প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে চীন সফরে রয়েছেন। তবে দেশের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু মালয়েশিয়া। বিশেষ করে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফর নিয়ে তৈরি মাত্র ২ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওটিতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে জনপ্রিয় বাংলা গান ‘আমার বন্ধু মহাজাদু জানে’। ভিডিওতে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং দুই নেতার আন্তরিক সম্পর্কের বিভিন্ন মুহূর্ত তুলে ধরা হয়েছে। শুরুতেই দেখা যায়, পুত্রজায়ার পারদানা পুত্রা ভবনে তারেক রহমানকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে।
ভিডিওটিতে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের সঙ্গে একযোগে কাজ করার বিষয়ে আনোয়ার ইব্রাহিমের অঙ্গীকার। এই বক্তব্যই ছিল পুরো ভিডিওতে সংগীতের বাইরে শোনা একমাত্র বক্তব্য।
২৩ জুন সকালে আনোয়ার ইব্রাহিমের ফেসবুক পেজে ভিডিওটি প্রকাশের পরপরই তা ভাইরাল হয়ে যায়। একই দিনে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ভিডিওটি তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে। এরপর দেশের বিভিন্ন মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও এটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জনসংযোগ কৌশলের প্রশংসা করেন। তাদের মতে, একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফরকে জনপ্রিয় বাংলা গানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী করে তোলা হয়েছে।
তবে ভাইরাল এই ভিডিওর আড়ালে ২১ ও ২২ জুনের মাত্র ১৮ ঘণ্টার মালয়েশিয়া সফর থেকে আসলে কী অর্জন করেছে বাংলাদেশ?
গত ফেব্রুয়ারিতে বিপুল সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের পর এটি ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর। ভারত, চীন, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে আমন্ত্রণ পেলেও প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে অর্থনৈতিক কূটনীতির পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কৌশলও ছিল।
২২ জুন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরে প্রতিনিধিদল পর্যায়ের বৈঠক এবং যৌথ সংবাদ সম্মেলন হয়। সংবাদ সম্মেলনে আনোয়ার ইব্রাহিম জিয়া পরিবারের সঙ্গে তাঁর পুরোনো সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করেন এবং তারেক রহমানের রাজনৈতিক ত্যাগেরও প্রশংসা করেন।
সফর শেষে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া ৩৩ দফা যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে, যেখানে ৯টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতার রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল মালয়েশিয়ার বন্ধ শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় চালু করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির রাজা সুলতান ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে শ্রমবাজার খুলে দেওয়া, অভিবাসন ব্যয় কমানো, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা এবং অনিয়মিত বা আটক বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধ কাঠামোর আওতায় আনার অনুরোধ জানান।
জবাবে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, শ্রমিকদের শোষণ কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। ভবিষ্যতে শ্রমিক নিয়োগ হবে খাতভিত্তিক চাহিদা অনুযায়ী এবং পুরো প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক। এ লক্ষ্যে দুই দেশ বিদ্যমান শ্রম চুক্তি (এমওইউ) সংশোধন করে নতুন চুক্তি সইয়ের জন্য দ্রুত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়।
যৌথ বিবৃতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতিতেও সহযোগিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ তার দ্রুত বিকাশমান তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রকৌশল খাতকে মালয়েশিয়ার উন্নত সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি ও টেস্টিং (ওস্যাট) শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব দেয়। এজন্য একটি ‘ট্যালেন্ট কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ গঠনেরও প্রস্তাব করা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ বর্তমানে মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। এই সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ২০২৭ সালের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের বেসরকারি খাতের সহযোগিতা বাড়াতে মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল গঠন করা হচ্ছে।
বিশ্বের দ্রুত প্রসারমান হালাল অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ বাড়াতে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট বিভাগের (জাকিম) সহযোগিতা চেয়েছে। এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে নোট বিনিময় হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের হালাল সনদ প্রদান, গবেষণা এবং পণ্য উৎপাদন সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
সফরকালে তারেক রহমান মালয়েশিয়ার শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী পেট্রোনাস, অ্যাক্সিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পেরোদুয়া এবং এমএমসি পোর্টসের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পেট্রোনাস ও পেট্রোবাংলার মধ্যে এলএনজি সরবরাহ ও অবকাঠামো উন্নয়নসংক্রান্ত সমঝোতার পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়।
ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় সাফল্য ছিল আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়ার প্রকাশ্য সমর্থন পাওয়া। একই সঙ্গে আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য জোট আরসিইপিতে যোগদানের ক্ষেত্রেও কুয়ালালামপুর বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে মালয়েশিয়া আগের মতোই বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। দেশটি জানিয়েছে, আসিয়ানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তারা মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে, যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরতে পারে।
এ ছাড়া ফিলিস্তিন সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মানবপাচার প্রতিরোধ, জাতিসংঘ ও ওআইসিতে সমন্বিত উদ্যোগ, উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, যৌথ গবেষণা, পর্যটন ও চিকিৎসা পর্যটন সম্প্রসারণেও সহযোগিতা জোরদারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সফরকালে সাংস্কৃতিক বিনিময় বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত দুটি নোট বিনিময় হয়। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি বাস্তবায়ন এবং একটি যৌথ প্রতিরক্ষা রোডম্যাপ তৈরির জন্য যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। সামরিক বিজ্ঞান, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়েও একমত হন দুই নেতা।
২২ জুনের ব্যস্ত কর্মসূচি শেষে তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। এরপর তিনি চীনের দালিয়ান শহরের উদ্দেশে রওনা হন।
এখন দেখার বিষয়, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ভাইরাল ভিডিওতে বাজতে থাকা ‘আমার বন্ধু মহাজাদু জানে’ গানটি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই আলোড়ন তোলে, নাকি এই সফরের কূটনৈতিক অর্জনও ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও তারেক রহমানের জন্য সত্যিই কোনো ‘মহা জাদু’ দেখাতে পারে।
(দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)