Anwar Hossain Manju(আনোয়ার হোসেন মঞ্জু)
শেখ হাসিনা তাঁর “আমার দেশ, আমার বাপের দেশ” ত্যাগ করার পর ১ বছর ১১ মাস কেটে গেছে। দিল্লি থেকে তিনি বার বার বলেছেন, তিনিই বাংলাদেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী। দেশেবিদেশে তাঁর অনুসারীরা আরও জোরেশোরে বলেছেন ও বলছেন, “শেখ হাসিনাকে প্রোটোকল মেনে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হেলিকপ্টার ও সামরিক বিমানে উঠিয়ে ভারতে পাঠানো হয়েছে। তিনি পালালেন কীভাবে?” বেশ কিছু ভারতীয় মিডিয়াও শেখ হাসিনার ‘পালানো’ বলতে নারাজ। তারাও ‘প্রোটোকল’ ও ‘রাষ্ট্রীয়’ বিমান ব্যবহার করার যুক্তিই দিয়েছেন। কথাগুলোকে “কানার সুখ মনে মনে” বলা হলে কি বাড়িয়ে বলা হবে?
ইদানিং ওপরের যুক্তিগুলোর আওয়ামী উচ্চারণ বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে দলটির ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনকে কেন্দ্র করে। আওয়ামী লীগ একটি বড় ও শক্তিশালী দল। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার পরও নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করা রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। তারা এখানে সেখানে মিছিল বের করবে, তা ঠেকানোর জন্য সরকার ৬ জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করে দলটিকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের দুর্বলতার প্রকাশ ঘটিয়েছে। অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, আওয়ামী লীগ যখনই দলটি ক্ষমতায় গেছে শক্তির দাপটে ধরাকে সরা জ্ঞান করে বার বার নিজেদের দু:খজনক পরিণতি ডেকে এনেছে। দলের নেতাকর্মীদের ওপর দুর্দশা নেমে এসেছে।
বাস্তবতা মানতে সমস্যা কোথায়? গণতন্ত্রের বাপ-মা হওয়ার দাবিদার দলের কি ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ এর মতো তামাশার নির্বাচন করার আদৌ প্রয়োজন ছিল। কোন দেশে কোন দল বা ব্যক্তি চিরদিন ক্ষমতায় ছিল? শেখ মুজিব কোনো এক সময় ভুট্টোর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “তুমি রিয়েলিটি মাইন্যা নেও, -- কারণ তোমার বারোটা বেজে গেছে।” কিন্তু রিয়েলিটি তিনি নিজে মানেননি, শেখ হাসিনাও মানেননি, আওয়ামী লীগাররাও মানেন না। ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’র কথাটি এখন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে পরিণত হয়েছে। একটি নির্বাচন হয়ে গেছে। নতুন সরকার এসেছে। সরকার যত দুর্বলই হোক না কেন, উপরোক্ত তিনটি নির্বাচনের মতো তামাশা করে তো ক্ষমতায় আসেনি। এই ‘রিয়েলিটি’ আওয়ামী লীগের কাছে রিয়েলিটি নয়, তাদের রিয়েলিটি হলো,‘শেখ হাসিনাই এখনও বাংলাদেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী’। “এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গভরা!”
