উদ্দেশ্য ছিল ভালো— সরকারের সেবা ডিজিটালে রূপান্তর করে মানুষের কাছে দ্রুত ও সহজে পৌঁছানো। পাশাপাশি সবখানে আইসিটি ব্যবহার বাড়াতে অবকাঠামো স্থাপন। কিন্তু বিধি বাম। একদিকে চীনের প্রতিশ্রুত ঋণ না পাওয়া, অন্যদিকে সরকারি অংশের অর্থ ব্যয়ে খাঁজে খাঁজে অনিয়ম— এখন পর্যন্ত চিহ্নিত ৩৭টি। এরই মধ্যে চলে গেছে সাড়ে ৪ বছর। মেয়াদ আছে আর ছয় মাস। কিন্তু অগ্রগতি খুবই সামান্য। ১৮ দশমিক ১৯ শতাংশ। এখন দ্বিগুণ সময় বাড়িয়ে কাজ কমিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থে আড়াই হাজার কোটি টাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে তোড়জোড় চলছে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ‘ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন’ প্রকল্পে ঘটেছে এমন ঘটনা। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
সংশ্লিস্টরা জানাচ্ছেন, এ প্রকল্পে চীন থেকে ঋণ পাওয়ার কথা থাকলেও মেয়াদ শেষেও হয়নি ঋণচুক্তি। প্রথমদিকে আলোচনায় সায় দিলেও মাঝপথে এসে ভোল পাল্টায় দেশটি। প্রিফারেন্সিয়াল বায়ার্স ক্রেডিটের (বিপিসি) প্রচলিত শর্তের বাইরে গিয়ে উচ্চ সুদ ও কঠিন শর্ত চাপানোর চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু এতে সায় দেয়নি বাংলাদেশ। বাদ দেওয়া হচ্ছে চীনের ঋণ। প্রকল্প পরিচালক তানজিনা ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, ইআরডি (অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ) থেকে গত বছরের শেষদিকে আমাদের জানানো হয় চীন সুদের হার ও শর্ত বাড়াতে চাচ্ছে। ফলে এ প্রকল্পে ঋণ নেওয়া ঠিক হবে না। এ ছাড়া আলোচনাও শেষ হচ্ছে না। আর কত অপেক্ষা করা যায়। এরপর চীনকে বাদ দিয়ে কার্যক্রম কমিয়ে সরকারি অর্থায়নেই বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনিয়মের বিষয়ে তার ভাষ্য— ‘কিছু অনিয়মতো হয়েছে। আমরা কাগজপত্র ঠিকমতো দেখাতে পারিনি। তবে যারা অডিট করেছেন, তাদের পরামর্শ মেনে ব্রডশিটে জবাব দেওয়া হয়েছে। আশা করছি সমাধান হবে।’
আইএমইডি সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৮৮৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ২ হাজার ৫০৫ কোটি ১৬ লাখ এবং চীনের ঋণ থেকে ৩ হাজার ৩৭৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয় করার লক্ষ্য ছিল। পরে প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে খরচ বাড়িয়ে মোট ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৯২৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এ ছাড়া অনুমোদনের সময় ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ ছিল। কিন্তু পরে এক বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত করা হয়। এখন দ্বিতীয় সংশোধনের মাধ্যমে চীনের ঋণ বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে বাস্তবায়নের জন্য ব্যয় কমিয়ে ২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা ধরা হচ্ছে। সেই সঙ্গে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২০ নভেম্বর পর্যন্ত করা হবে। ফলে চার বছরের এ প্রকল্পে সময় যাবে আট বছর। এটি দেশের ৬৪ জেলার ৪৯২টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বহিরাগত নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ (এক্সটারনাল অডিট) প্রকল্পটিতে যে ৩৭টি অনিয়ম চিহ্নিত করেছে, এর মধ্যে তিনটির আপত্তির নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি ৩৪টি এখনো ঝুলে আছে। অনিয়মগুলো হলো— গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে অতিরিক্ত হারে অফিস ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য হলো— উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত অফিস সংস্কার খরচ, প্রশিক্ষণে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়, পণ্য সরবরাহ ছাড়াই পরিশোধ, অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত টাকায় চুক্তি করে খরচ। আরও আছে, ভিন্ন প্যাকেজে একই ধরনের ওয়াইফাই রাউটার বিভিন্ন দামে কেনা, ১০ লাখ ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনে ইচ্ছামতো প্রাক্কলন করে আর্থিক ক্ষতি এবং অতিরিক্ত প্যাচ কর্ড (ছোট দূরত্বের তার) দেখিয়ে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার অনিয়মিত চুক্তি করা। এ ছাড়া সরকারি ক্রয় আইন লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত অর্থ খরচ, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে সরবরাহ ছাড়াই অপটিক্যাল ফাইবার কেবলের জন্য ৯২ কোটি টাকা পরিশোধ।
আইএমইডির সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী বললেন, ‘আমরা যেসব প্রকল্প মূল্যায়ন করছি, সেগুলোর জন্য শুধু সুপারিশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করব না। এবার যাতে চিহ্নিত বিষয়গুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেজন্য ভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
যেসব কাজ বাদ যাচ্ছে: চীনের সঙ্গে ঋণচুক্তি না হওয়ায় ১০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তি ল্যাব স্থাপন বাদ দেওয়ার প্রস্তাব যাচ্ছে দ্বিতীয় সংশোধনীতে। এই প্রস্তাব বর্তমানে আইসিটি বিভাগে আছে। এ ছাড়া যেসব কাজ বাদ যাচ্ছে, সেগুলো হলো— ৫৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইটি ল্যাবের মধ্যে ৩৭টি, ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ জটিলতায় ৯১টি উপজেলা সেবা ও তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র, সিভিল রেজিস্ট্রেশন এবং ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস কার্যক্রম, ১০টি গ্রামে স্মার্ট ভিলেজ স্থাপন, ১২ পরামর্শক এবং প্রকল্পের প্রশাসনিক ব্যয় থেকে ৩টি কম্পোনেন্ট।