Image description

 ড. মুহাম্মাদ সাইদুল ইসলাম 


 বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের বৈপরীত্যের মধ্যে আবদ্ধ। একদিকে এটি দেশের সবচেয়ে সুসংগঠিত, আদর্শভিত্তিক এবং ক্যাডারনির্ভর রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর একটি; অন্যদিকে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নে দলটি বারবার পিছিয়ে পড়েছে। গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বিশেষত ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে: জামায়াত কি এখনও "টিকে থাকার রাজনীতি" করবে, নাকি "রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনীতি" করবে? আমার যুক্তি হলো, জামায়াতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো একটি প্যারাডাইম শিফট: ওয়েলফেয়ার-কেন্দ্রিক এবং রিয়াক্টিভ রাজনীতি থেকে ক্ষমতা-কেন্দ্রিক রাষ্ট্রগঠনমূলক প্রো-এক্টিভ রাজনীতিতে উত্তরণ। নীচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের মাধ্যমে বিষয়টা আরো পরিস্কার করা হলো। 

১.
 ওয়েলফেয়ার রাজনীতির ঐতিহাসিক সাফল্য এবং সীমাবদ্ধতা: 
জামায়াতের সবচেয়ে বড় শক্তি সবসময়ই ছিল তার সামাজিক ও সাংগঠনিক অবকাঠামো। মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দাতব্য কার্যক্রম, ইসলামি ব্যাংকিং, সামাজিক কল্যাণমূলক নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে তারা বাংলাদেশের সবচেয়ে বিস্তৃত ইসলামি সিভিল সোসাইটি গড়ে তুলেছে।এই মডেলের একটি ঐতিহাসিক প্রয়োজন ছিল। বিশেষত ১৯৭১-পরবর্তী সময়, এবং আরও বেশি করে ২০০৯–২০২৪ সময়কালে, যখন দলটি দমন-পীড়ন, নিষেধাজ্ঞা, গণগ্রেপ্তার, বিচারিক ও প্রশাসনিক নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন ওয়েলফেয়ার রাজনীতি ছিল মূলত survival strategy বা কোন রকম টিকে থাকার লড়াই: সংগঠনকে বাঁচিয়ে রাখা, কর্মীদের ধরে রাখা, সামাজিক ভিত্তি রক্ষা করা, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখা। এই কৌশল সফল হয়েছে। কিন্তু একটি কৌশল যদি তার ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য পূরণ করে ফেলে, তবে তাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয় সামনে এগুনোর জন্য। আজ প্রশ্ন হলো: জামায়াত কি কেবল টিকে থাকার জন্য রাজনীতি করবে, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রাজনীতি করবে?

২.
 জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতা হলো, জনগণ এখন শুধু নৈতিক শক্তি নয়, রাষ্ট্রীয় বিকল্প খুঁজছে আওয়ামী লীগ এমনকি বিএনপির বাইরে: 
জুলাই আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা স্পষ্ট করেছে। শেখ হাসিনার মতো শক্তিশালী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে জামায়াত-শিবিরের সংগঠন, আত্মত্যাগ এবং মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের সময় দেখা গেল, আন্দোলনের প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে থেকেও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান নিয়েছে অন্যরা। এখানে একটি তিক্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষা রয়েছে: রাজনীতিতে শুধু সংগ্রাম করাই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রক্ষমতা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে সংগঠন লাগে, জনসমর্থন লাগে, নেতৃত্ব লাগে, ন্যারেটিভ লাগে, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা লাগে, এবং সবচেয়ে বড় কথা, ক্ষমতা গ্রহণ ও পরিচালনার প্রস্তুতি লাগে। সংগ্রামের শক্তি থাকা আর রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা থাকা এক জিনিস নয়। অনেক আন্দোলন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে অন্যরা।

