যে পুলিশের কাঁধে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব, সেই বাহিনীর সদস্যরা এখন নিরাপত্তাহীনতায়। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রায়ই হামলার শিকার হচ্ছেন তারা। কখনো থানা ঘেরাও হচ্ছে, কখনো ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে আসামি। কোথাওবা হামলার মুখে পড়ছেন টহল পুলিশ কিংবা অভিযানে যাওয়া সদস্যরা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রেহাই পাচ্ছেন না বাহিনীটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।
সবশেষ গত মঙ্গলবার লালমনিরহাটের আদিতমারীতে হামলা হয় পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের গাড়িতে। এর কিছু সময় আগে একই দিন রাজধানী ঢাকায় ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে চাপাতির কোপে রক্তাক্ত হন আদাবর থানার ওসি ও তার সঙ্গে থাকা এক এসআই। এ দুটি ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
অপরাধ-বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সৃষ্ট বাস্তবতা, জনমনে জমে থাকা ক্ষোভ, অপরাধী চক্রের বেপরোয়া তৎপরতা এবং বাহিনীর অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক সংকট— সব মিলিয়ে পুলিশ এখন জটিল এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
নিরাপত্তা-বিশ্লেষকদের মতে, একটি রাষ্ট্রে পুলিশের ওপর ধারাবাহিক হামলা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও আইনের শাসনের প্রতিও সরাসরি চ্যালেঞ্জ। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেন।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে চলতি বছরের মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ২৬৮টি— এমন তথ্য খোদ পুলিশ সদর দপ্তরের।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ময়নামতি হাইওয়ে ক্রসিং এলাকায় গত ৯ জুন টহল দলের ওপর চালক ও স্থানীয় একদল মানুষ হঠাৎই হামলা চালায়। অবৈধ থ্রি-হুইলার আটকের জেরে ভাঙচুর করা হয় হাইওয়ে পুলিশের গাড়ি। একই দিন রাতে সাভারের বক্তারপুরে মাদক মামলার আসামি ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হন দুই পুলিশ সদস্য। হাতকড়া পরানোর সময় ৪০-৫০ জনের একটি দল লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নেয় আসামি।
নিরাপত্তা-বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে পুলিশকে ঘিরে জনমনে নানা অভিযোগ ও অসন্তোষ জমা হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ, হয়রানি, দুর্নীতি কিংবা পক্ষপাতমূলক আচরণের মতো বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি জনআস্থা কমে গেলে তাদের কর্তৃত্ব ও গ্রহণযোগ্যতাও হয়ে পড়ে দুর্বল। আর এমন পরিস্থিতির সুযোগ নেয় অপরাধী চক্র ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠী।
কোথাও কোথাও হামলাকারীরা মনে করছে, পুলিশ আগের মতো শক্ত অবস্থানে নেই। ফলে তারা সংঘবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা কিংবা হামলা চালানোর সাহস পাচ্ছে।
নিরাপত্তা-বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে একটি পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ সময় অনেক কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। ফলে মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা দ্বিধা কিংবা অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। বর্তমানে ‘ট্যাগিং সংস্কৃতি’ সবচেয়ে বেশি বিরাজ করছে পুলিশে। নিজেদের মধ্যে মতের অমিল হলেই ভিন্নমতেই সদস্যকে স্বৈরাচারের দোসরসহ জুড়ে দেওয়া হচ্ছে নানা কালিমা।
অপরাধ-বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক আগামীর সময়কে বললেন, ‘সেনাসদস্যরা এখনো মাঠে আছেন। বাস্তবতার নিরিখে তাদের সক্ষমতা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো না হলে অপরাধীরা সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা নিজেদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি প্রয়োগ করবেন, এটি স্বাভাবিক। তবে যেখানে লাঠি দিয়েই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, সেখানে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার সমর্থনযোগ্য নয়।’
পুলিশের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংস ঘটনার প্রভাব এখনো অনেক সদস্যের মধ্যে রয়ে গেছে। নাম প্রকাশে অনাগ্রহী একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বললেন, ‘অনেক সদস্য মনে করেন তাদের যেকোনো সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে বিতর্কের কারণ হতে পারে। ফলে তারা অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে যাচ্ছেন।’
