Image description

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ৪৫ বছর আগে যে গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের স্বপ্ন বোনা হয়েছিল, কালের আবর্তে তা এখন কেবলই এক টুকরো জরাজীর্ণ পাথরের স্মৃতি। ফারাক্কা বাঁধের বিপরীতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে মরুভূমি হওয়া থেকে বাঁচাতে ১৯৮০ সালে নেওয়া এই মেগা প্রকল্পের বিশাল অংশ এখন পুরোপুরি বেদখল। প্রকল্প এলাকার মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি ও বিভিন্ন সামগ্রী গোপনে নিলামে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ এই ঐতিহাসিক প্রকল্পের কোনো নথিপত্র বা তথ্যই নেই স্থানীয় প্রশাসন কিংবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কাছে।

সরেজমিনে ভেড়ামারা উপজেলার বাহিরচর ইউনিয়নের মুসলিমপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পদ্মা নদীর তীরে পাউবোর সীমানাপ্রাচীরে ঘেরা ৩৩ শতক জমির ঠিক মাঝখানে ১৯৮০ সালে স্থাপিত গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তরটি এখনও কোনোমতে টিকে আছে। পাশেই জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে সে সময় নির্মিত ‘গঙ্গা ব্যারাজ রেস্ট হাউস’। তবে প্রকল্পের বাকি জমি এখন ‘ব্যারাজপাড়া’ নামে পরিচিত, যেখানে গত ২৫ বছর ধরে গড়ে উঠেছে প্রায় ৬০টি পরিবারের অবৈধ বসতি।

পাউবো ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৫ সালে ভারত একতরফাভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালু করলে বাংলাদেশের পদ্মা ও এর শাখা নদীগুলো শুকিয়ে যেতে শুরু করে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, সাতক্ষীরা ও বরিশাল অঞ্চলে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়।

এই বিপর্যয় রুখতে এবং দেশের কৃষি বাঁচাতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ফারাক্কার বিকল্প হিসেবে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ১৯৮০ সালের ২৭ ডিসেম্বর তৎকালীন বিদ্যুৎ, পানিসম্পদ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী কাজী আনোয়ার-উল হক এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।

সে সময় মোট ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা ব্যয় ধরে এই মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিক কাজ হিসেবে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে মডেল স্টাডি এবং মুসলিমপুরে ১২ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করে আবাসন ও রেস্ট হাউস নির্মাণ করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৬ হাজার ৯৯০ ফুট দীর্ঘ এই ব্যারাজে ১০০টি গেট থাকার কথা ছিল, যার পানি নির্গমণ ক্ষমতা ধরা হয়েছিল ২৫ লাখ কিউসেক। এর মাধ্যমে ১০টি জেলার ৬০ লাখ ৪০ হাজার একর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসার কথা ছিল। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর প্রকল্পটি পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে।

 

 

৪৫ বছর পর শুধু ভিত্তিপ্রস্তরটুকুই অবশিষ্ট পড়ে আছে। ছবি : এশিয়া পোস্ট
৪৫ বছর পর শুধু ভিত্তিপ্রস্তরটুকুই অবশিষ্ট পড়ে আছে। ছবি : এশিয়া পোস্ট

 

 

বর্তমানে সরকার এই প্রকল্পটিকে ভেড়ামারা থেকে সরিয়ে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে রাজবাড়ীর পাংশার হাবাসপুরে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নামে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে কুষ্টিয়াসহ আশপাশের অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই প্রকল্প যেন ভেড়ামারাতেই বাস্তবায়ন করা হয়।

ব্যারাজ এলাকার বাসিন্দা হীরা ও রহিমা বেগম বলেন, আমরা ভূমিহীন দরিদ্র মানুষ বলে ২৫ বছর ধরে এখানে ঘর তুলে আছি। ছোটবেলায় শুনতাম জিয়াউর রহমান এখানে ব্যারাজ করবেন, কাজও শুরু হয়েছিল। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর সব বন্ধ হয়ে যায়।

গঙ্গা বাঁধ বাস্তবায়ন কমিটির তৎকালীন সভাপতি ও বর্তমান জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক সহরাব উদ্দিন বলেন, মওলানা ভাসানীর ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের পর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই ব্যারাজ করার সাহসী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের যে পদক্ষেপ নিয়েছেন তা ইতিবাচক, তবে খেয়াল রাখতে হবে এই ঐতিহাসিক প্রকল্পের পেছনে যেন কোনো নতুন ষড়যন্ত্র না হয়।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, কোটি কোটি টাকার এই ঐতিহাসিক প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা বা কোনো নথিপত্র স্থানীয় কোনো দপ্তরে নেই।

কুষ্টিয়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বলেন, ১৯৮০ সালে ভেড়ামারায় গঙ্গা বাঁধ নামে একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল বলে আমরাও শুনেছি। তবে সেই প্রকল্পের কোনো ফাইল বা দাপ্তরিক নথি বর্তমানে এই কার্যালয়ে নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জাহিদুর রহমান বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এই প্রকল্প বা এর জমি বেদখল হওয়ার বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। বিষয়টি প্রথম আপনার কাছ থেকেই শুনলাম।