চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি, টার্মিনাল ও বহিনোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামার কাজে দীর্ঘ ১৮ বছর পর নতুন অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ২০০৮ সালের পর থেকে ৪৬টি প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরের পণ্য ওঠানামার কাজে।
মাঝখানে নির্ধারিত মেয়াদ শেষে বন্দর কর্তৃপক্ষ একাধিকবার দরপত্র ডাকলেও, কঠিন কিছু শর্তের কারণে নতুন কোন কোম্পানি এই খাতে প্রবেশ করতে পারেনি। প্রতিযোগিতা না থাকায় সেবার মানে ও সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত হয়নি।
বন্দর কর্তৃপক্ষ এখন মূলত রাজনৈতিক চাপে পড়ে অপারেটর সংখ্যা বাড়াতে চাইছে। সরকারেরও এতে সায় রয়েছে বলে জানা গেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে ২৩ প্রতিষ্ঠানকে এই কাজে নিয়োগ দেয়। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেসব বাতিল করা হয়। এখন বিএনপি সরকার একইপথে হাঁটছে বলে অভিযোগ করেছে খোদ বর্তমান অপারেটররাই।
এমন বাস্তবতায় বর্তমান অপারেটরদের বিরোধিতা এবং উচ্চ আদালতে যাওয়ার হুমকির মুখে এই প্রক্রিয়া শেষপর্যন্ত কতটা সফল হয় তা নিয়ে রয়েছে বেশ সংশয়।
চট্টগ্রাম বন্দর সচিব নাসির উদ্দিন বলছেন, ‘নতুন লাইসেন্স দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছে। আগে যারা আবেদন করেছেন, এই বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী তাদের নতুন করে আবেদনের দরকার নেই। আর কতজনকে দেয়া হবে সেটি কমিটিই নির্ধারণ করবে।’
২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মোট ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৫১ হাজার টন খোলা ও কন্টেইনারজাত পণ্য (কার্গো) ওঠানামা করেছে। আর জেটি, টার্মিনাল মিলিয়ে মোট ৩৪ লাখ ৯ হাজার একক কন্টেইনার উঠানামা হয়েছে। পুরো কাজ করেছে ৪৬ অপারেটর। জাহাজ ভেড়ানো, পণ্য উঠানামা, ইয়ার্ডে রাখাসহ নানা খাতে ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর আয় করেছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কাগো বার্থের (জিসিবি) ১২ জেটিতে পণ্য উঠানামার কাজ করছে ১২ প্রতিষ্ঠান। দুটি টার্মিনাল চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং নিউমুরিং কন্টেইনার টামিনাল (এনসিটি)তে কাজ করছে দেশি প্রতিষ্ঠান। আর পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালতে (পিসিটি) কাজ করছে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান। বহির্নোঙর সাগরে জাহাজ থেকে পণ্য স্থানান্তর (লাইটারিং) কাজে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর হিসেবে কাজ করছে ৩৩ প্রতিষ্ঠান।
সব মিলিয়ে ৪৮টি অপারেটর প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের প্রতিনিধিত্বকারী বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সারওয়ার হোসেন সাগর ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানালেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলেও ২৩টি দলীয় বিবেচনায় লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। এখন আবারো বিএনপিদলীয় বিবেচনায় লাইসেন্স দেয়ার চেষ্টা চলছে। ঢালাওভাবে লাইসেন্স দেয়া হলে এই কাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।’
১২ জেটির প্রতিনিধিত্ব করছে বার্থ অপারেটর, টার্মিনাল অপারেটর এবং শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর ওনার্স এসোসিয়েশন। সংগঠনের নেতা বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম জানালেন, ’বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য উঠানামা একটি বিশেষায়িত কাজ। এখানে যন্ত্রপাতি এবং শ্রমিকদের সমন্বয়ে জটিল কাজ করতে হয়। এখানে নতুন-অনভিজ্ঞদের লাইসেন্স দেয়া নিয়ে আমাদের আপত্তি আছে। কত লাইসেন্স দেয়া প্রয়োজন সেটিও আগে নিশ্চিত হতে হবে, স্টেকহোল্ডারদের সাথে বসতে হবে। আর অনভিজ্ঞরা কাজ পেলে বন্দরের এখনকার যে সেবা সেটি দারুণভাবে বিঘ্নিত হবে।’
এক শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর জানালেন, একটি আবেদন ফি এক লাখ টাকা। আগে তিনশ আবেদন জমা পড়েছে। এখন আরো একশসহ মোট ৪শ আবেদন জমা পড়লে বন্দর চার কোটি টাকা আয় করবে। পুরো টাকাই নন-রিফান্ডেবল।
বন্দরের বার্থ অপারেটর পারভেজ আহমেদ জানালেন, লাইসেন্স দিলেই যে সবাই পণ্য উঠানামার কাজ পাবে বিষয়টি এমন নয়। জেটিতে কাজ পেতে তো নির্দিষ্ট যোগ্যতা অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।