পুরান ঢাকার সরু গলিগুলোতে একসময় ছিল নীরব অনন্য উদারতার ছোঁয়া। সেখানকার পলেস্তারা খসে পড়া কংক্রিটের দেয়ালে ঝুলত শার্ট, শিশুদের পোশাক, শীতের কম্বল আর শাড়ি। যাদের সামর্থ্য বেশি ছিল তারা এগুলো রেখে যেতেন, আর যাদের প্রয়োজন তারা তা নিয়ে যেতেন। এখানে কারও নাম লেখা হতো না, কাউকে কোনো প্রশ্নও করা হতো না। এই দেয়ালগুলো একটি সহজ বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে চলত, আর তা হলো–মানুষ মানুষের জন্য।
সেই দেয়ালগুলোর অনেকগুলো হয় হারিয়ে গেছে, নয়তো চরম অবহেলায় পড়ে আছে। কিছু দেয়াল পোস্টার ও দেয়াললিখনের স্তূপের নিচে ঢাকা পড়ে গেছে। অন্য দেয়ালগুলোর হ্যাঙ্গার, রঙ এবং উদ্দেশ্য সবই হারিয়ে গেছে। এখন পুরান ঢাকার গলিগুলোতে হাঁটলে এই সহানুভূতির উপস্থিতি আর চোখে পড়ে না। বরং এর ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের একই ধরনের উদ্যোগ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এক দশকেরও বেশি সময় আগে বাংলাদেশে স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক প্রয়াস হিসেবে ‘মানবতার দেয়াল’ কর্মসূচির সূচনা হয়েছিল। ঢাকায় স্থানীয় বাসিন্দা, তরুণ সমাজ এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠন মিলে তৈরি করেছিল কিছু নির্দিষ্ট জায়গা। সেখানে যে কেউ অনুদানের কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অভাবী মানুষের জন্য রেখে যেতে পারতেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়াই কেবল বিশ্বাসের ওপর ভর করে এই ধারণাটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল।
পুরান ঢাকায় বছরের পর বছর ধরে পাশাপাশি বাস করে আসছে মানুষ। এখানকার সামাজিক বন্ধন ঐতিহাসিকভাবেই বেশ দৃঢ়। তাই এই এলাকায় উদ্যোগটি খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। সদরঘাটের ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিংয়ের পাশে শিরিশ দাস লেনের প্রবেশমুখে পুরনো ঢাকার অন্যতম পরিচিত একটি ‘মানবতার দেয়াল’ এখনো টিকে আছে, তবে তা প্রায় ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আর্থিক সহায়তায় তৈরি এই দেয়ালটি একসময় রঙিন চিত্রকর্মে সাজানো ছিল। তখন এখানে হ্যাঙ্গারে সারিবদ্ধভাবে ঝুলত অনুদানের কাপড়।
এই এলাকায় বেড়ে ওঠা একুশ বছর বয়সী মিরাজুল ইসলাম এখন একটি বেসরকারি সংস্থায় বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। তিনি এখানকার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃশ্য মনে করতে পারেন। তিনি বলেন, দিনের বেলা এখানে প্রচুর কাপড় ঝুলে থাকত এবং রাতের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যেত। শুরুতে তিনি ভাবতেন অভাবী মানুষেরাই এই কাপড়গুলো নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পরে তিনি জানতে পারেন, অনেকেই এসব কাপড় সংগ্রহ করে পুরোনো কাপড়ের বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এমনকি কিছু মানুষ কাপড়ের বদলে ঘরের হাঁড়ি-পাতিল ও তৈজসপত্রও বদলে নিচ্ছেন।
এই দেয়ালটি একসময় কিসের প্রতীক ছিল, তা বোঝার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। দেয়ালের রঙ চটে গেছে, লেখাগুলো ম্লান হয়ে গেছে। এমনকি হ্যাঙ্গারগুলোও চুরি হয়ে গেছে। লোকমুখে শোনা যায়, ভাসমান মানুষেরা এগুলো চুরি করে বিক্রি করে দিয়েছে।
লক্ষ্মীবাজারে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের পাশের গলির মুখেও একই চিত্র দেখা যায়। পাবোযা ফাউন্ডেশনের সহায়তায় তৈরি এই মানবতার দেয়ালটি এখন অবহেলার শিকার। দেয়ালের ওপরে একটি ছেঁড়া ব্যানার বাতাসে উড়ছে। চারটি হ্যাঙ্গারের মধ্যে তিনটি টিকে থাকলেও সেগুলো একটিমাত্র স্ক্রুর ওপর ভর করে আলগা হয়ে ঝুলে আছে। সেখানে এখন কেবল অল্প কিছু ধুলোবালি মাখা কাপড় অবশিষ্ট আছে।
