জটিলতা দেখা দিয়েছে ভূমি অধিগ্রহণে। ফলে এই ভূমিতেই আটকে আছে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ। আগামী ৩০ জুন শেষ হয়ে যাচ্ছে প্রকল্পের মেয়াদ। কিন্তু ২৫টি কেন্দ্রের মধ্যে এখনো ১৫টির কাজই শুরু হয়নি।
এক হাজার ৬০৯ কোটি টাকার এ প্রকল্পে ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও খরচ হয়েছে ৪৫৩ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ২৮ শতাংশ। এদিকে দরপত্র প্রক্রিয়াতেই ঘুরপাক খাচ্ছে প্রকল্পের কেনাকাটা। প্রকৌশল ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি কেনায় ২৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও এ খাতে অগ্রগতি শূন্য।
এর পরিপ্রেক্ষিতে স্টেশন সংখ্যা কমিয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে।
‘সড়ক ও মহাসড়কের আওতাধীন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে পণ্য পরিবহনের উৎসমুখে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পে বিরাজ করছে এমন অবস্থা। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনের খসড়ায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।
আইএমইডির সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী আগামীর সময়কে বলেছেন, অন্যান্য বছর কী হয়েছে বা কী হয়নি সেটি বড় কথা নয়। আইএমইডির দেওয়া সুপারিশ যাতে এ বছর বাস্তবায়নে গুরুত্ব পায় সেজন্য বিশেষ উদ্যোগ নেব। এবার মূল্যায়ন করা সব প্রতিবেদন নিয়ে একটি বই করা হবে। তারপর এটি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হবে। যাতে যারা প্রকল্পের এসব ঘটনার জন্য দায়ী তাদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ১৬টি বিভাগের আওতায় ১৭টি স্থানে ভূমি অধিগ্রহণ কেস রয়েছে। এর মধ্যে কেস শেষ হয়েছে ছয়টির, জমি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য ডিসি অফিসকে অনুরোধ করা হয়েছে একটির, প্রাক্কলন অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে তিনটির এবং ডিসি অফিস থেকে প্রাক্কলন পাওয়া যায়নি ছয়টির। এছাড়া প্রশাসনিক আদেশের জন্য মন্ত্রণালয়ে একটি জমির চিঠি পাঠানো হয়েছে। বাকি তিনটি ঠিক আছে।
এই অবস্থা থেকে ভূমি অধিগ্রহণের ধীরগতির চিত্র উঠে আসে। এছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ খাতে বরাদ্দ আছে ১৭৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে খরচ হয়েছে ১৪৪ কোটি ৪ লাখ টাকা।
এদিকে ইউটিলিটি স্থানান্তর খাতে বরাদ্দ আছে ১৭ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৬ কোটি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জমি বুঝে না পাওয়ায় ইউটিলিটি স্থানান্তর সম্ভব হয়নি।
এছাড়া সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণে এপ্রোচ রোডের রিজিড পেভমেন্ট নির্মাণ, ফ্লাক্সিবল পেভমেন্ট, রোড বেরিয়ার, আরসিসি ড্রেন ইত্যাদির কাজ হয়েছে ১০ এলাকায়। কিন্তু ভূমি বুঝে না পাওয়ায় ১৫টিতে কাজ শুরু করা যায়নি। ১০ সাইটে অনাবসিক ভবন তৈরি হয়েছে, কিন্তু ভূমির কারণে বাকি ১৫টিতে কাজই শুরু হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। প্রকৌশল ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি খাতের আওতায় ওয়ে ইন মোশন (এই যন্ত্রের মাধ্যমে গাড়ি না থামিয়েও ওজন মাপা যায়) কিনতে ২ বার দরপত্র আহ্বান করেও সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। প্রথমবার উপযুক্ত সরবরাহকারী না পাওয়া এবং দ্বিতীয়বার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় তা বাতিল করতে হয়। তৃতীয়বার দরপত্র এখনও আহ্বান করা হয়নি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, যেহেতু ৩০ জুনের মধ্যে এটি শেষ করা সম্ভব নয়, সেহেতু প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি এবং এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশনের সংখ্যা ২৫টি থেকে কমিয়ে ১৭টি করার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগে একবার প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। এটির বাস্তবায়ন দেরি হওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে- প্রকল্প অনুমোদনে দেরি, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তর কার্যক্রমে দেরি এবং দরপত্র জটিলতা।
জানা যায়, প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ বর্তমানে প্রকল্প বাস্তবায়নে মূল চ্যালেঞ্জ। কিছু কেসের ক্ষেত্রে এখনও ডিসি অফিসের প্রাক্কলনই পাওয়া যায়নি। আবার কিছু কেসের ক্ষেত্রে ডিসি অফিসকে প্রাক্কলনের অর্থ বুঝিয়ে দিলেও জমি হস্তান্তর হয়নি।
প্রতিবেদনে আইএমইডি আরও বলেছে, যে কোনো প্রকল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হচ্ছে নিরীক্ষা সম্পাদন। প্রকল্পের আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতে নিরীক্ষা কার্যক্রম জরুরি। কিন্তু শুরু হওয়ায় পর এখন পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ইন্টারনাল অথবা এক্সটারনাল কোনো নিরীক্ষা কার্যক্রম সম্পাদিত হয়নি। যেখানে প্রতি অর্থবছরে একবার নিরীক্ষা কার্যক্রম সম্পাদিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার পর প্রায় ৭ বছর পার হয়েছে। এর মধ্যে মোট ৪ জন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) কর্মরত ছিলেন এবং ৩ বার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা হয়েছে। সর্বাধিক ৩০ মাস এবং সর্বনিম্ন ২ মাস মেয়াদে প্রকল্প পরিচালকরা কাজ করেছেন। এক্ষেত্রে ৫০ কোটি টাকার বেশি প্রাক্কলিত ব্যয়সম্পন্ন প্রকল্পে নিয়মিত প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের যে নির্দেশনা রয়েছে, তা মানা হয়নি। প্রকল্প কার্যক্রম তদারকির ক্ষেত্রে নিয়মিত পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) এবং পিএসসি (প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি) এর সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার নিয়ম। কিন্তু সেটি নিয়মিত করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের মূল ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) ভৌত কাজের ডিজাইন দূরদর্শিতার সঙ্গে করা হয়নি। ফলে অনেক বিষয় নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন হয়েছে। ডিজাইন অনুসারে ওয়্যারহাউজ বিল্ডিংয়ের যে হাইট ধরা হয়েছিল তা অপর্যাপ্ত হিল। মূল ডিপিপিতে ১০০ ইউজারের কথা বিবেচনায় রেখে ডিজাইন করা হয়েছিল, যা কম বিবেচিত হওয়ায় সংশোধিত ডিপিপিতে তা বৃদ্ধি করে ২০০ ইউজারের সংস্থান রাখা হয়েছে। এছাড়া বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ অংশে মূল ডিপিপিতে বাউন্ডারি ওয়ালে ফাউন্ডেশন ডিজাইন বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। আরও অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ ডিজাইন পাওয়া গেছে।