Image description

জাতীয় স্থানীয় সরকার দিবস ২৫ ফেব্রুয়ারি। প্রতি বছরই এ দিবসটি স্থানীয় সরকার দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। অর্থাৎ এটি পূর্ব নির্ধারিত। এ দিবস পালনের জন্য তাৎক্ষণিক বা জরুরি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই। পূর্ব থেকেই এ ব্যাপারে প্রস্ততি নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। অথচ ২০২৫ সালের এই দিবসটিকে ‘জরুরি এবং তাৎক্ষণিক বিষয়’ হিসেবে দেখিয়ে সরকারের ক্রয় নীতিমালা লঙ্ঘন করে টেন্ডার ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কেনাকাটা করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। আদতে কেনাকাটার নামে এই টাকার অধিকাংশই আত্মসাত হয়েছে।

সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনাকাটা করা হলে দর প্রতিযোগিতা বা জবাবদিহিতার কোনো সুযোগ থাকে না। তাই সরকারি অর্থ হাতিয়ে নিতে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এই পদ্ধতিটিকেই বেছে নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। জানা গেছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার প্রভাবেই এমন অপকর্মের আশ্রয় নিয়েছে মন্ত্রণালয়। যথাসময়ে অর্থাৎ পূর্ব থেকে কোনো প্রস্তুতি না নিয়ে স্থানীয় সরকার দিবসের একেবারে আগ মুহূর্তে অনুষ্ঠান আয়োজনের কার্যক্রম শুরু করা হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ এ ব্যাপারে অর্থ ছাড়ের চিঠি দেওয়া হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির যৌক্তিকতা তুলে ধরার জন্য এই শেষ সময়টি বেছে নেওয়া হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ অনুমোদিত মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, “এ বছর জাতীয় স্থানীয় সরকার দিবস ২০২০ অনুষ্ঠান আগামী ১২ ফাল্গুন/১৪৩১, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, মঙ্গলবার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন, ঢাকায় আয়োজনের বিষয়ে এ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মহোদয়ের সভাপতিত্বে গত ২৯/০১/২০৬৫ তারিখের সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জাতীয় স্থানীয় সরকার দিবস-২০২৫ অনুষ্ঠানটি আয়োজনের লক্ষ্যে ভেন্যু প্রস্তুত, জরুরী সেবার প্রদানের জন্য মেডিকেল টিম প্রেরণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা সচল রাখা, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীগণের সেবার জন্য হইল চেয়ার সরবরাহকরণ, নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ, নির্বিঘ্নে পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকরণ, অনুষ্ঠান ধারণ ও সরাসরি সম্প্রচারকরণ ও সকল ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে সম্প্রচারণের জন্য অবহিতকরণ, অনুষ্ঠানে আপ্যায়নের ব্যবস্থাসহ এ সাথে সম্পৃক্ত সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তর ও সংস্থাকে জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পত্র প্রেরণ করা প্রয়োজন।”

এতে আরও বলা হয়, “সরাসরি চুক্তি (ফরৎবপঃ পড়হঃৎধপঃরহম) এর আওতায় জরুরি পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সংকট মোকাবেলায় পণ্য, কার্য ও সেবা ক্রয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) লক্ষ টাকা; তবে বিশেষ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়/ বিভাগের সচিবের অনুমোদনক্রমে বৎসরে সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) কোটি টাকা ব্যয় করা যাবে। উল্লেখ্য, বর্ণিত ব্যয় চলতি ২০১৪-২৫ অর্থ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ‘অনুষ্ঠান/উৎসবাদি’ খাতের (কোড নং-৩২৫৭৩০১) হতে নির্বাহ করা হবে। উক্ত খাতে ৫,০০,০০,০০০/- (পাঁচ কোটি) টাকা বরাদ্দ রয়েছে।”

“(প. পৃ. ০২)। উক্ত খাত হতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য অর্থ বিভাগ হতে ইতোমধ্যে ৩০,০০,০০০/-(ত্রিশ লক্ষ) টাকা ব্যয়ের সম্মতি প্রদান করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তা হতে ১০,৩৩,৩০০,০০ (দশ লক্ষ তেত্রিশ হাজার তিনশত টাকা ব্যয় হয়েছে। অবশিষ্ট ৪,৭০,০০,০০০/- (চার কোটি সত্তর লক্ষ টাকা) ছাড়ের সম্মতির জন্য অর্থ বিভাগকে পত্র প্রেরণ করা প্রয়োজন।”