এই প্রতিবেদক যখন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন এক বৃদ্ধা কাছে এলেন। তিনি একটি পোশাক চুপচাপ দেখলেন এবং তারপর খালি হাতে চলে গেলেন। কাছের একজন দোকানদার মোহাম্মদ মানিক জানান, এই উদ্যোগে একসময় স্থানীয় মানুষের দারুণ সমর্থন ছিল। আগে পাড়ার ছেলেরা এর দেখাশোনা করত, কিন্তু এখন সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং কেউ আর আগের মতো পরোয়া করে না।
তবে কেবল অবহেলা এই পতনের একমাত্র কারণ নয়। মানিক আরও বলেন, কিছু মানুষ এখান থেকে কাপড় নিয়ে বিক্রি করে দেয়। আবার কেউ কেউ নিজের দোকানের মোছার কাপড় হিসেবে ব্যবহারের জন্য এগুলো নিয়ে যায়। ফলে যাদের সত্যি প্রয়োজন, তারা প্রায়ই এগুলো পান না।
পুরনো ঢাকার সর্বত্রই এই একই কাহিনির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। কাগজিটোলা মওলা বক্স লেনে আরেকটি মানবতার দেয়াল কোনোমতে টিকে আছে। হিলফুল ফুজুল নামের একটি স্থানীয় সংগঠনের তৈরি এই কাঠামোটিতে একসময় লোহার হ্যাঙ্গার এবং সুরক্ষার জন্য একটি টিনের ছাউনি ছিল। এখন পাঁচটি হ্যাঙ্গারের মধ্যে মাত্র দুটি অবশিষ্ট আছে। বহু বছরের রোদ-বৃষ্টিতে দেয়ালের রঙ এতটাই চটে গেছে যে, এর বার্তার কেবল একটি অংশ পড়া যায়, যা হলো–‘আপনার প্রয়োজনের জিনিসটি নিয়ে যান’।
দীর্ঘদিনের বাসিন্দা শুক্কুর আলীর কাছে এই অবক্ষয় মানে অনেক বড় কিছু হারিয়ে যাওয়া। তিনি এই প্রতিবেদককে হিলফুল ফুজুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আবু তৈয়বের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আবু তৈয়বের কণ্ঠে ঝরে পড়ছিল তীব্র হতাশা। তিনি বলেন, তারা খুব ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে এটি শুরু করেছিলেন। স্থানীয় যুবকেরা এই দেয়ালটির দেখাশোনা করত, কিন্তু এখন তাদের আর সময় নেই। তা ছাড়া কয়েকজন অসৎ মানুষের কারণে ভালো মানুষেরাও এর ওপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।
তিনি আরও জানান, কারও হয়তো দুটি কাপড়ের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তারা ১০টি বা ২০টি করে নিয়ে যেতেন। কেউ কেউ কাপড়ের বদলে হাঁড়ি-পাতিল নিতেন। এভাবেই আস্তে আস্তে সবকিছু বন্ধ হয়ে গেছে।
তার এই বক্তব্য বাসিন্দাদের বর্ণিত সেই গভীর সংকটের দিকেই ইঙ্গিত করে, যা এই দেয়ালগুলো হারিয়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে। আর তা হলো বিশ্বাসের অবক্ষয়। এই ‘মানবতার দেয়াল’ একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তির ওপর নির্ভর করত। যেখানে দাতারা আন্তরিকভাবে দান করবেন, গ্রহীতারা কেবল তাদের প্রয়োজনের অংশটুকু নেবেন এবং সমাজ এই জায়গাটি রক্ষা করবে। একবার এই বোঝাপড়া ভেঙে যাওয়ার পর, দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে তাদের কার্যকারিতা এবং অর্থ দুটো হারিয়ে ফেলেছে।
কলতাবাজার, পচাগলি, ডালপট্টি এবং রোকনপুরে কিছু মানবতার দেয়াল এখন পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছে। অন্যগুলো কেবল ম্লান হয়ে যাওয়া রঙের দাগ হিসেবে টিকে আছে। এর সবচেয়ে বড় প্রতীকী উদাহরণটি দেখা যায় কবি নজরুল সরকারি কলেজের সামনে। সেখানে মূল কাঠামোটি এখনো রয়ে গেছে, তবে এর মূল উদ্দেশ্য এখন রাজনৈতিক স্লোগান, টিউশনির বিজ্ঞাপন, বাসা ভাড়ার নোটিশ এবং বাণিজ্যিক পোস্টারের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেছে। এসবের নিচে খুব সামান্য দৃশ্যমান অবস্থায় একটি ম্লান বাক্য লুকিয়ে আছে–‘আপনার প্রয়োজনীয় কাপড়টি নিয়ে যান’।
পুরোনো ঢাকায় যখন সন্ধ্যা নেমে আসে এবং সরু গলিগুলো থেকে সূর্যালোক মিলিয়ে যায়, তখন অবশিষ্ট মানবতার দেয়ালগুলোকে আরও বেশি একাকি ও নিঃসঙ্গ দেখায়। তবে মূলত যা হারিয়ে গেছে, তা হলো মানবতার সেই আসল চেতনা, যা একসময় এই দেয়ালগুলোকে অর্থবহ করে তুলেছিল।