Image description

দেশের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সুপরিচিত সিলেটের শাহজালাল (রহ.) মাজারে আসা দানের অর্থ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সংরক্ষণের উদ্যোগকে ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। জেলা প্রশাসনের অভিযোগ— দান ও আয়ের সুনির্দিষ্ট হিসাব সংরক্ষণে ঘাটতি রয়েছে, আর মাজার-সংশ্লিষ্ট খাদেমদের দাবি— এটি শতাব্দীপ্রাচীন উত্তরাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, যেখানে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।

এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি পুরনো প্রশ্ন— মাজারে আসা বিপুল পরিমাণ দানের টাকা আসলে কোথায় যায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হয়?

আলোচনার কেন্দ্রে শাহজালাল মাজারের দানের অর্থ

 
 

সিলেটের ঐতিহাসিক শাহজালাল (রহ.) মাজারে এবারই প্রথম প্রকাশ্যে দানবাক্স ও দানের ডেগ খুলে অর্থ গণনার আয়োজন করে জেলা প্রশাসন।

 
 

গত ২২ জুন পরিচালিত গণনায় প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকা, বিদেশি মুদ্রা এবং কিছু স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়। এর আগে ১৮ জুন মাজারে দানের জন্য ব্যবহৃত তিনটি বড় ডেগ বা পাতিল সিলগালা করা হয় এবং নতুন একটি দানবাক্স স্থাপন করা হয়।

 

মাত্র চার দিনের ব্যবধানে এত বিপুল অর্থ পাওয়ার পর মাজারে বছরে মোট কত অর্থ আসে এবং সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হয়— এ নিয়ে জনমনে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার মাজার পরিদর্শনে গিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম অভিযোগ করেন, কিছু ব্যক্তি মাজারের আয় নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে খরচ করেন। যদিও এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন মাজার ব্যবস্থাপনায় যুক্ত খাদেমরা।

পরবর্তীকালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সিদ্ধান্ত হয়, আগামী এক মাস জেলা প্রশাসন, ওয়াকফ এস্টেট ও মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করবে। একই সঙ্গে মাজারের অর্থ সংরক্ষণের জন্য একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টও খোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাঈদা পারভীন।

খাদেমদের দাবি: সাতশ বছরের ঐতিহ্যের অংশ এই ব্যবস্থাপনা

শাহজালাল মাজারের খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না বলছেন, সাতশ বছর ধরে বংশ পরম্পরায় আমরা মাজারের খাদেমের দায়িত্ব পালন করছি। হযরত শাহজালালের সঙ্গে আসা সঙ্গীদের পরিবারের উত্তরাধিকার আমরা। এই দরগা কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ নয়।

তার দাবি, মাজারে আসা দান ও মানতের অর্থ মাজারের অতিথি সেবা, ধর্মীয় কার্যক্রম এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার পেছনেই ব্যয় করা হয়।

“এখানকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা থাকলে পরিচালনা কমিটি, দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি ও খাদেম পরিবারগুলো নিয়ে বসে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু আমরা তা দেখছি না,” বলেন তিনি।

ইতিহাসবিদ ও সিলেটের ঐতিহ্য নিয়ে গবেষক আব্দুল করিম জানান, প্রায় সাতশ বছর আগে শাহজালাল (রহ.) সিলেটে আসার পর থেকেই স্থানীয় মানুষ ও ভক্তরা দরগায় নানা উপঢৌকন দিতেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, শাহজালাল (রহ.) সেসব উপহার তাঁর সঙ্গীদের পরিবারগুলোর মধ্যে বণ্টন করতেন।

পরবর্তীকালে ওই পরিবারগুলোর সদস্যরাই খাদেম বা সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। বর্তমানে এমন খাদেম পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৩০০।

দানের অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়?

খাদেমদের দাবি, মাজারে আসা অর্থ দিয়ে প্রতিদিনের রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং জনসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না বলেন, ৩০ থেকে ৪০ জন চৌকিদার আছে। প্রতিদিন লঙ্গরখানায় বহু মানুষ খাবার খায়। রমজানে গণইফতারের আয়োজন করা হয়। বার্ষিক ওরস উপলক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। দরগার ভেতরে চারতলা মসজিদ এবং নতুন ভবনও মাজারের অর্থে নির্মাণ করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং দৈনন্দিন তত্ত্বাবধানের ব্যয়ও এই তহবিল থেকেই মেটানো হয়।

আব্দুল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রচলিত নিয়মে খাদেম পরিবারগুলো পালাক্রমে একদিন করে মাজার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে।

‘এখন প্রায় ৩০০ পরিবার রয়েছে। একটি পরিবার বছরে একদিন দায়িত্ব পালন করে। সেদিনের আয়ের একটি অংশ মাজার অফিসে জমা দেয়, বাকিটা পরিবারটি নেয়। এটি তাদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অধিকার বলে তারা মনে করে,’ বলেন তিনি।

শুধু শাহজালাল নয়, অন্য মাজারগুলোর অর্থও কীভাবে ব্যবস্থাপিত হয়?

