গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯ জন। এ নিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু দাঁড়াল ৬৯৮-এ। এরমধ্যে সন্দেহজনক হামে মারা গেছে ৬০৫ জন। আর নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৯৩ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিন থেকে হামের এই চিত্র উঠে এসেছে। দেশে হামের প্রাদুর্ভাব হওয়ার পর গত ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নতুন করে হামের হিসাব রাখছে।
অপরদিকে, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও এক ব্যক্তি মারা গেছে। এ নিয়ে চলতি সপ্তাহে মশাবাহিত রোগে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬-এ। আর এ মাসে মারা গেছে ৮ জন, যা আগের মাসের তুলনায় আটগুণ বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোলরুমের দেওয়া তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র।
হামের পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় আতঙ্কে সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে বেশি ভয়ে আছেন কম বয়সী শিশুদের অভিভাবকরা। কিছুদিন আগেই হাম সেরেছে এক বছর বয়সী অমিত আহমেদের। অমিতের শরীরে আয়রনের পরিমাণও কম। ডেঙ্গু বাড়ার পরে অমিতকে নিয়ে রীতিমতো উদ্বেগে আছেন বাবা-মা।
অমিতের মা ছালমা বেগম বলছেন, ‘অনেক চেষ্টা করেও অমিতকে হাম থেকে দূরে রাখতে পারিনি। ওর শরীর এখনো খুব দুর্বল। হাম-পরবর্তী জটিলতায় ভুগছে। এর ওপর যদি ডেঙ্গু হয় তখন কী পরিস্থিতি হবে ভেবে সারাক্ষণ ভয়ে থাকি।’
এ বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, ‘মার্চ থেকে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে। হামে আক্রান্ত ব্যক্তিদের, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে। এ ছাড়া এদের অনেকে হাম-পরবর্তী জটিলতায় ভুগছে। এরা নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে।’
মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার পাশপাশি এদের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতাও বেশি হবে বলে মন্তব্য করেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে হামের রোগীর খবর আসতে শুরু করে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মার্চ থেকে হাম নিয়ে জরুরি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গে মারা যাওয়া ৯ ব্যক্তির মধ্যে সাতজনই ঢাকার। ////তবে নিশ্চিত মৃত্যু শূন্য। গত কয়েকদিন ধরে নিশ্চিত মৃত্যু শূন্য রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গ আক্রান্তের সংখ্যা ৮৯৩ জন। এর মধ্যে ৫২ নিশ্চিত রোগী। হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৮ হাজার ৫৩৫ জন। এরমধ্যে এ পর্যন্ত ১১ হাজার ৪৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ইকবাল বলছেন, ‘বর্ষা মৌসুমে মশার প্রজনন বেশি থাকে। সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তবে বর্ষাকাল প্রলম্বিত হলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তখন অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীর দেখা মিলতে পারে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, জুন আসতেই ডেঙ্গু তার ভয়াবহ রূপ চেনাতে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৯৮ রোগী। এই সপ্তাহে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আগের তুলনায় বেশিসংখ্যক মানুষ ভর্তি হয়েছে, ///৮৩৫ জন। চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫৫১৫ জন। এরমধ্যে জুন মাসেই ২৩১৮ জন।
জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাসে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু ১৩। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা, ময়মনসিংহের তিনজন, একজন করে বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের। আরেকজন ঢাকায় মারা গেলেও তিনি এখানকার বাসিন্দা নন।
প্রায় চার দশক ধরে জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন মোহাম্মদ ইকবাল। তিনি বলছেন, ‘এ বছর বৃষ্টি বেশি হচ্ছে, ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বেশি থাকবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়বে।’
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জানাচ্ছেন, হামের জন্য হাসপাতালে যেমন পৃথক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, ডেঙ্গুর জন্যও পৃথক ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশপাশি মৃত্যু কমাতে দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে। আবার রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে রোগীর অনুপাতে হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, শয্যার ব্যবস্থা রাখতে হবে।