Image description

প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার সরকারি সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। শুরুতে এটিকে ‘রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর’ হিসেবে দেখা হলেও, আগামী অর্থ বছরের বাজেটে এই উদ্যোগটি অন্তর্ভুক্ত করায় শিক্ষা খাতের বিশেষজ্ঞরা বেশ বিভ্রান্ত ও বিস্মিত হয়েছেন।

তাদের মতে, সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ও প্রস্তুতি ছাড়া কেবল রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর ভর করে এমন পদক্ষেপ নিলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো বিষয়কে বাধ্যতামূলক করার অর্থ হলো সরকারকে এর সার্বিক ব্যবস্থাপনার অসংখ্য দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে হয়। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বা দীর্ঘমেয়াদি নকশা সরকারের নেই।

‘শিক্ষা অধিকার সংসদ’-এর সদস্য সচিব এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, একটি সুনির্দিষ্ট শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম প্রণয়ন এবং সেই অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ না করে এমন বড় কার্যক্রম শুরু করা মোটেও উচিত নয়।

শিক্ষার্থীদের এই বিষয়ে পাঠদানের জন্য শিক্ষকদের আচরণবিধি তৈরি করা এবং তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাও অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এর কোনো কিছুই এখনো করা হয়নি। এমন অবস্থায় বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে এই বিশাল প্রক্রিয়াটি আসলে কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এবং তা আদৌ সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়, যোগ করেন তিনি।

শিক্ষাবিদগণ পরামর্শ দিয়ে বলেন, কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে নাকি কেবল এর সুযোগ-সুবিধা আরও সম্প্রসারণ করা হবে, তা নতুন করে মূল্যায়ন করার জন্য শিক্ষাবিদ ও শিক্ষকদের নিয়ে দ্রুত একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান জানান, সরকারের উদ্দেশ্য ভালো হলেও এ বিষয়ে তাদের বোঝাপড়ার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে যদি অগ্রাধিকার দিতেই হতো, তবে সবার আগে শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করা দরকার ছিল, যা করা হয়নি। এমনকি প্রথমে দেশের শিক্ষানীতিও চূড়ান্ত করা হয়নি।

সব শিক্ষার্থীই যে উচ্চশিক্ষায় যাবে না–এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে অধ্যাপক মজিবুর রহমান সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কারিগরি শিক্ষা জোরপূর্বক চাপিয়ে না দেওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ, এর ফলে এই শিক্ষা কেবলই মুখস্থবিদ্যায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর পরিবর্তে তিনি প্রতিটি অঞ্চলে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন বিদ্যালয়ে জরিপভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে তোলার সুপারিশ করেন। এতে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা নিজে থেকে এটি বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে না।

তীব্র শিক্ষক সংকটে মূল কারিগরি খাত

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৬৫ হাজার ৫৬৯ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ২১ হাজারেরও বেশি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এত বড় একটি প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের মধ্যে কারিগরি শিক্ষা চালু করার জন্য দক্ষ শিক্ষকের জোগান দেওয়া কতটা সম্ভব, তা নিয়ে চরম সংশয় রয়েছে।

বর্তমানে দেশের ৫১ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং ১৬৬ টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে অনুমোদিত ১৭ হাজার পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন প্রায় আট হাজার শিক্ষক, যা প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। মূল কারিগরি খাতের এই মারাত্মক ঘাটতিগুলো পূরণ না করে নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার চিন্তা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন।

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের তীব্র অভাব, সময়োপযোগী প্রশিক্ষণের অনুপস্থিতি এবং আধুনিক ল্যাব যন্ত্রপাতির ঘাটতির কারণে কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পাঠ্যক্রমের মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারছে। এর ফলে ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীরা শিল্পকারখানার কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারছেন না, যা সরাসরি তাদের কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, আগে কারিগরি গ্র্যাজুয়েটরা খুব দ্রুত চাকরি পেয়ে যেতেন। কিন্তু এখন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার কারণে দক্ষতা উন্নয়ন ব্যাহত হওয়ায় তারাও বেকারত্বের শিকার হচ্ছেন।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণে পাঠানো সম্ভব হয় না। কারণ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে পাঠানো হলে শিক্ষার্থীদের ক্লাস বন্ধ রাখতে হয়।

আবার প্রতি বছর প্রশিক্ষণ না পাওয়ার কারণে শিক্ষকেরা নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে আধুনিক করে গড়ে তুলতে পারছেন না। এর ফলে গবেষণাগারে আধুনিক যন্ত্রপাতি আনা এবং শিক্ষার্থীদের সেগুলোর ব্যবহার শেখানোর প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ২০২২ সালে যে পাঠ্যক্রম তৈরি করা হয়েছিল, তা নিয়ে শিল্পকারখানার মালিকেরা সন্তুষ্ট নন। কিন্তু মূল সমস্যা হলো, শিক্ষক ও ল্যাবের অভাবের কারণে ওই পাঠ্যক্রমের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের বেশি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এখন আবার নতুন একটি পাঠ্যক্রম প্রণয়নের কাজ চলছে, তবে এটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করাই হবে আসল চ্যালেঞ্জ।

