Image description

দীর্ঘ অনিশ্চয়তা শেষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে নতুন করে পেশাগত জীবন শুরু করেছেন সাবেক দুই অতিরিক্ত বিচারপতি ব্যারিস্টার এস এম মাসুদ হোসেন দোলন এবং অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলাম। 

২০২২ সালের ৩১ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের এই দুই আইনজীবী হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই তাদের বিচারক জীবনের দুই বছর পূর্ণ হলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তাদেরকে স্থায়ী করেনি। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ার পর, একই বছরের অক্টোবরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া এই দুই বিচারপতিকে ছুটিতে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাদেরকে আর স্থায়ী না করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর তারা এখন আইনজীবী হিসেবে নতুনভাবে পেশাগত জীবন শুরু করেছেন। আদালতপাড়ায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। তারা দুজন নতুন করে আইন পেশায় ফিরে আসা নিয়ে ঢাকা পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন, ব্যক্ত করেছেন নিজেদের অনুভূতির কথা।

 

বিচারপতি মাসুদ হোসেন দোলন 

আইন পেশায় ফিরে আসা প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার এস এম মাসুদ হোসেন দোলন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি তো সবসময় আইন পেশায় ছিলাম। আমি প্রায় ব্ল্যাক টাইসহ ২৬ বছর সুপ্রিম কোর্ট বারে আছি। জুডিশিয়ারিতে ছিলাম প্রায় ২ বছর ৬ মাসের মতো। আমার মেয়াদ শেষ হয়েছে ৩০ জানুয়ারি। আমি ফেব্রুয়ারির ২ তারিখ থেকেই কোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করেছি। আল্লাহর রহমতে আমি ভালো আছি। একটা ব্রেকআপ চলে যাওয়ার পর একটু মামলা একটু কম আসে, তবে ইনশাল্লাহ ভালো আছি।

বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর পুনরায় আইন পেশায় যুক্ত হওয়ার আইনি নিয়ম ও জটিলতা স্পষ্ট করে তিনি বলেন, যারা অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর স্থায়ী (কনফার্ম) হননি, তারা হাইকোর্ট বিভাগ, আপিল বিভাগ কিংবা জজ কোর্টসহ যেকোনো আদালতেই প্র্যাকটিস করতে পারেন। তবে যারা একবার স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর কোনো কারণে অপসারিত হন, তারা আর কোথাও প্র্যাকটিস করার সুযোগ পান না। যারা স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে যান কিংবা ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ (রিজাইন) করেন, তারা উচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্র্যাকটিস করতে পারেন। এই আইনি বাধ্যবাধকতার কারণেই অনেকে অপসারিত হওয়ার আগেই ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করে থাকেন, যেন পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে প্র্যাকটিস করার সুযোগটি বহাল থাকে। কিন্তু সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে কেউ অপসারিত হলে তিনি আর কোথাও প্র্যাকটিস করতে পারেন না।

বর্তমানে কোন ধরনের মামলা পরিচালনা করছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন বলেন, মূলত আমি রিট, ক্রিমিনাল, সিভিল, এই তিন জুডিসডিকশনেই কাজ করেছি। আমার সিনিয়র ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমেদ। স্যারের ওইখানে ছিলাম প্রায় ১০ বছরের মতো। আলটিমেটলি সব মামলা তো আমি জুনিয়র থাকা অবস্থায় ডিল করে আসছি। এখনও আমি কোম্পানি, অ্যাডমিরালটি (নৌ-বাণিজ্য আইন), এবং ইনকাম ট্যাক্সসহ সব ধরনের মামলাই নিয়মিত পরিচালনা করছি। 

বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলাম

আইন পেশায় ফিরে আসা প্রসঙ্গে সাবেক অতিরিক্ত বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, এখন আমার কাছে বেশ ভালোই লাগছে, খুব এনজয় (উপভোগ) করছি। কারণ, আমি আগে থেকেই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম এবং পরবর্তীতে আমি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছি। সেখান থেকে বেঞ্চে গিয়েছি বিচারক হিসেবে। বিচারপতি হিসেবে আড়াই বছর কাজ করেছি। দুবছর আমাদের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরে আরও ছয় মাসের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু অন্তবর্তী সরকার আসার পর আমাদের ওই ছয় মাস উত্তীর্ণ হওয়ায় আর স্থায়ী করেননি। স্থায়ী না করায় পূর্বের পেশায় আবার ফিরে এসেছি। 

বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, মাঝখানে আমরা আড়াই বছর বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি, তা সাধারণ আইনজীবী, সহকর্মী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে বলবো, চেষ্টায় কোনো ত্রুটি করিনি। ন্যায়বিচার যতটুকু প্রতিষ্ঠা পাওয়া দরকার, সেটা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছি এবং অনেক মামলা আমি ডিসপোজাল (নিষ্পত্তি) করেছি। আমি যেদিন দায়িত্ব পালন শেষ করে চলে আসি, শেষ কার্যদিবসে কোনো আদেশ বা রায় পেন্ডিং (অসমাপ্ত) ছিল না। সব মামলার নিষ্পত্তি ও রায় প্রদান সম্পন্ন করেই এজলাস থেকে নেমেছি। সুপ্রিম কোর্টের এই আঙিনাটা আমাদের আগে থেকেই পরিচিত। এখানে দীর্ঘদিন এই পেশায় আছি, সুতরাং এখানে নতুনত্বের কিছু নেই। পুরোনো পেশায় ফিরেছি এবং এটা খুব এনজয় করছি।

বর্তমানে কোন ধরনের মামলা বেশি পরিচালনা করছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আগেও যেমন প্র্যাকটিস করেছি, এখনও করছি। এর মাঝপথে আড়াই বছর বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। সুতরাং, সেখানে ক্রিমিনাল (ফৌজদারি), সিভিল (দেওয়ানি) এবং রিট, তিনটি বেঞ্চেই কাজ করেছি। তিন দিক থেকেই আমাদের সেই অভিজ্ঞতা আছে। 

তিনি আরও বলেন, আইন পেশায় ফিরে আসার পর যেই ক্লায়েন্টই (মক্কেল) সিভিল, ক্রিমিনাল এবং রিট বিষয়ে মামলা শুনানির জন্য নিয়ে আসেন, তাদের সর্বোচ্চ আইনি সহায়তা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করি। 

প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের ৩১ জুলাই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এস এম মাসুদ হোসেন দোলন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলামসহ মোট ১১ জনকে হাইকোর্ট বিভাগে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দুই বছরের মেয়াদ শেষে ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই তাদের মধ্যে ৯ জনকে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। তবে বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলাম ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলনকে স্থায়ী না করে, অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে তাদের মেয়াদ আরও ছয় মাসের জন্য বৃদ্ধি করা হয়।
  
এরই মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ‘দোসর’ হিসেবে কাজ করার অভিযোগে হাইকোর্টের ১২ জন বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ওই ১২ বিচারপতিকে ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং হাইকোর্টের বেঞ্চে তাদের বিচারকাজ পরিচালনা থেকে বিরত রাখা হয়। এই তালিকায় বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলাম ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলনও ছিলেন এবং পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর থেকে তাদের বিচারকাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।