আবারও আলোচিত ‘পাগলা মসজিদের’ দানবাক্স থেকে ৪৩ বস্তা টাকা পাওয়া গেছে। মসজিদটি কিশোরগঞ্জ শহরের নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত। প্রতি ৩-৪ মাস পর পর এই মসজিদের দানবক্সগুলো থেকে টাকা বের করা হয়। এবার গত শনিবার (২৭ জুন) ১৩টি দানবাক্স খোলা হয়েছে এবং সেখান থেকে ৪৩ বস্তা টাকা পাওয়া গেছে।
স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, এই মসজিদে মানত করে দান করলে তার মনের আশা পূর্ণ হয়। দীর্ঘদিনের এই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের কারণে এই মসজিদে বিপুল পরিমাণ দান জমা হয়। ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদ শুধু মুসলমানদের নয়, বরং সব ধর্মের সব মানুষ এটিকে সার্বজনীন পবিত্র স্থান মনে করেন এবং মানতস্বরূপ নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, হাঁস-মুরগি, গবাদি পশুসহ বিভিন্ন সামগ্রী দান করে থাকেন।
এবার ছয় মাস পর দানবাক্সগুলো খুলে পাওয়া গেছে, ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা।
এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আসলে কোথায় যায়? কারা এটি পরিচালনা করে? এবং কীভাবে খরচ করা হয়?
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে থেকে জানা যায়, প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এবং প্রশাসনের কর্মকর্তা, ব্যাংকের প্রতিনিধি, মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবী উপস্থিতে দানবাক্স খোলা হয় এবং প্রাপ্ত অর্থ সরকারি ব্যাংকে জমা রাখা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মসজিদ পরিচালনার জন্য একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি রয়েছে, যার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি)। অর্থাৎ এই তহবিল ব্যবহারে সরকারি প্রশাসনিক নজরদারি থাকে।
টাকাগুলো ব্যয় হয় কোন খাতে
পাগলা মসজিদের দানের অর্থ সাধারণত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় করা হয়। প্রথমত, মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার, বিদ্যুৎ, পানি, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই অর্থ ব্যবহার করা হয়।
দ্বিতীয়ত, মসজিদ সম্প্রসারণ, নতুন ভবন নির্মাণ, ওজুখানা, মুসল্লিদের সুবিধা বৃদ্ধি এবং অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে এই অর্থ ব্যয় করা হয়। তৃতীয়ত, ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম এবং অন্যান্য কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এই তহবিল থেকেই দেওয়া হয়। চতুর্থত, ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনায়ও এই অর্থ ব্যবহার করা হয়।
প্রয়োজন অনুযায়ী দানের অর্থ সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে দরিদ্র মানুষের সহায়তা, ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা এবং জনকল্যাণমূলক কিছু প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের নজির রয়েছে। মসজিদের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হেফজখানা ও মাদ্রাসার প্রায় ১৩০ জন এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীর থাকা, খাওয়া, পোশাক এবং লেখাপড়ার যাবতীয় খরচ এখান থেকে বহন করা হয় । তবে এসব ব্যয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও সরকারি বিধি অনুসারেই করা হয়।
পাগলা মসজিদের দানের অর্থ সরাসরি রাষ্ট্রের সাধারণ রাজস্ব বা সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। এটি নিয়েও অনেকের ভুল ধারণা রয়েছে। দানের টাকাগুলো মসজিদের নিজস্ব তহবিলেই থাকে। তবে সেই তহবিল সরকারি ব্যাংকে সংরক্ষিত হয় এবং সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। অর্থ ব্যয়ের জন্য নির্ধারিত প্রশাসনিক অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, অর্থ গণনা থেকে শুরু করে ব্যাংকে জমা দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সম্পন্ন হয়। এ ছাড়া আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করা হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিরীক্ষা ও প্রশাসনিক পর্যালোচনার সুযোগ থাকে। দানবাক্স খোলার সময় গণমাধ্যমের উপস্থিতিও পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।