আবুল কালাম আজাদ পরীক্ষার নম্বর বণ্টনের বিষয়টি আধুনিকায়ন করার ওপরও জোর দেন।

কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমান পাঠ্যক্রমে ৬০ শতাংশ তাত্ত্বিক এবং ৪০ শতাংশ ব্যবহারিক শিক্ষার নিয়ম রয়েছে। তাত্ত্বিক বিষয়ে বেশি নম্বর থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা কেবল লিখিত পরীক্ষায় পাস করেই পার পেয়ে যায় এবং ব্যবহারিক দক্ষতাকে অবহেলা করে। দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মান বাড়াতে হলে তাত্ত্বিক পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে ব্যবহারিক মূল্যায়নের নম্বর বাড়ানো উচিত বলে তিনি পরামর্শ দেন।

আগ্রহের অভাব: খালি থাকছে ৬০ শতাংশ আসন

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের ১৪৯ সচল টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে মোট এক লাখ ৫৬ হাজার আসনের মধ্যে মাত্র ৬৪ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। ফলে প্রায় ৯৭ হাজার আসনই শূন্য রয়ে গেছে।

গত বছরও এই সংকট বজায় ছিল, অথচ বর্তমানে নির্মাণাধীন আরও ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠান চালু হলে মোট আসনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে দুই লাখ ৮৫ হাজার।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) প্রাক্তন অতিরিক্ত মহাপরিচালক এ কে এম রুহুল আমিন এই পরিস্থিতির জন্য দুর্বল কর্মসংস্থানের সুযোগকে দায়ী করেন।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যদি পাস করার পর চাকরি পায় কিংবা আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, তবেই এই শিক্ষার প্রতি সবার আগ্রহ আবার ফিরে আসবে।

আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করলেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না বলেই চাকরি পাচ্ছে না। তাই শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত কাজের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য বাস্তবমুখী উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

কারিগরি শিক্ষা বিশেষজ্ঞ সৈয়দ আজহারুল হক এ বিষয়ে বলেন, পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করার পর যখন তা মাঠপর্যায়ে যায়, তখন সেখানে তিনটি পক্ষ জড়িত থাকে–প্রশিক্ষক, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং শিক্ষার্থী। বাংলাদেশে বর্তমান প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং তাদের মানসিকতায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। আধুনিক কারখানাগুলোতে এখন যে ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে, দেশের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে সেই মেশিন নেই। ফলে এখানে উচ্চমানের কাজের জন্য অত্যন্ত নিম্নমানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যা স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা কমিয়ে দিচ্ছে।

আমলাতান্ত্রিক জবরদস্তির অভিযোগ

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা মানবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির প্রাক্তন প্রধান মনজুর আহমদ সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সাধারণ বিদ্যালয়গুলোতে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করলে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান হওয়ার পরিবর্তে আরও জটিল আকার ধারণ করবে।

তিনি বলেন, দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান এমনিতেই বেশ নাজুক। এর ফলে এই স্তরগুলো শেষ করে সবাই উচ্চশিক্ষায় যেতে পারছে না। অন্যদিকে, কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও সমস্যার কোনো শেষ নেই। ফলে এই শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না এবং বেকারত্ব দিন দিন বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, সেই সমস্যা সমাধানের নামে সাধারণ বিদ্যালয়গুলোতে কারিগরি শিক্ষা চালু করার বর্তমান প্রবণতাটি মোটেও ইতিবাচক নয়। বরং এটি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উপদেষ্টাদের সাথে কয়েকজন আমলার মিলে চাপিয়ে দেওয়া একটি সিদ্ধান্ত মাত্র।

মনজুর আহমদ বলেন, সাধারণ বিদ্যালয়গুলোর উচিত শিক্ষার্থীদের ভাষা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেওয়া। কারণ, বর্তমান শিক্ষার্থীরা এই মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করতেই হিমশিম খাচ্ছে।

তিনি সরকারকে পরামর্শ দেন যেন তারা প্রকৃত শিক্ষাবিদদের সঙ্গে বসে এই দক্ষতানির্ভর কারিগরি শিক্ষার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন এবং ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেন।

তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা জমতে জমতে পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত জটিল রূপ নিয়েছে। তা সত্ত্বেও নতুন সরকার যদি শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের জন্য একটি সামগ্রিক উদ্যোগ গ্রহণ করে, তবে কারিগরি শিক্ষাসহ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে অর্থবহ করে তোলা এখনো সম্ভব।

পরিকল্পনা ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে নেওয়া কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করার জন্য আধুনিক পাঠ্যক্রম, কার্যকর প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন করা বেশি জরুরি বলে মন্তব্য করেন মনজুর আহমদ।