৩.
 হাতি ও ঘোড়ার উপমা: ওয়েলফেয়ার বনাম ক্ষমতার রাজনীতি: 
জামায়াতের বর্তমান অবস্থাকে একটি উপমার মাধ্যমে বোঝানো যায়। ওয়েলফেয়ার রাজনীতি অনেকটা হাতির মতো। হাতি বিশাল, শক্তিশালী, ধৈর্যশীল, ভার বহন করতে সক্ষম। কিন্তু হাতির সীমাবদ্ধতাও আছে।  সংকটময় মুহূর্তে দ্রুত দৌড়ানো, মুহূর্তে কৌশল বদলানো, আকস্মিক সুযোগ গ্রহণ করা—এসব ক্ষেত্রে ঘোড়া অনেক বেশি কার্যকর। আধুনিক ক্ষমতার রাজনীতি অনেকাংশে ঘোড়ার রাজনীতি। এখানে প্রয়োজন—দ্রুত সিদ্ধান্ত, কৌশলগত নমনীয়তা, মিডিয়া দক্ষতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, এবং রাজনৈতিক বাস্তববোধ। জামায়াত যদি শুধু হাতি হয়, তবে তার শক্তি থাকবে; কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতিযোগিতায় সে পিছিয়ে পড়বে। সুতরাং হাতিকে বাদ দেওয়া নয়। হাতি থাকবে। কিন্তু তার সঙ্গে ঘোড়াকেও যুক্ত করতে হবে।

৪.
 নতুন প্যারাডাইম: Welfare Politics থেকে Statecraft Politics: 
এই নতুন পর্যায়ে জামায়াতের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত Statecraft—অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার শিল্প ও বিজ্ঞান।এখানে ওয়েলফেয়ার রাজনীতি থাকবে, কিন্তু সেটি হবে একটি মাধ্যম (means), উদ্দেশ্য (end) নয়। মূল লক্ষ্য হবে: ক্ষমতায় যাওয়া, ক্ষমতায় টিকে থাকা, এবং ক্ষমতাকে নৈতিক কাঠামোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। শুধু নির্বাচনে জেতা নয়; একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করা।

৫.
 কর্মী তৈরির পাশাপাশি রাষ্ট্রনায়ক তৈরি: 
জামায়াতের সবচেয়ে বড় অর্জন তার কর্মীবাহিনী। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শুধু কর্মী যথেষ্ট নয়;  দরকার অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক, প্রযুক্তিবিদ, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক, প্রশাসক, জননীতি বিশেষজ্ঞ। আধুনিক রাষ্ট্র একটি অত্যন্ত জটিল প্রতিষ্ঠান।একটি রাজনৈতিক আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে হাজার হাজার দক্ষ পেশাজীবী প্রয়োজন হয়। তাই "ভালো কর্মী" তৈরির পাশাপাশি "ভালো রাষ্ট্রনায়ক" তৈরি করতে হবে।

৬.
 ক্ষমতায় যাওয়ার বাস্তব রোডম্যাপ: 
আধুনিক রাজনীতির একটি কঠিন সত্য হলো: ক্ষমতা কেউ কাউকে উপহার দেয় না; ক্ষমতা অর্জন করতে হয়।গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রয়োজন: ভোট, জোট, ন্যারেটিভ, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, সাংগঠনিক সক্ষমতা। নৈতিকতা অবশ্যই জরুরি; কিন্তু শুধু নৈতিক উচ্চতা দিয়ে ক্ষমতা অর্জন করা যায় না। ম্যাক্স ওয়েবার বহু আগে বলেছিলেন, রাজনীতি হলো "ethic of conviction" এবং "ethic of responsibility"-এর সমন্বয়। আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করতে না পারলে রাজনৈতিক সাফল্য আসে না।

৭.
 নির্বাচন শুধু একটি ধাপ: 
বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশে নির্বাচন আর শুধুমাত্র ভোটবাক্সের ঘটনা নয়। নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সুশীল সমাজ, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী, ডীপ স্টেট। যে দল এসব ক্ষেত্র বুঝবে না, সে কেবল ভোট পাবে কিন্তু  ক্ষমতায় যেতে পারবে না। ক্ষমতার রাজনীতি এখন বহুস্তরীয়।