বাংলাদেশে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দানবাক্সের অর্থ গণনা প্রায়ই আলোচনায় আসে। সেখানে অর্থ ব্যবস্থাপনা সরাসরি জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে হয়।

যদিও অধিকাংশ মাজারে দানের অর্থের ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট খাদেম ও পরিচালনা কমিটির হাতেই থাকে।

সরকারের ওয়াকফ প্রশাসন দেশের সব মাজার, মসজিদ, ঈদগাহ ও কবরস্থানকে ওয়াকফ হিসেবে নিবন্ধনের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বহু মাজারে আয়-ব্যয়ের বিষয়গুলো স্থানীয়ভাবেই পরিচালিত হয় এবং প্রশাসন সাধারণত এসব বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না।

বাগেরহাটের খান জাহান আলী (রহ.) মাজারের খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে শুধু বলেন, “এখানে পরিচালনা কমিটি আছে। এর বাইরে আমার আর কিছু বলার নেই।”

অন্যদিকে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে ইয়ারউদ্দিন খলিফার মাজার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. শহিদ মল্লিক জানান, তাদের মাজারে সারা দেশে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার দানবাক্স রয়েছে।

তার দাবি, এসব দানবাক্স ও মানতের অর্থ থেকে বছরে প্রায় তিন কোটি টাকা আয় হয়।

‘এই অর্থ দিয়ে মাদ্রাসা, মসজিদ, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়,’ বলেন তিনি।

শাহজালাল মাজার কি ওয়াকফ সম্পত্তি?

সরকারের ওয়াকফ প্রশাসক সাফিজ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, শাহজালাল (রহ.) মাজার একটি তালিকাভুক্ত ওয়াকফ সম্পত্তি।

তার ভাষায়, বাংলাদেশে যত মাজার, মসজিদ, ঈদগাহ ও কবরস্থান রয়েছে, সেগুলো আইন অনুযায়ী ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয় এবং নিবন্ধন বাধ্যতামূলক।

তিনি জানান, ওয়াকফ সম্পত্তি মূলত তিন ধরনের—ওয়াকফ ফি লিল্লাহ, ওয়াকফ আলাল আওলাদ এবং ব্যবহারিক ওয়াকফ।

সাফিজ উদ্দিন আহমেদের মতে, শাহজালাল মাজার এই তিন ধরনের বৈশিষ্ট্যই ধারণ করে।

বাংলাদেশে ওয়াকফ সম্পত্তি তদারকির জন্য সরকার ওয়াকফ প্রশাসক নিয়োগ দেয়। আর যিনি কোনো ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন, তাকে বলা হয় ‘মুতওয়াল্লি’।

সম্পদের পরিমাণ বিশাল, প্রশ্ন রয়ে গেছে স্বচ্ছতা নিয়ে

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত ওয়াকফ এস্টেটের সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার। এসব এস্টেটের অধীনে রয়েছে চার লাখ ২৪ হাজার ৭৪ একর জমি।

তবে গত বছর ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, নিবন্ধিত ওয়াকফ সম্পত্তির মধ্যে প্রায় ৮৫ হাজার ৫৭২ একর জমি বেহাত হয়ে গেছে বলে হিসাব পাওয়া গেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে শাহজালাল মাজারে দানের অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণের উদ্যোগকে অনেকেই স্বচ্ছতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে খাদেমদের একাংশ এটিকে শতাব্দীপ্রাচীন উত্তরাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন।

শাহজালাল (রহ.) মাজারে আসা দানের অর্থ নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক কেবল একটি মাজারের হিসাব-নিকাশের প্রশ্ন নয়; এটি দেশের মাজারভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থাপনা, ওয়াকফ সম্পত্তির তদারকি এবং স্বচ্ছতা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনাও সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রশাসন যেখানে জবাবদিহিতা ও হিসাব সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে, সেখানে খাদেমরা ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারভিত্তিক অধিকার রক্ষার যুক্তি তুলে ধরছেন। ফলে মাজারের দানের অর্থ কোথায় যায়—এই প্রশ্নের পাশাপাশি এখন আলোচনায় এসেছে, সেই অর্থের ব্যবস্থাপনা কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হওয়া উচিত।

সূত্র: বিবিসি বাংলা