Image description

বগুড়ার মহাস্থানগড়ের সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা এবং পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইন উপেক্ষা করে মাজার উন্নয়নের নামে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের উদ্যোগে বগুড়া জেলা পরিষদের অর্থায়নে শুরু হওয়া এই নির্মাণকাজের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চিঠিতে জেলা প্রশাসককে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করার পর কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে এর প্রতিবাদে গতকাল মঙ্গলবার মহাস্থানগড়ে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন মাজারের অনুসারীরা।

অভিযোগ আছে, মাজার কমিটির উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের উদ্যোগে বগুড়া জেলা পরিষদের মাধ্যমে প্রায় ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে মহাস্থানগড় মাজারসংলগ্ন এলাকায় নারী মুসল্লিদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণ শুরু হয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দাবি, সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় এ ধরনের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ উচ্চ আদালতের আদেশের পরিপন্থী।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে মহাস্থান জাদুঘরের সামনে ‘ঐতিহাসিক মহাস্থানগড় হজরত শাহ সুলতান বলখী (রহ.) মাহীসওয়ারের পবিত্র মাজার শরিফের মুসল্লিবৃন্দ’–এর ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে মাজারের ভক্ত, খাদেম, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিএনপির কিছু নেতা-কর্মী অংশ নেন।

বক্তারা মাজারের উন্নয়নকাজে বাধা দেওয়া হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন। সমাবেশে রায়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তাহেরুল ইসলামসহ প্রতিমন্ত্রীর অনুসারীরা উপস্থিত ছিলেন।

বহুতল ভবনের পিলার নির্মাণের জন্য সেখানে বড় গর্ত করা হয়েছে
বহুতল ভবনের পিলার নির্মাণের জন্য সেখানে বড় গর্ত করা হয়েছেছবি: প্রথম আলো

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৬ সালের সংশোধিত পুরাকীর্তি আইন অনুযায়ী তালিকাভুক্ত প্রত্নস্থল ধ্বংস, ক্ষতিসাধন বা বিকৃত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ছাড়া ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি এবং ২০২০ সালের ৫ মার্চ হাইকোর্টের পৃথক আদেশে মহাস্থানগড়ের সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার সাড়ে সাত কিলোমিটার পরিসরের মধ্যে যেকোনো ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

অধিদপ্তরের দাবি, সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাজারসংলগ্ন এলাকায় খনন করে নারী মুসল্লিদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণ শুরু হয়। বিষয়টি নজরে এলে ১৭ জুন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয় বগুড়ার জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায়। জেলা প্রশাসক একই সঙ্গে মহাস্থানগড় মাজার কমিটির সভাপতিও।

স্থানীয় সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে বগুড়া জেলা পরিষদকে নারী মুসল্লিদের বিশ্রামাগার নির্মাণে ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে জেলা পরিষদের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়।

সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় যেকোনো ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। জেলা পরিষদের নেওয়া প্রকল্পটি সেই আদেশের পরিপন্থী হওয়ায় কাজ বন্ধ করতে শিবগঞ্জের ইউএনও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি জানিয়ে মন্ত্রণালয়েও চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তৌফিকুর রহমান, বগুড়ার জেলা প্রশাসক ও মাজার কমিটির সভাপতি

বগুড়া জেলা পরিষদের প্রশাসক এ কে এম আহসানুল তৈয়ব জাকির বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের ভিত্তিতেই বিধি অনুসরণ করে কাজ শুরু করা হয়েছে। তবে প্রকল্পটি যদি হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে, তাহলে মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বগুড়ার জেলা প্রশাসক ও মাজার কমিটির সভাপতি তৌফিকুর রহমান বলেন, সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় যেকোনো ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। জেলা পরিষদের নেওয়া প্রকল্পটি সেই আদেশের পরিপন্থী হওয়ায় কাজ বন্ধ করতে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি জানিয়ে মন্ত্রণালয়েও চিঠি পাঠানো হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী এবং মাজার কমিটির উপদেষ্টা মীর শাহে আলম প্রথম আলোকে বলেন, জেলা পরিষদের অর্থায়নে নারী মুসল্লিদের জন্য নামাজঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। মাজার এলাকায় উন্নয়নকাজ করার এখতিয়ার মাজার কমিটির রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর অন্যের প্রভাবে এ কাজে বাধা দিয়েছে, ফলে মুসল্লিদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

মহাস্থানগড় মাজারে নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের দাবিতে বিক্ষোভ–মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল বিকেলে মহাস্থান জাদুঘরের সামনে
মহাস্থানগড় মাজারে নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের দাবিতে বিক্ষোভ–মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল বিকেলে মহাস্থান জাদুঘরের সামনেছবি: প্রথম আলো

প্রতিমন্ত্রীর দাবি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নিজেরাও ওই এলাকায় পিকনিক স্পটের নামে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করেছে। অথচ তারা মাজারের উন্নয়নকাজ চান না। প্রয়োজন হলে মাজার কমিটি হাইকোর্টে গিয়ে স্থগিতাদেশ চাইবে।

মহাস্থানগড় বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। গত শতকের শেষ দিকে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের প্রত্নতাত্ত্বিকদের যৌথ খননে সেখানে প্রায় ২ হাজার ৪০০ বছর আগের মাটির চুলাসহ বহু মূল্যবান নিদর্শন উদ্ধার হয়। এর আগে একই এলাকায় স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে উচ্চ আদালত তা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরে রাজশাহী বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মহাস্থানগড় মাজার এলাকায় স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের কারণে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় এবং হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা যাতে লঙ্ঘিত না হয়—তাই সহযোগিতা চেয়ে মাজার কমিটির সভাপতি ও বগুড়ার জেলা প্রশাসককে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর পক্ষ থেকে লিখিত চিঠি দেওয়া হয়।

প্রতিমন্ত্রীর অভিযোগের বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মাজারের উন্নয়ন কার্যক্রমের বিপক্ষে নয়। তবে সেই উন্নয়ন কার্যক্রম যেন পরিকল্পিত এবং হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে হয়—সেটিই কাম্য। পরিকল্পনা মাফিক মাজারের উন্নয়নে উদ্যোগ নিলে কোনো সমস্যা হবে না।