এবার আসা যাক, ‘প্রোটোকল’ মেনে ও ‘রাষ্ট্রীয় বিমানযোগে’ শেখ হাসিনাকে দেশের বাইরে পাঠানো প্রসঙ্গে। গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি (২০২১), শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতায়াবা রাজাপাকসা (২০২২), সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ (২০২৪), নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি (২০২৫) কি জনগণের বিপুল জয়ধ্বনির মাঝে হাসিমুখে হাত নাড়তে নাড়তে বীরদর্পে হেঁটে হেঁটে দেশ ত্যাগ করেছিলেন? না, তারাও সামরিক বাহিনীর নিরাপত্তায় সামরিক হেলিকপ্টার ও বেসামরিক বিমানে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। শেখ হাসিনাকে প্রোটোকল দিয়ে, সামরিক হেলিকপ্টার ও সামরিক পরিবহন বিমানে ভারতে পাঠিয়ে ভুল করেননি সামরিক বাহিনীর সংশিষ্ট ব্যক্তিরা। তা না হলে হতাহতের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারত। যারাই তাদের দেশে উদ্ভুত পরিস্থিতি উপলব্ধি অস্বীকার করেছেন, যেমন, সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফি, তারা বেঘোরে মরেছেন। আল্লাহ শেখ হাসিনাকে রক্ষা করেছেন, তার সুস্থ দীর্ঘজীবন কামনা করি।
শেখ হাসিনার উচিত ছিল জীবন রক্ষা পাওয়ায় আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা এবং তার মেয়াদে যেসব ভুল, অন্যায় অবিচার হয়েছে, সেজন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। পালিয়ে যাওয়া শাসক, যারা সুযোগ পান, তারা তাই করেন। আফগানিস্তানের আশরাফ ঘানিকে কেমন বেকায়দা পরিস্থিতির মধ্যে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে? তিনিও যাওয়া আগে এক বিবৃতিতে বলেছেন: “আমি আফগানিস্তান ত্যাগ করছি, যাতে দেশে আর রক্তক্ষয় না ঘটে।” শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতায়াবা তো অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন। তার বিদায়ী বক্তব্য ছিল: “সাংবিধানিক উপায়ে রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছার পথ সুগম করার জন্য আমি পদত্যাগ করছি, যা আজ থেকে কার্যকর হবে।”
ইরান যেহেতু আমাদের প্রাচীন বন্ধুদেশ, ইরানের কথা, ইরানের সাহিত্য-সংস্কৃতির কথা আমাদের সবসময় মনে পড়ে। মনে পড়ে ইরান শাহের কথাও। ৪৭ বছর আগে ১৯৭৯ সালে অভ্যুত্থানের মুখে পালাতে হয়েছিল এশিয়ার অন্যতম পরাক্রমশালী শাসক, যুক্তরাষ্ট্রের মহামিত্র ইরানের শাহানশাহ রেজা পাহলভিকে। তাঁর রয়েল গার্ড বাহিনীর সদস্যরা তাকে প্রেটোকল দিয়ে বিমানবন্দরে নিয়ে যায় এবং তিনি তাঁর রাজকীয় বোয়িং এ উঠে ইরান ত্যাগ করেন। তাঁকে রাতের অন্ধকারে চুপিসারে পালাতে হয়নি। পালানোর দুই মাস আগে তিনি তার সর্বশেষ বেতার-টিভি ভাষণে বলেছিলেন:
“আমি গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে অঙ্গীকার করছি যে, অতীতের ভুল, অন্যায়, অবিচার এবং দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি হবে না, এবং এই ভুলগুলো সব দিক থেকে সংশোধন করা হবে… আমি অঙ্গীকার করছি যে শৃঙ্খলা ও শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর মৌলিক স্বাধীনতা ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে, যাতে বিপ্লবের দাবির সাথে সামঞ্জস্য রেখে সংশোধিত সংবিধান পুরোপুুরি বাস্তবায়িত হয়।”
দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া কোনো শাসক নির্বাসিত অবস্থান থেকে “দেখে নেওয়ার” হুমকি দিয়েছেন, এমন দৃষ্টান্ত বিরল। শেখ হাসিনা ও তার অনুসারীরা দেখে নেওয়ার কথা বলে প্রতিপক্ষকে উসকানি দিচ্ছেন। বাংলাদেশে গত ৫৬ বছর ধরে একে অন্যকে কেবল দেখেই নিচ্ছে। আর কতকাল এই দেখে নেওয়ার প্রতিযোগিতা চলবে?
বিশ্বের অনেক দেশে ইতিহাসের কোনো মোড়ে এমন শাসকের আবির্ভাব ঘটে, যাদের শাসনকালে মনে হয়, তারা অপ্রতিরোধ্য, তাদের পতন বা অপসারণ অকল্পনীয় ও অসম্ভব। কিন্ত বাড়াবাড়িই তাদের পতন অনিবার্য করে তোলে। অনেক দেশে দুর্বল শাসনও পতন ডেকে আনে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দুটি অবস্থাই প্রযোজ্য --- বাড়াবাড়িজনিত পতন এবং দুর্বলতাজনিত পতন।
ইয়া মাবুদ, তুমি দেশকে রক্ষা করো!
