সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, ‘পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতা ও আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন বাস্তবমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।’
বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ)-এর ৯০তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজে বিএমএ প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দক্ষ, আধুনিক ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সেনাবাহিনীর কোনো বিকল্প নেই। একটি প্রশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল ও আধুনিক বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যেই সেনাবাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে।’
সেনাপ্রধান বলেন, ‘১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি দক্ষ ও যোগ্য সেনা কর্মকর্তা তৈরির মাধ্যমে দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। এখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছেন।
নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাদের ওপর দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।’ সততা, সত্যবাদিতা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমের মতো নেতৃত্বের মৌলিক গুণাবলি ধারণ করে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে। সামরিক মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও পেশাদারিত্ব সমুন্নত রেখে দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সেনাপ্রধানের ভাষ্য, শৃঙ্খলা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও উৎকর্ষ অর্জনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সেনাবাহিনীর প্রতিটি কার্যক্রম নির্ধারিত নিয়ম, প্রথা ও অনুশাসনের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। নতুন কর্মকর্তাদের অধীনস্থ সৈনিকদের প্রতি দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল আচরণ করার পাশাপাশি তাদের দক্ষ ও সুপ্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলার নির্দেশনাও দেন তিনি।
বক্তব্যের শেষাংশে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মূলমন্ত্র ‘সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে’ স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাই একজন সেনা কর্মকর্তার জীবনের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন এবং কৃতি ক্যাডেটদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। দীর্ঘ তিন বছরের কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে এই মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজের মাধ্যমে ৯০তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের সর্বমোট ১৮৪ জন অফিসার ক্যাডেট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদের মধ্যে ১৬৬ জন পুরুষ ও ১৮ জন মহিলা অফিসার রয়েছেন। এছাড়াও, ৪ জন ফিলিস্তিন, ১ জন তানজানিয়া, ১ জন জাম্বিয়া এবং ১ জন মালদ্বীপ এর অফিসার ক্যাডেট বিএমএ হতে সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন, যারা নিজ নিজ দেশের সেনাবাহিনীতে যোগদান করবেন। ৯০তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের ব্যাটালিয়ন সিনিয়র আন্ডার অফিসার খায়রুল ইসলাম সেরা চৌকশ ক্যাডেট হিসেবে অসামান্য গৌরবমণ্ডিত 'সোর্ড অব অনার' ও সামরিক বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য 'সেনাবাহিনী প্রধান স্বর্ণপদক' অর্জন করেন। পাশাপাশি, এ একাডেমি হতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সর্বশ্রেষ্ঠ বিদেশী ক্যাডেট হিসেবে 'বিএমএ ট্রফি অব এক্সিলেন্স' অর্জন করেন সার্জেন্ট আবু বকর, তানজানিয়া। পরে প্রশিক্ষণ সমাপনকারী ক্যাডেটগণ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করেন। এরপর অনুষ্ঠানে আগত অতিথিবৃন্দ এবং প্রশিক্ষণ সমাপনকারী ক্যাডেটদের পিতা-মাতা ও অভিভাবকগণ নবীন অফিসারদের র্যাঙ্ক-ব্যাজ পরিয়ে দেন।
পরে সেনাবাহিনী প্রধান বিএমএতে নবপ্রতিষ্ঠিত ‘২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’ এবং নবনির্মিত সিএমএইচ ভাটিয়ারি, বিএমএ পার্ক, বিএমএ সুইমিং পুল ও এমইএস অফিস কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তিন বাহিনীর উর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাগণ, বিএমএ’র বিভিন্ন পদবির কর্মকর্তাগণ, অফিসার ক্যাডেটবৃন্দ এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিবর্গ।