Image description

চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এলাকায় এক ইয়ার্ড থেকে অন্য ইয়ার্ডে খালি কনটেইনার স্থানান্তরের জন্য নতুন ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১৪ জুন এই দরপত্র প্রকাশ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। তবে পাঁচ বছর মেয়াদি এই দরপত্রে এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যা কেবল বিশেষ দুটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই পূরণ করা সম্ভব।

এই দুই প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বন্দরে কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সাইফ পাওয়ারটেক এবং বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিমের এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস।

দরপত্রের দুটি শর্তকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। এর প্রথমটি হচ্ছে ৫০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতা।

দরপত্রে বলা হয়, আবেদনকারী কোম্পানিকে গত ১০ বছরের মধ্যে দেশের যে কোনো সমুদ্রবন্দরে নিজস্ব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে খালি কনটেইনার সরানোর কাজে অন্তত এক বা একাধিক চুক্তিতে কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকার কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

দ্বিতীয় শর্তে আর্থিক ও যন্ত্রপাতির বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বার্ষিক টার্নওভার নির্ধারণ করা হয় ন্যূনতম ১২ কোটি টাকা। মোট আর্থিক সক্ষমতা নির্ধারণ করা হয় ১০৫ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি ঠিকাদারকে সম্পূর্ণ নতুন ব্র্যান্ডের নিজস্ব এম্পটি হ্যান্ডলার ও ট্রাক্টর-ট্রেইলর সরবরাহ করতে হবে। যন্ত্রপাতির উৎপাদনশীলতা ৭০ শতাংশের নিচে নামলে নিজস্ব খরচে তা প্রতিস্থাপনের শর্ত রাখা হয়েছে।

বার্থ অপারেটর এম এইচ চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) খোন্দকার ফজলে আকবর মুরাদ। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘গত ১৭ বছর ধরে নতুন কোনো স্বচ্ছ টেন্ডার না থাকায় ওই দুটি নির্দিষ্ট কোম্পানি ছাড়া আর কারও এই অভিজ্ঞতা থাকা অসম্ভব। ব্যাংকঋণের বড় গ্যারান্টি ছাড়া হুট করে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের শর্ত পূরণ করা সাধারণ ব্যবসায়ীদের পক্ষে সম্ভব নয়।’

আগের টেন্ডারের সঙ্গে পার্থক্য

২০০৯ ও ২০১৩ সালের দরপত্রে আর্থিক ও অভিজ্ঞতার মাপকাঠি সাধারণ ঠিকাদারদের সাধ্যের মধ্যে ছিল। তখন ব্যাংকঋণের নিশ্চয়তা (ক্রেডিট লাইন) চাহিদা ছিল মাত্র ১ কোটি টাকা।

২০১৭ সালের দরপত্রে আগের পাঁচ বছরের মধ্যে মাত্র দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। বার্ষিক টার্নওভার ও ব্যাংক ঋণের নিশ্চয়তার শর্ত ছিল মাত্র ১ কোটি টাকা। তখন সাধারণ ব্যবসায়ীরাও অংশ নিতে পারতেন।

২০২৬ সালের টেন্ডারে হঠাৎ করে অভিজ্ঞতার মেয়াদ দুই বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর এবং অভিজ্ঞতার আর্থিক মান নির্ধারণ করা হয় ৫০ কোটি টাকা।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে একটি আবেদন পাঠিয়েছে বার্থ অপারেটরস্, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস্ অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস্ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। ছবি: এশিয়া পোস্ট।

অ্যাসোসিয়েশনের আপত্তি

বন্দর পরিচালনাকারী অপারেটরদের শীর্ষ সংগঠন ‘বার্থ অপারেটরস্, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস্ অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস্ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’ এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে একটি আবেদন পাঠিয়েছে। এর একটি কপি এশিয়া পোস্টের হাতে এসেছে।

সংগঠনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী স্বাক্ষরিত আবেদনে বলা হয়, শর্তগুলো বহাল থাকলে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কোনো যোগ্য দরদাতার দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। এতে বন্দর কর্তৃপক্ষ সবচেয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে কাজ পাওয়ার সুযোগ হারাবে। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা থাকলে সরকারের তথা বন্দরের বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হতো।

আবেদনে আরও বলা হয়, বারবার দরপত্র ভেস্তে যাওয়ায় বর্তমানে দায়িত্বরত পুরোনো প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ সাল থেকে তাদের মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই বন্দরের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়, অবিলম্বে নতুন দরপত্রের বিতর্কিত ও অযৌক্তিক শর্তগুলো বাতিল করে ২০১৩ ও ২০১৭ সালের মতো সহজ ও উন্মুক্ত শর্ত রাখতে হবে। অন্যথায়, এই কাজের ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য তথা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।

১৭ বছর আটকে রাখা হয় দরপত্র

চট্টগ্রাম বন্দরের বিগত ১৭ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বারবার মামলা করে উন্মুক্ত দরপত্র আটকে কাজ নিজেদের দখলে রাখা হয়েছে।

২০১৩ সালে দরপত্রের মাধ্যমে চার বছরের জন্য কাজ পায় এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিস। ২০১৭ সালে মেয়াদ শেষ হলে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু টেন্ডারের নিয়ম নিয়ে মামলা দেওয়া হলে দরপত্র স্থগিত হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ ডিপিএম বা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি ছাড়াই আবারও এভারেস্টকে দায়িত্ব দেয়। অর্থাৎ, কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই ফের কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি।

