Image description

মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ মোড় থেকে তাজমহল রোড হয়ে জেনেভা ক্যাম্প পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে উড়ছে সাদা পতাকা। ২০ গজ দূরে দূরে টাঙানো এ সাদা পতাকায় আরবি হরফে লেখা রয়েছে কালিমা।

শুধু মোহাম্মদপুরেই নয়, গাবতলী, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় উড়ছে বিশেষ এ পতাকা। গতকাল রাজধানীর কয়েকটি এলাকা সরেজমিন ঘুরে এ চিত্র দেখা যায়। তবে কারা লাগাচ্ছে বা কী উদ্দেশ্যে লাগাচ্ছে তার কোনো তথ্য নেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোড, ইকবাল রোড, খিলজি রোডের দুই পাশেই টাঙানো হয়েছে কালিমাখচিত সাদা পাতাকা। রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের সামনে সড়কের মাঝে আড়াআড়িভাবে দুটি করে পতাকা টাঙানো হয়েছে। সেখানে একটি পুলিশের টহল টিমের উপস্থিতি দেখা যায়। কিন্তু কারা এ পতাকা লাগিয়েছে বা কখন লাগিয়েছে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য জানাতে পারেননি দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। তাজমহল রোড লাজ ফার্মার সামনে উড়ছে কালিমাখচিত সাদা পতাকা। লার্জ ফার্মার সামনে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীও জানাতে পারেননি কারা এবং কখন এ পতাকা টাঙানো হয়েছে। কিছুদূর সামনে এগোলে ডানদিকে মিস্টার বেকারের আউটলেটের সামনে সাদা পতাকা উড়ছে। পতাকার বিষয়ে দোকানিও কিছু জানেন না। কেউ কিছু না জানলেও পুরো মোহাম্মদপুরে উড়ছে কালিমাখচিত সাদা পতাকা।

কালিমাখচিত সাদা পতাকার বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজানের সঙ্গে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

মোহাম্মদপুর ছাড়াও এদিন গাবতলী ও মিরপুর এলাকায় কালিমাখচিত সাদা পতাকা টাঙানো দেখা যায়। টেকনিক্যাল মোড় থেকে মিরপুর এক নম্বরের দিকে যাওয়ার রাস্তাতেও চোখে পড়ে এ পতাকা। যাত্রাবাড়ী ও শনির আখড়া এলাকাতেও উড়তে দেখা যায় কালিমাখচিত সাদা পতাকা। রাজধানীর বাইরে সাভারেও বেশকিছু সড়কে দেখা যায় আরবি হরফে কালিমাখচিত সাদা পতাকা। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা সংযোগ সড়কের শিবু মার্কেট এলাকায় ওভারপাসে বৈদ্যুতিক পিলারে উড়তে দেখা গেছে সাদা পতাকা। সড়কের দুই পাশে একশর বেশি পতাকা লাগানো হয়েছে। শিবু মার্কেট এলাকায় এক দোকানি নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, গত বুধবার রাতে মাদরাসার কিছু ছাত্র এসে এ আরবি হরফে কালিমাখচিত সাদা পতাকা সড়কের মাঝে লাইটপোস্টে টানিয়ে দিয়ে যায়। সড়ক পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও পতাকা সম্পর্কে একই ধরনের তথ্য জানান। স্থানীয় আরেক দোকানি জানান, শোডাউন ও পতাকা টাঙানোর কাজে নেতৃত্ব দেন রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের শরিয়াহ গ্র্যাজুয়েশন ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষক। ওই ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আবার মুফতি হারুন ইজহার।

সাদা পতাকা টাঙানোর বিষয়টি তদন্ত করে দেখার পাশাপাশি অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কিনা তা খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী। তিনি বলেন, ‘ফুটবল বিশ্বকাপ খেলা চলমান থাকায় দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন দেশের পতাকা টাঙানোর বিষয়টি দেখা যাচ্ছে। তবে সাদা কাপড়ে কালিমা লেখা পতাকা লাগানোর বিষয়টি তাদের নজরে আগে আসেনি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে এবং কারা, কী উদ্দেশ্যে এগুলো লাগিয়েছে, তা জানার চেষ্টা করা হবে।’

ঢাকার বাইরে ফেনী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন সড়কে, ফ্লাইওভারে এবং জনবহুল এলাকায় কালিমাখচিত সাদা ও কালো পতাকা উড়তে দেখা যায়। এ নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও সংবাদমাধ্যমে তুমুল আলোচনা ও জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে পতাকা নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার থেকে পতাকা খুলে নেয়ার প্রতিবাদে পরবর্তী সময়ে গত ১৯ জুন জুমার নামাজের পরে হাটহাজারীতে বিক্ষোভ হয়। সেখানেও ছিল সাদা-কালো পতাকা। এ ঘটনার পর হাটহাজারীসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় একই পতাকা দেখা যাচ্ছে। এছাড়া পাবনা, যশোরসহ আরো বেশকিছু জেলায় এমন সাদা পতাকা নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে।

এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব নেতা মাওলানা মীর ইদ্রিস বলেন, ‘কালিমাখচিত সাদা-কালো পতাকা উড়াতে দেখছি, তবে আমরা উড়াইনি। আমি এটাকে সমর্থন করছি, কারণ কেউ কালিমা লেখা পতাকা উড়ালে সেটা নামাতে বলা ইসলাম অনুমোদন করে না। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে সারা দেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকায় ছেয়ে গেছে। সে জায়গায় ইসলামিক দেশ হিসেবে কালিমার পতাকা উড়ানোটা ঠিক আছে।’

সাদা পতাকা টাঙানোর মধ্য দিয়ে কোনো গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান বা এ দেশে কার্যক্রম শুরু করার জানান দিচ্ছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা লক্ষ করেছি এর আগে ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলায় এ ধরনের পতাকা প্রদর্শন করতে। তাদের পরিচয় প্রকাশ না পেলেও আমরা তাদের শোডাউন লক্ষ করেছি। পতাকার লেখার ধরনগুলো যেমন অপরিচিত, ঠিত তেমনই এসব শোডাউনে যারা অংশ নিচ্ছেন তারাও স্থানীয়দের কাছে অপরিচিত।’ স্থানীয় প্রশাসনের করণীয়তে যথেষ্ট ঘাটতি আছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের মধ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি রয়েছে। সে জায়গাতে অন্য কোনো গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান বা এ দেশে কার্যক্রম শুরু করার জানান দিচ্ছে। পাশাপাশি এর প্রতিক্রিয়া কী হয় সেটাও বোঝার চেষ্টা করছে। প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উচিত তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া। না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাজ করবে।’