Image description

আইনের শর্ত পূরণ হয় না, তবু বগুড়ায় স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনি আসন বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা ইউনিয়নকে পৌরসভায় রূপান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ইউনিয়নের একটি অংশকে শহর ঘোষণার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আপত্তি থাকলে এক মাসের মধ্যে তা লিখিতভাবে তোলার জন্য বলা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও স্থানীয় প্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। কিন্তু সরকার তা গ্রহণ করেনি। পরে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আরও একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়।

ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফাহিমা বেগম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের এটি বাণিজ্যিক এলাকা, এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য বেশি হয়। এজন্য আমরা পৌরসভা হওয়ার জন্য আবেদন করেছি মন্ত্রী (প্রতিমন্ত্রী) হওয়ার পর।’

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারে থাকার সময়ও আরেক দফা আবেদন এবং আওয়ামী লীগ শাসনামলেও দেন ‘ধরনা’ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

পৌরসভা আইন অনুযায়ী অবশ্য এই আবেদন গ্রহণের সুযোগ ছিল না। স্থানীয় সরকার পৌরসভা আইন ২০০৯ অনুযায়ী কোনো এলাকাকে শহর ঘোষণা করতে হলে যে চারটি শর্ত পূরণ হতে হয়।

শর্তগুলো হলো–তিন চতুর্থাংশ ব্যক্তি অকৃষি পেশায় নিয়োজিত, শতকরা ৩৩ ভাগ ভূমি অকৃষি প্রকৃতির, জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে দেড় হাজারের কম নয় এবং জনসংখ্যা ৫০ হাজারের কম হবে না।

মোকামতলা ইউনিয়ন পরিষদের ওয়েবসাইটে ২০১১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা দেওয়া আছে প্রায় ৩০ হাজার ২৮৮ জন।

বর্তমান জনসংখ্যা কত–এই প্রশ্নে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফাহিমা বেগম বলেন, ‘৪০ হাজারের কাছাকাছি হবে।’

তবে ইউনিয়নের পুরোটা এলাকা নিয়ে পৌরসভা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২৪টি মৌজার মধ্যে ১০টিকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

ফাহিমা বলেন, এসব এলাকায় জনসংখ্যা ২০ হাজারের মতো হবে।

মোকামতলা ঢাকা-দিনাজপুরে মহাসড়কের হাইওয়ের পাশে একটি ব্যবসা কেন্দ্র। আশেপাশের এলাকায় উৎপন্ন আলু হয়, ধান হয়, সবজির পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্র আছে এখানে। এর বাইরেও আছে অন্যান্য ব্যবসা। তারপরেও জনসংখ্যার তিন চতুর্থাংশ অকৃষিজীবী নয়।

ফাহিমা জানান, তার এলাকার ৫০ শতাংশ মানুষ ব্যবসায়ী, বাকি অর্ধেকের কৃষিজীবী বেশি। তবে চাকরিজীবীও আছে।

‘বাণিজ্যিক কেন্দ্র বলে সেখানে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান এবং স্কুল-কলেজও আছে’, বলেন তিনি।

গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, টিএমএসএস, এসএসএসের মতো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা-এনজিওর কার্যক্রমও আছে এই এলাকায়।

কেন আপনারা পৌরসভা হতে চান–এই প্রশ্নে ফাহিমা বলেন, ‘রাস্তা-ঘাট-ড্রেন-কালভার্টের সমস্যা। সবসময় কাদা থাকে, এই অবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য খারাপ হয় না?’

