বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে বিদেশি পতাকা ওড়ানোর সংস্কৃতি নতুন নয়। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি বা ফ্রান্সের সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরে নিজের দলের পতাকা টানিয়ে আসছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাদা ও কালো রঙের পতাকা উড়তে দেখা যাওয়ায় নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ‘কালেমার পতাকা’ নামে প্রচারিত এসব পতাকার নকশা ও ব্যবহার নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার চেয়ে পতাকাধারীদের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার আহ্বানই বেশি।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাওয়া এসব পতাকার নকশা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, সাদা পটভূমিতে কালো আরবি ক্যালিগ্রাফি ও কালো পটভূমিতে সাদা লেখার দুটি ধরন যথাক্রমে আফগানিস্তানের তালেবান প্রশাসন এবং আল-কায়েদাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের ব্যবহৃত প্রতীকের সঙ্গে মিলে যায়। একটি পতাকায় সাদা পটভূমিতে কালো আরবি হরফে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, অন্যটিতে কালো পটভূমিতে সাদা হরফে একই বাক্য লেখা রয়েছে।
কালোর ওপর সাদা হরফে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ লেখা পতাকা আল-কায়েদার বিভিন্ন শাখাও ব্যবহার করে। তালেবানের পতাকায় আরবিতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ যে ক্যালিগ্রাফিতে লেখা, একই ক্যালিগ্রাফি ও নকশায় বানানো পতাকা ওড়াতে দেশে দেখা যাচ্ছে। দেশে দুটি পতাকা ব্যবহার করে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীর। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হিযবুত তাহরীর ঢাকার বায়তুল মোকাররম থেকে ‘মার্চ ফর খিলাফত’ কর্মসূচি পালনের সময় এ দুই ধরনের পতাকা ব্যবহার করে।
অভিজ্ঞদের মতে, এসব পতাকা ওড়ানোর সঙ্গে সীমান্তে পুশইন, ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের বাংলাদেশে হামাসের তৎপরতা বাড়ছে—এমন মন্তব্য, ইউনূস সরকারের আমলে তালেবান সরকারের প্রভাবশালী কর্মকর্তা মোল্লা নূর আহমদ নূর ওরফে মোল্লা জাওয়ান্দির নীরবে ঢাকা সফর এবং আরেক আফগান জঙ্গি নিয়ামাতুল্লাহ মাঙ্গালের রহস্যজনকভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করা—সব একসূত্রে গাঁথা। হামাসের দুই শীর্ষ নেতা পাকিস্তানের বিতর্কিত এক রাজনীতিকের সঙ্গে গোপনে ঢাকা সফর করে গেছেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে বলছে বিদেশি গণমাধ্যম ও গবেষণা সংস্থা। সাবেক ইউনূস সরকারের আমলে তালেবান ও হামাস নেতাদের গোপনে ঢাকা সফরের ঘটনা যখন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক সেই সময় সামনে এলো সাদা-কালো পতাকায় দেশ সয়লাব হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এক ভিডিও বক্তব্যে মুফতি হারুন ইজহার ‘কালেমার পতাকা’ ওড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা সব জায়গায় কালেমার পতাকা লাগায়ে দেবেন। এখন যদি এটা জঙ্গিবাদ হয়ে থাকে, তাহলে আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল—এগুলোর সব পতাকা নামাতে হবে। এগুলো যেখানে থাকবে, কালেমার পতাকাও থাকবে আমাদের।’
‘আল কুরআনের দারস’ নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ১৩ জুন প্রকাশিত একটি ভিডিওতে হারুন ইজহার বিদেশি পতাকার পরিবর্তে কালেমা-খচিত পতাকা ব্যবহারের ওই আহ্বান জানান। এরপর রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সাদা-কালো পতাকা লাগানো, মিছিল, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা ও প্রকাশ্য প্রদর্শনের ঘটনা বাড়তে থাকে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কয়েকজন অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতা, ধর্মীয় বক্তা ও সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক সংগঠনের সদস্য এসব কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। তাদের কেউ কেউ নিজেদের পেজের মাধ্যমে পতাকা বিক্রি ও বিতরণের প্রচারও করছেন। তবে তাদের পেছনে কারা আছেন বা তারা কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কি না, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এখনো কোনো তথ্য নেই।
