Image description

ফুটবল বিশ্বের অন্যতম পরিচিত দৃশ্য হলো আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা ডোরাকাটা জার্সি। মাঠে নামলেই এই রঙের সমন্বয় যেন দেশটির ফুটবল ঐতিহ্য, গর্ব এবং আবেগের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই জার্সি শুধু একটি ক্রীড়া পোশাক নয়, বরং আর্জেন্টাইন পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর্জেন্টিনার সাফল্যের সঙ্গে এই জার্সির সম্পর্কও গভীর। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ থেকেই দলটি আকাশি-সাদা ডোরাকাটা জার্সি পরে খেলছে। সময়ের সঙ্গে নকশা ও প্রযুক্তিতে পরিবর্তন এলেও মূল রঙের ঐতিহ্য অটুট রয়েছে।

বর্তমানে আর্জেন্টিনার জার্সি তৈরি করে জার্মান ক্রীড়া সামগ্রী নির্মাতা এডিডাস। ১৯৯০ বিশ্বকাপ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি আর্জেন্টাইন ফুটবলের পোশাকসঙ্গী হিসেবে রয়েছে। মাঝখানে অল্প সময়ের বিরতি থাকলেও দুই পক্ষের সম্পর্ক এখনো অব্যাহত।

 
 

চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন জার্সিতেও রাখা হয়েছে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী আকাশি-সাদা ডোরাকাটা নকশা। শুধু তাই নয়, দেশটির বিশ্বকাপজয়ী তিনটি স্মরণীয় আসর- ১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২ সালের জার্সির বিভিন্ন উপাদানের অনুপ্রেরণাও এতে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে এই জার্সি হয়ে উঠেছে অতীতের গৌরব ও বর্তমানের উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক প্রতীকী মিশ্রণ।

 
 

আর্জেন্টিনার জার্সি নিয়ে আলোচনা হলে শুধু শার্ট নয়, শর্টসের ইতিহাসও সামনে আসে। শুরুর দিকে দলটি গাঢ় নীল শর্টস পরে খেলত। তবে ১৯৭৮ সালের পর ধীরে ধীরে কালো শর্টস ব্যবহার শুরু হয়, যা পরবর্তীতে দলের স্থায়ী পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়।

 

আর্জেন্টিনা আর বিশ্বকাপ, দুটো কথা এলে যে একটি গোলের নাম আসবেই, সেটা হলো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’। কিন্তু সেই ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের জার্সির গল্পটাও কিন্তু কম রোমাঞ্চকর নয়। সেবার মেক্সিকোতে আর্জেন্টাইনদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল তাপমাত্রা আর আর্দ্রতা। আকাশি-সাদা ডোরাকাটা মূল জার্সিতে খুব একটা সমস্যা নেই। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তো আর সেই জার্সিতে নামা যাবে না, তাই পরতে হবে গাঢ় নীল রঙের দ্বিতীয় জার্সি। কিন্তু তা নিয়েই বিপত্তি।

অতিরিক্ত গরমের মধ্যে সে জার্সি গায়ে চাপানোই দায়। পাতলা কাপড়ের নতুন জার্সি বানানোরও সময় নেই। কোচ কার্লোস বিলার্দো সহকারী রুবেন মোশেল্লাকে পাঠালেন মেক্সিকো সিটির দোকান ঘুরে যদি কোনো নীল রঙের একটু আরামদায়ক কাপড়ের জার্সি পাওয়া যায়। মোশেল্লা হাজির হলেন অপেক্ষাকৃত দুটি পাতলা জার্সি নিয়ে। সেখান থেকে অধিনায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনা একটি হাতে নিয়ে বললেন, ‘এটা গায়ে জড়িয়েই আমরা ইংল্যান্ডকে হারাব।’

সেই দোকান থেকেই আরও ৩৮টি ওই রকম জার্সি কিনে আনা হলো। তড়িঘড়ি করে প্রতিটিতে সেলাই করে লাগানো হলো আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ব্যাজ। কয়েক ঘণ্টা পরে সেই জার্সি গায়েই মাঠে নামল আর্জেন্টিনা দল। আর সেদিনের সেই কোয়ার্টার ফাইনালে কী হয়েছিল তা তো আর বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই! ম্যারাডোনার হ্যান্ড অব গড আর গোল অব দ্য সেঞ্চুরি—দুটো গোলেই ইতিহাস হয়ে আছে মেক্সিকোর গলি-ঘুপচি ঘুরে বের করে আনা সেই গাঢ় নীল রঙের পাতলা জার্সি।

পরবর্তীতে সেই ম্যাচেই জন্ম নেয় ফুটবল ইতিহাসের দুটি সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত- ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। আর সেই সঙ্গে কিংবদন্তির অংশ হয়ে যায় হঠাৎ করেই সংগ্রহ করা গাঢ় নীল জার্সিটিও।

আজ আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সি শুধুই একটি ইউনিফর্ম নয়। এটি বিশ্বকাপ জয়, ম্যারাডোনার জাদু, লিওনেল মেসির নেতৃত্বে নতুন সাফল্য এবং কোটি সমর্থকের আবেগের প্রতীক।