২০২০ সালে আবারও টেন্ডার ডাকা হলে একইভাবে মামলা করে তা আটকে দেয় এভারেস্ট। এভাবে কাজ ধরে রাখে তারা।

২০২৩ সালে নতুন টেন্ডারে শর্ত পূরণ করে অংশ নেয় দুটি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হচ্ছে সাইফ পাওয়ারটেক ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিস। এতে সাইফ পাওয়ারটেক ঘোষিত মূল্যের চেয়ে ১৭ শতাংশ কম দাম উল্লেখ করে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। কিন্তু সরকারি ক্রয়নীতি (পিপিআর) অনুযায়ী ১০ শতাংশের বেশি ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই; এই অজুহাতে আবারও মামলা করে এভারেস্ট। ফলে সেই দরপত্রও ভেস্তে যায় এবং এভারেস্ট ডিপিএম প্রক্রিয়ায় কাজ চালাতে থাকে।

বর্তমানে ডিপিএম প্রক্রিয়ায় প্রতি বছর বন্দর কর্তৃপক্ষ এভারেস্টকে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা (প্রতি ছয় মাসে ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা) করে পরিশোধ করছে।

খোন্দকার ফজলে আকবর মুরাদ বলেন, ‘দরপত্র প্রক্রিয়ায় ইচ্ছে করেই এমন কিছু ফাঁকফোকর রাখা হয় যাতে সহজেই মামলা করে টেন্ডার আটকে দেওয়া যায়। আর টেন্ডার আটকে গেলে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই সরাসরি পুরোনো কোম্পানি কাজ পেয়ে যায়।’

পিপিআর লঙ্ঘন

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) এই দরপত্রের জন্য পাঁচ সদস্যের ‘দরপত্র দলিল ও প্রাক্কলন প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করেছে। কমিটির আহ্বায়ক হলেন চবক-এর সদস্য (অর্থ) মো. মাহবুব আলম তালুকদার। এতে চুয়েটের একজন অধ্যাপক, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ অন্যান্য কর্মকর্তা রয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বার্থ অপারেটর বলেন, কমিটি সরকারি কেনাকাটা সংক্রান্ত বিধিমালার মূলনীতি মারাত্মকভাবে ভঙ্গ করেছে। শর্তগুলো এমনভাবে টেইলর-মেড বা কাস্টমাইজ করা হয়েছে, যা বাজারে মুক্ত প্রতিযোগিতা ধ্বংস করে মাত্র দুটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে একচেটিয়া সুবিধা দেয়। এটি সরকারি ক্রয়নীতির বিধি ৪ (উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিতকরণ) ও বিধি ৪৭ (যৌক্তিক যোগ্যতার মানদণ্ড)-এর সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।

তার মতে, বিগত ১৭ বছরের মামলা ও ডিপিএম পদ্ধতির সুবিধাভোগী চক্রের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে কমিটি সাধারণ ও নতুন দরদাতাদের অংশগ্রহণের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এটি সরকারি অর্থের সাশ্রয় নিশ্চিতকরণের আইনি গাইডলাইন ও জনস্বার্থের পরিপন্থি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন্দরকেন্দ্রিক একজন ব্যবসায়ী বলেন, সাইফ ও এভারেস্টের মধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতা ছিল, কেউ কারও ব্যবসায় বাধা দেবে না। অন্য অপারেটররা খালি কনটেইনার হ্যান্ডেল করার আগ্রহ দেখালেও বন্দর কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয়নি। বন্দরের কিছু অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজশে এই একচেটিয়া রাজত্ব চলছে।

খোন্দকার ফজলে আকবর মুরাদ বলেন, ‘এভারেস্ট আর সাইফ পাওয়ারটেককে সুবিধা দিতে এই লুটপাটের আয়োজন। এই দরপত্র কোনো পরিচিত পত্রিকাতেও প্রকাশ করা হয়নি। আমরা ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পেরেছি।’

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

সামগ্রিক বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) গোলাম মো. সারওয়ারুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। পরামর্শ দেন বন্দরের মুখপাত্র ও চিফ পার্সোনেল অফিসার মো. নাসির উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলার।

যোগাযোগ করা হলে মো. নাসির উদ্দিন জানান, দরপত্রের শর্ত নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতার বিষয়টি আগামী ২৯ জুন প্রি-বিড মিটিং বা দরপত্র-পূর্ব সমন্বয় সভায় আলোচনা করে সমাধান করা হবে। চূড়ান্ত দরপত্র জমা দেওয়ার আগে দরদাতাদের সঙ্গে সভা হবে। সেখানে কোনো যৌক্তিক দাবি বা জটিলতা থাকলে শর্ত সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।

দরপত্রে যে দুটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, এশিয়া পোস্টের পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।

সাইফ পাওয়ারটেকের এমডি তরফদার রুহুল আমিনের নম্বরে ফোন করলে তিনি কল কেটে দেন। পরে বিষয়টি উল্লেখ করে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দিয়েও সাড়া মেলেনি।

এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন সেলিমকেও ফোনে পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও কোনো জবাব দেননি।