পৌরসভা হলে তো কর বাড়বে-বিষয়টি স্মরণ করালে তিনি বলেন, ‘কর বাড়বে। সুবিধাও বাড়বে।’

এলাকাটি শিবগঞ্জ উপজেলার মধ্যে পড়েছে। সেখানকার নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান টাইমসের প্রশ্নে পৌরসভায় উন্নীত হওয়ার আবেদনের বিষয়ে বলেন, ‘জনপ্রতিনিধিদের আবেদন থাকে। আমরা সেটি মন্ত্রণালয়ে পাঠাই।’

কিন্তু পৌরসভায় উন্নীত হতে হলে যে শর্ত লাগে, সেগুলো যে মোকামতলা পূরণ করে না এবং তাকে শর্তগুলো পড়ে শোনানো হলে লাইন কেটে দেওয়ার আগে ইউএনও বলেন, ‘আপনি যেভাবে বলছেন, আমার তো মুখস্ত নেই। আমি দেখে বলছি।’ তবে এরপর তার তিনি কল করেননি।

শর্ত পূরণ ছাড়াই বগুড়ায় অনেক পৌরসভা

শর্ত পূরণ না করার পরেও কোনো এলাকাকে পৌরসভা ঘোষণার বিষয়টি বাংলাদেশে নতুন নয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় আইন উপেক্ষা করে এলাকাকে শহর ঘোষণা হয়ে আসছে বরাবর। এমনকি আড়াই বা ৩ হাজার ভোট পেয়ে মেয়র হয়েছেন, এমন উদাহরণও আছে।

বগুড়ায় যে ১১টি পৌরসভা আছে, সেখানেও শর্ত উপেক্ষার উদাহরণ দেখা যায়। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত কাহালু পৌরসভার জনসংখ্যা ২৬ বছর পর এসে ২২ হাজারের কিছু বেশি বলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে উল্লেখ আছে।

একই জেলার সারিয়াকান্দি পৌরসভার জনসংখ্যা ১৭ হাজারের কিছু বেশি, আয়তনও চার বর্গকিলোমিটারের কম। নন্দিগ্রামের জনসংখ্যা ১৭ হাজারেরও কম।

সোনাতলা পৌরসভার ওয়েবসাইটে পরিচিতি হিসেবে লেখা আছে, ‘অত্র পৌরসভার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ধান চাষ। এ ছাড়া গম, মরিচ, পাট, আখ, সরিষা এছাড়া বিভিন্ন ধরনের সবজি এবং কলা চাষ করে থাকেন।’

এই পৌরসভার জনসংখ্যাও ২২ হাজারের কম বলেই উল্লেখ আছে।

শিবগঞ্জ পৌরসভার জনসংখ্যা শর্তের অর্ধেক ২৫ হাজারেরও কম। জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী দুপচাঁচিয়া পৌরসভার মোট জনসংখ্যা ২৯ হাজারও ছিল না। একই উপজেলার তালোড়া পৌরসভার জনসংখ্যা ২০ হাজারের কিছু বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফা টাইমসকে বলেন, ‘পৌরসভা করার পেছনে মূলত মর্যাদাবোধ কাজ করে। যারা সেখানে বসবাস করে, তারা ভাবেন তাদের মর্যাদা বাড়ল, আর যারা পৌরসভা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন, তাদেরও নামটা ছড়ায়।’

‘সি’ ক্যাটাগরির এসব পৌরসভা আর ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে আসলে কোনো পার্থক্য নেই বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এই যে ইউনিয়ন মেম্বারের বদলে কমিশনার আর চেয়ারম্যানের বদলে মেয়র বলা যায়।’

পৌরসভা পরিচালনার খরচ স্থানীয়ভাবে জোগাড় করার কথা। তবে সেটা সাধারণত হয় না। ফলে মেয়রের গাড়ি থেকে শুরু করে খরচের একটি বড় অংশ সরকার থেকেই দেওয়া হয়। এমনকি পৌরসভাগুলো বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুৎ বিলও দিতে পারছে না।

মোকামতলা কেন আলোচনায়

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনি এলাকা যে দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত, তার একটি মোকামতলা। তিনি ক্ষমতায় আসার পরই দ্বিতীয় উপজেলাটি গঠিত হয়। আর এর নতুন চারটি ইউনিয়ন গঠনের পর এর নামকরণ নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

প্রতিমন্ত্রীর বাড়ির নামের সঙ্গে মিল রেখে মীরবাড়ি, দুই ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামের সঙ্গে মিল রেখে সীমান্ত ও দিগন্ত ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়।

এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ইউনিয়ন তিনটির নাম পাল্টানের উদ্যোগ নেওয়া হয়।