জাতীয় স্থানীয় সরকার দিবস পূর্বনির্ধারিত, এ অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য সেবা ক্রয়ের জরুরি কেনাকাটার প্রয়োজন আছে কি- এমন প্রশ্নের জবাব দিতে পারছেন না মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রশাসন-২ শাখার মাধ্যমে এ কেনাকাটাগুলো করা হয়েছে। এই শাখার তখনকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শফিকুর আলম। তিনি বর্তমানে আছেন বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে। তাকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিল শীর্ষকাগজ ও শীর্ষনিউজের পক্ষ থেকে। তিনি এর জবাব দিতে পারেননি।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সচিবালয়ে যে অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয় এটিকে পুঁজি করেও কেনাকাটার নামে বড় দাগে ব্যবসা হয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগের দুর্নীতিবাজদের। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনার কারণে প্রত্যেকটি মালামালের অস্বাভাবিক মূল্য ধরা হয়েছে। কিন্তু যেসব কেনাকাটা কাগজপত্রে দেখানো হয়েছে এর অধিকাংশই সরবরাহ নেওয়া হয়নি। অগ্নিকাণ্ডে পুরোমাত্রায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দুই উপদেষ্টার দপ্তর। শুধুমাত্র এ দপ্তরগুলোতেই আসবাবপত্র ও কম্পিউটারসহ অন্যান্য ক্রয়কৃত মালামাল কিছুটা সরবরাহ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য দপ্তরের জন্য প্রকল্প থেকে আসবাবপত্র ও কম্পিউটার আনা হয়েছে। এবং পুরনো মালামাল রং বা মেরামতের মাধ্যমে তা পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করা হয়েছে। অর্থাৎ এ খাতে নতুন অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের অধিকাংশই আত্মসাত করা হয়েছে। এবং এর সঙ্গে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সরাসরি জড়িত ছিলেন।

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জাতীয় স্থানীয় সরকার দিবস, ২০২৫-এ স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তা/ কর্মচারী ও ঢাকায় অবস্থিত দপ্তর/ সংস্থার কিছুসংখ্যাক কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেছেন। অথচ এখানে ১২০০ প্যাকেট খাবারেব বিল প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ড্রাইভারদের জন্য ৮০০ প্যাকেট খাবারের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। ৮০০ গাড়ী রাখার মতো স্থান সচিবালয় এবং এর আশেপাশে আছে কিনা কেউ বলতে পারছেন না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ইভেন্ট ম্যানেজম্যান্ট বাবদ ৩২,২৯,৫০০/- (বত্রিশ লাখ উনত্রিশ হাজার পাঁচশত) টাকা, রোড ব্র্যান্ডিং ক্রয় বাবদ ৩০,৬১,৩০০/- (ত্রিশ লাখ একষট্টি হাজার তিনশত) টাকা, ভিডিও ডকুমেন্টরি ক্রয় বাবদ ১৩,৩০,০০০/- (তের লাখ ত্রিশ হাজার) টাকা, আপ্যায়ন বাবদ ১৩,৬৪,০০০/- (তের লাখ চৌষট্টি হাজার) টাকাসহ প্রভৃতি বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে যথাযথ সেবা বা কেনাকাটা সম্পন্ন হয়নি।

জাতীয় সমবায় দিবস উপলক্ষ্যে যে ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিকট থেকে ছাড় করা হয়েছে এর আগে-পরে আরও কয়েক কোটি টাকা বিভিন্ন খাতে খরচ করা হয়। অগ্নিকাণ্ডের অজুহাতে জরুরি আসবাবপত্র ক্রয় বাবদ ১৬ জানুয়ারি, ২০২৫ তারিখে ১ কোটি ২ লক্ষ ১৯ হাজার ৪ শ’ ১৩ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। আসবাবপত্র ক্রয় বাবদ একই তারিখে আরও ৫৬ লাখ ৮২ হাজার ৯২৪ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়। উল্লেখ্য, এসব আসবাবপত্রের মধ্যে ৪২টি আলমারী এবং ৩২টি ফাইল কেবিনেট ক্রয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু ক্রয়কৃত মালামাল সরবরাহ না নিয়ে অধিকাংশ আলমারি ও ফাইল কেবিনেট প্রকল্প হতে এনে শাখা/ অধিশাখায় সরবরাহ করা হয়েছে। ১৬ জানুয়ারি, ২০২৫ একই তারিখে কম্পিউটার ক্রয় বাবদ ৬১ লাখ ৩৩ হাজার ৭শ’ টাকার এবং কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক বাবদ ১১ লাখ ৩৮ হাজার ১০ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ খাতেরও অধিকাংশ অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে। টার্টেল বিডি, এমবিট এবং ছোঁয়া- এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে এসব কেনাকাটার বিল পরিশোধ হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রিনরোড এবং কলাবাগানে একই এলাকায়। জনৈক রঞ্জিত ভৌমিক এবং মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-২ শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা হোসাইন আহম্মদ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অফিসিয়াল-আনঅফিসিয়াল মালিক বলে জানা গেছে।
শীর্ষনিউজ