লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ভাড়া বাসায় নৃশংসভাবে হত্যার শিকার একই পরিবারের চার সদস্যের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মা ও তিন বোনের জানাজায় অভিভাবক হয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলেন তরুণ জুনায়েদ ইসলাম শিফাত। জানাজার নামাজ শেষে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তার একটাই আবেদন, ‘আমি এই হত্যার সঠিক বিচার চাই।’
শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেলে সাড়ে ৫টার দিকে পৌরসভার ধানহাটা এলাকায় জানাজা শেষে মরদেহগুলো কুমিল্লার হোমনা উপজেলার গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে নেওয়া হয়।
জানাজার আগে একমাত্র জীবিত সন্তান শিফাত বলেন, ‘আমি এই হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই। নিহত অন্তর মজুমদার ছাড়াও যদি অন্য কোনো ঘাতক থেকে থাকে, তাদেরও দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে। সবাই আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবেন।’
জানাজায় বক্তব্য দেন পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র এবিএম জিলানি, সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম লিটন, বিএনপি নেতা শফিকুল আলম আলমাস, পৌর জামায়াতের আমির ফজলুল করিম এবং রায়পুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ। এতে প্রায় দেড় হাজার মানুষ অংশ নেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে চট্টগ্রাম বিভাগের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করছে পুলিশ, সিআইডি ও র্যাব। এ ঘটনায় রায়পুর থানায় পৃথক দুটি হত্যা মামলা হয়েছে।
শুক্রবার দুপুর আড়াইটার দিকে মা ও তিন মেয়ের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে তাদের মরদেহ পুলিশের মাধ্যমে শিফাতের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
অন্যদিকে অভিযুক্ত হিসেবে গণপিটুনিতে নিহত অন্তর মজুমদারের মরদেহ তখনও সদর হাসপাতালের হিমঘরে ছিল। তাঁর কোনো স্বজন বা পরিচিত ব্যক্তি মরদেহ নিতে আসেননি বলে জানান হাসপাতালের চিকিৎসক অরূপ পাল।
শুক্রবার দুপুর ৩টার দিকে নিহত শাহিনুর বেগমের ছেলে জুনায়েদ ইসলাম শিফাত বাদী হয়ে নিহত অন্তর মজুমদারসহ অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা করেন।
এ ছাড়া ঘটনার দিন অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে উদ্ধার করতে গিয়ে ইটপাটকেলের আঘাতে সাত পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার ঘটনায় থানার তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল মান্নান অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে আরেকটি মামলা করেন।
নিহত অন্তর মজুমদার (৩০) নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার কার্তিক মজুমদারের ছেলে। তার বন্ধু হাবিব জানান, অন্তর লক্ষ্মীপুর সদরের উত্তর তেহমনি এলাকার খোরশেদের ফলের আড়ত থেকে ফল কিনে রায়পুর শহরে এনে ভ্রাম্যমাণভাবে বিক্রি করতো।
তার ভাষ্য, হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারটির সঙ্গে অন্তর মজুমদারের সম্পর্ক কী ছিল, কিংবা কী কারণে এই নৃশংস ঘটনা ঘটল—এ প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। স্থানীয়ভাবে কেউ কেউ লেনদেন-সংক্রান্ত বিরোধের কথা বললেও পুলিশ এখনো বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
সহকারী পুলিশ সুপার (রায়পুর সার্কেল) আবদুর রাশেদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। কী কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেটি এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে রহস্য উদঘাটন করা যাবে বলে আশা করছি।’
এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা ডাকাতিয়া নদীপাড় এলাকায় আমির হোসেন মাস্টারের পাঁচতলা ভবনের নিচতলার একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা অন্তর মজুমদার গৃহবধূ শাহিনুর বেগম এবং তার তিন মেয়ে—সায়মা আক্তার, ইকরা আক্তার ও শিফা আক্তারকে দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করেন। ঘটনাস্থলেই শাহিনুর বেগম (৩৮) ও বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২০) মারা যান। পরে গুরুতর আহত শিফা আক্তার (৯) ও ইকরা আক্তারকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাদেরও মৃত্যু হয়।