গত ১৭ জুন হিজরি নববর্ষ উপলক্ষে ঢাকার শনিরআখড়ায় ১৫ থেকে ২০ তরুণ শোডাউন করেন। সেখানে সাদা-কালো পতাকা প্রদর্শন করা হয়। পরে যাত্রাবাড়ীর হানিফ ফ্লাইওভারে সারিবদ্ধভাবে এসব পতাকা টাঙানো হয়। শোডাউনের আয়োজক এবং পরে ফ্লাইওভারে পতাকা টাঙানোর ওই দলে ছিলেন তামীম আল আদনান। ফেসবুকে তিনি ‘টক অব ইনসান’ নামে পেজ পরিচালনা করেন। পতাকা টাঙানোর দলে ছিলেন জাহিদুল ইসলাম মিরাজ। তার ‘আস সিদক’ নামে ফেসবুক পেজ রয়েছে। তাদের আরেকজন এনামুল হাসান ফেসবুকে ‘ইবারাহ’ নামে পেজ পরিচালনা করেন। শোডাউন ও পতাকা টাঙানোর কাজে নেতৃত্ব দেন রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের শরিয়াহ গ্র্যাজুয়েশন ইনস্টিটিউটের শিক্ষক মাওলানা বায়েজিদ খান। এ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি হারুন ইজহার। ‘ইবারাহ’ ও ‘আস সিদক’ পেজ থেকে নিয়মিত সাদা-কালো পতাকা বিক্রি করা হচ্ছে।
১৭ জুন রাত ১২টা ৫৮ মিনিটে এনামুল হাসান যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার থেকে লাইভে জানান, পতাকা লাগানোর এ কাজে ‘দাওয়াহ ফাউন্ডেশন’ তাদের সহযোগিতা করছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে চালু হওয়া এ ফাউন্ডেশনের ফেসবুক পেজ ঘেঁটে অর্থায়নের সত্যতা পাওয়া গেছে। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো ক্যাম্পেইনের অর্থ জোগান দেওয়া হয়েছে বলে এক পোস্টে উল্লেখ রয়েছে।
সম্প্রতি সারাদেশে ১০ হাজার পতাকা উড়ানোর ঘোষণা দেয় ‘সাদাক্বাহ প্রজেক্ট’। ২০ জুন রাতে রাজধানীর শাপলা চত্বরে তারা পতাকা লাগায়। সংগঠনটির অ্যাডমিন আমিনুল হক লাইভে জানান, শাপলা চত্বর থেকে বায়তুল মোকাররম হয়ে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত পতাকা লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পরে ৫ হাজার বিনামূল্যে এবং ৫ হাজার পতাকা বিনা লাভে বিতরণের তথ্য জানানো হয়।
একই সময়ে ‘দাওয়াহ ফাউন্ডেশন’ জানায়, রাতে লাগানো পতাকাগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তারা এ ঘটনাকে ‘ইসলামবিদ্বেষী’ কাজ বলে দাবি করে নতুন করে পতাকা লাগানোর ঘোষণা দেয়। ‘সাদাক্বাহ প্রজেক্ট’-এর অ্যাডমিন আমিনুল হকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে রাজধানীতে দুটি মামলা রয়েছে। তিনি ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল কাশিমপুর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান। এ ছাড়া নুসাইবা শপ, আত তিজারাহ, মুসলিমবঙ্গ, শাইখুনা মিডিয়ার ফেসবুক পেজ থেকে পতাকা বিক্রি এবং প্রচারের কাজ করা হচ্ছে।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ফ্লাইওভার ও জনসমাগমস্থলে এসব পতাকা দেখা যাওয়ার পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দাবি, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর পতাকার সঙ্গে দৃশ্যমান সাদৃশ্য থাকায় বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ঢাকার বাইরে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, সাভার, ফরিদপুর ও পাবনাসহ বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের পতাকা প্রদর্শনের খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশে এসব পতাকা দেখা গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিছু স্থানে ব্যবহৃত পতাকার নকশা তাদের নজরে এসেছে। বিশেষায়িত সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাদা-কালো পতাকা নিয়ে প্রথম প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায় হিযবুত তাহরীরকে। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুদিন পর ৭ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে সভা করতে দেখা যায় সংগঠনটিকে। সাদা-কালো কাপড়ে কালেমা লেখা পতাকা, খিলাফতের দাবি-সম্বলিত ব্যানার-লিফলেট নিয়ে শতখানেক কর্মী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। একই দিনে সংগঠনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে একটি সভা করে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর হিযবুত তাহরীর ঢাকা ও এর বাইরে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও মিছিল করে। বিভিন্ন জায়গায় স্টল দিয়ে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করে। এমনকি একই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ডেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানায় হিযবুত তাহরীর। ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের আমলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কালেমা-খচিত কালো পতাকা নিয়ে মিছিলের বেশ কিছু ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব মিছিল থেকে ফিলিস্তিনে গণহত্যা বন্ধ, মহানবী মুহাম্মদকে (সা.) কটূক্তির প্রতিবাদ বা ইসলামি খেলাফত কায়েমের দাবি তোলা হয়। এসব ছবি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে অনেকে দাবি করেন, ওই পতাকা ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠীর। দেশে ইসলামি খেলাফত কায়েম করতেই তারা এসব পতাকা নিয়ে মিছিল করছে। তবে আরেকটি পক্ষ বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের বক্তব্য, কোনো রাজনৈতিক ইন্ধনে এসব করা হয়ে থাকতে পারে।
সাবেক একাধিক নিরাপত্তা কর্মকর্তার মতে, এটি বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়; সংগঠিতভাবে একটি নির্দিষ্ট প্রতীককে সামনে আনার চেষ্টা হতে পারে। তবে পতাকা প্রদর্শনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দাবি, এটি কোনো রাজনৈতিক বা উগ্রবাদী বার্তা নয়; বরং ইসলামি পরিচয় ও হিজরি নববর্ষ উপলক্ষে ধর্মীয় আবহ তৈরির প্রচেষ্টা।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতীকের অর্থ তার ব্যবহারের প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন কোনো উগ্রবাদী মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত প্রতীক ব্যবহার করলে ভুল বার্তা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিদেশি কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বৈশ্বিক গণমাধ্যমের নজরে এ ধরনের দৃশ্য পড়লে দেশের ভাবমূর্তির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ধর্ম ও রাজনীতি গবেষকরা বলছেন, কালেমা মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত বিষয়। কিন্তু সেটি যখন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রতীক বা সংগঠনভিত্তিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন এর নতুন অর্থ তৈরি হয়। ফলে ধর্মীয় অনুভূতি ও রাজনৈতিক প্রতীকের ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
খেলাফত ও জঙ্গিবাদ গবেষকদের মতে, মুহাম্মদের (সা.) যুগে কোনো নির্দিষ্ট পতাকা ইসলামের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পায়নি। পরবর্তী খেলাফতের কিছু সময়ে কালেমা লেখা কালো পতাকার ব্যবহার দেখা গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শাফি মো. মোস্তফা বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে এসব পতাকা ব্যবহার করতে দেখি কথিত ইসলামিক স্টেট বা আইসিস গোষ্ঠীকে। দেশে এখন এ ধরনের পতাকার ব্যবহার করলে এক ধরনের ট্যাগিংয়ের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকবেই।”
বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবল সমর্থকদের পতাকা মূলত খেলাধুলাভিত্তিক পরিচয় ও আবেগের প্রকাশ। অন্যদিকে সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে ব্যবহৃত পতাকাগুলোকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার উৎস রাজনৈতিক প্রতীক, আদর্শিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কিছু সংগঠনের সঙ্গে নকশাগত মিল। ফলে দুটি বিষয়কে একই পাল্লায় মাপা কঠিন।
বাংলাদেশ অতীতে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—দেশে আদর্শিক প্রভাব বিস্তারের নতুন কোনো ধারা তৈরি হচ্ছে কিনা। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুরুতেই গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।