কয়েকজন কর্মকর্তা বললেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভুল হতেই পারে। কিন্তু তাদের আশঙ্কা, কোনো বিতর্ক তৈরি হলে অনেক সময় প্রতিষ্ঠান তাদের পাশে দাঁড়াবে কি না— সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা কাজ করে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে চাপ, অনিশ্চয়তা ও জনসমালোচনার মধ্যে কাজ করলে যেকোনো পেশাজীবী গোষ্ঠীর মধ্যে আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি হতে পারে। পুলিশের ক্ষেত্রেও এমনটি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা কিংবা পুরনো ঘটনার পুনরাবৃত্তিও জনমতকে প্রভাবিত করছে। অনেক সময় গুজব বা অসম্পূর্ণ তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। যাচাই-বাছাইয়ের আগেই কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিয়ে ফেলছে। সম্প্রতি ফেনীতে পুলিশ সুপার হিসেবে পদায়নের পর মাহবুব আলী খানকে প্রত্যাহারের ঘটনায়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অপরাধ-বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঠেকাতে শুধু কঠোর আইনপ্রয়োগ যথেষ্ট নয়। জনআস্থা পুনর্গঠন, পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করতে হবে। জনগণ ও পুলিশের মধ্যে দূরত্ব কমানো না গেলে হামলার মতো ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে বাহিনীর সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য, পেশাগত নিরাপত্তা ও মনোবল পুনর্গঠনের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশের ওপর হামলা বৃদ্ধির পেছনে একক কোনো কারণ নেই। রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক মনস্তত্ত্ব, অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা, জনআস্থার সংকট এবং বাহিনীর অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ— সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গত ২১ মাসে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত হয়েছেন ৯৯০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য। শুধু গত মে মাসেই সারা দেশে পুলিশের ওপর ৫৫টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ডিএমপিতে ৯টি, সিএমপিতে ৩, কেএমপিতে ১, এসএমপিতে ২, জিএমপিতে ৩, ঢাকা রেঞ্জে ১০, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১০, সিলেট রেঞ্জে ২, খুলনা রেঞ্জে ২, বরিশাল রেঞ্জে ২, রাজশাহী রেঞ্জে ৫ এবং রংপুর রেঞ্জে ৬টি হামলার ঘটনা ঘটে। জুন মাসেও এ পর্যন্ত প্রায় ১০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘অপরাধীরা যদি পুলিশকে ভয় না পায়, তাহলে অপরাধ কখনো কমবে না। তারা যদি মনে করে পুলিশ কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেবে না, তাহলে তাদের মধ্যে ভয়ও থাকবে না। এটি উপমহাদেশের বাস্তবতা।’
চব্বিশের আগস্টের পর দুই বছর হয়ে গেলেও পুলিশ এখনো পুরোপুরি আগের অবস্থানে ফিরতে পারেনি উল্লেখ করে বাহিনীটির সাবেক এই মহাপরিদর্শক বললেন, ‘এর একটি কারণ কার্যকর নেতৃত্বের ঘাটতি। বর্তমান নেতৃত্বের উচিত সদস্যদের আরও প্রেরণা দেওয়া এবং তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বার্থে রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও পুলিশকে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।’
প্রায় একই ধরনের মত সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদার। তিনি বলছিলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়াতে হবে। অভিযানে নিজেরা উপস্থিত থেকে ফোর্সকে নেতৃত্ব দিতে হবে। পুলিশ ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে।’
যা বলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে থাকার কথা জানালেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন। তিনি বললেন, ‘আইন অনুযায়ী আমরা আমাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা প্রয়োগ করব। চাঁদাবাজ ও ছিনতাইকারী ধরতে ইউনিফর্মধারী সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও অভিযান চলছে। মোটরসাইকেল টহল ও গোয়েন্দা নজরদারির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
র্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান বললেন, ‘পুলিশের ওপর হামলার মতো ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে। আদাবরের ঘটনাকে আমরা কোনো বিচ্ছিন্ন ছিনতাই হিসেবে দেখছি না। এটি রাজধানীতে সক্রিয় অপরাধী চক্রগুলোর বেপরোয়া হয়ে ওঠার একটি উদাহরণ। সে কারণে অভিযানের কৌশলেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।’