৮.
 নিয়োলিবারাল বিশ্বায়নকে বুঝতে হবে: 
বিশ্ব আজ আন্তঃনির্ভরশীল। বাংলাদেশের অর্থনীতি—রপ্তানি, রেমিট্যান্স, বৈদেশিক বিনিয়োগ, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন—এগুলোর ওপর নির্ভরশীল। তাই বিশ্বায়নের সঙ্গে সংঘর্ষ নয়, বরং বুদ্ধিদীপ্ত সমন্বয় প্রয়োজন। ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক বাজার, সুস্থ প্রতিযোগিতা, সামাজিক সুরক্ষা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব —এসবকে একত্রিত করার সক্ষমতা দেখাতে হবে।

৯.
 পররাষ্ট্রনীতি হবে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার: 
ক্ষমতায় যেতে চাইলে আন্তর্জাতিক বৈধতা (international legitimacy) অপরিহার্য। আজকের বিশ্বে ওয়াশিংটন, বেইজিং, ব্রাসেলস, রিয়াদ, আঙ্কারা, কুয়ালালামপুর, দিল্লি—সবগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে হবে। শুধু প্রতিবাদী ভাষণ নয়, কার্যকর কূটনীতি প্রয়োজন।

১০.
 অর্থনৈতিক ভিশন ছাড়া ক্ষমতা টেকসই নয়: 
জনগণ আদর্শের জন্য ভোট দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত্তিতেই সরকার টিকে থাকে। তাই প্রয়োজন কর্মসংস্থান পরিকল্পনা, শিল্পনীতি, কৃষি আধুনিকীকরণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন।বাংলাদেশের জন্য একটি স্পষ্ট "Economic Nationalism" মডেল দরকার, যা জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে উৎপাদন, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানকে এগিয়ে নেবে।

১১.
 কঠিন প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেলে চলবে না: 
আধুনিক রাজনৈতিক দলকে স্পষ্ট উত্তর দিতে হয়।বিশেষ করে নারী অধিকার, মানবাধিকার, শরিয়া ও সংবিধান, সংখ্যালঘু অধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক। নীরবতা এখন আর কৌশল নয়, বরং অনেক সময় অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

১২.
 কাউন্টার-ন্যারেটিভ নির্মাণ: 
জামায়াতকে ঘিরে বহু দশকের বিতর্ক, অভিযোগ, অপপ্রচার এবং রাজনৈতিক বয়ান রয়েছে। এসবের জবাব শুধু প্রতিক্রিয়াশীলভাবে দিলে হবে না। এগুলোর জন্য দরকার গবেষণা, ডকুমেন্টেশন, মিডিয়া দক্ষতা, ডিজিটাল উপস্থিতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। নিজেদের গল্প নিজেরাই বলতে হবে। রাজনীতিতে যে নিজের গল্প বলে না, তার গল্প অন্যরা লিখে দেয়।

 উপসংহার: টিকে থাকার রাজনীতি থেকে নেতৃত্বের রাজনীতি: 
জামায়াতের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সংগঠন নয়; সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। যদি লক্ষ্য শুধু টিকে থাকা হয়, তাহলে বর্তমান মডেল যথেষ্ট। কিন্তু যদি লক্ষ্য হয় বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়া, রাষ্ট্র পরিচালনা করা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন মডেল উপস্থাপন করা; তাহলে একটি নতুন রাজনৈতিক প্যারাডাইম অপরিহার্য। ওয়েলফেয়ার রাজনীতি থাকবে। সামাজিক কাজ থাকবে। আদর্শ থাকবে। কিন্তু সেগুলো হবে রাষ্ট্রগঠনের বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ।

ইতিহাসে অনেক সংগঠন জনগণের হৃদয় জয় করেছে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেনি। আবার অনেক দল ক্ষমতায় গেছে, কিন্তু নৈতিক ভিত্তি হারিয়েছে। সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ হলো এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটানো।জামায়াতের জন্য আগামী দিনের প্রশ্ন তাই আর শুধু "কিভাবে টিকে থাকা যায়" নয়; বরং "কিভাবে নেতৃত্ব দেওয়া যায়"। এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে দলটির ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার ঐতিহাসিক ভূমিকা।