কার্যক্রম শুরু হয়। গত মে মাস পর্যন্ত জেলা শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে ৪১৫টি এবং মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে ৬৭৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।