Image description

একটি দেশের শুল্ক কাঠামো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধরন নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং এটি প্রধান অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।

জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে ঘোষিত শুল্ক ও করসহ বিভিন্ন রাজস্ব সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলো কেবল অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনেই নয়, বরং বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্যগুলো এগিয়ে নিতেও ব্যবহৃত হয়।

এই পটভূমিতে, দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর বৃহস্পতিবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের প্রথম জাতীয় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও সাবেক কূটনীতিকদের মতে, এবারের বেশ কিছু রাজস্ব পদক্ষেপের প্রভাব কেবল বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হতে পারে।

২০২৬–২৭ অর্থবছরের এই বাজেটটি এমন এক সময়ে আসছে যখন ঢাকা বিভিন্ন প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদারদের সাথে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ রাখছে এবং চলতি মাসের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বাংলাদেশ যখন বিনিয়োগ আকর্ষণ, বাণিজ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং প্রধান অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করতে চাইছে, তখন প্রস্তাবিত শুল্ক কাঠামোর ওপর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্ভাব্য প্রভাব গভীর নজরদারি করা হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক একজন শীর্ষ নীতি নির্ধারক ও কূটনীতিক বলেন, রাজস্ব নীতি দীর্ঘকাল ধরেই রাষ্ট্রপরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

তিনি বলেন, ‘জাতীয় বাজেটের কিছু বিধান একাধিক উদ্দেশ্য পূরণ করে। বিশেষ করে শুল্ক নীতিগুলো অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার ও বজায় রাখতে ব্যবহার করা যেতে পারে।’

তার মতে, শুল্ক বৃদ্ধি বা হ্রাস আমদানিকৃত পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে, বাণিজ্য প্রবাহে পরিবর্তন আনে এবং প্রায়শই সরকারের বৃহত্তর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারগুলোকে প্রতিফলিত করে।

তিনি আরও যোগ করেন, ‘বাণিজ্য নীতি এবং পররাষ্ট্র নীতি একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। শুল্ক সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো নির্ধারণ করতে পারে কোন দেশগুলো একটি বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে এবং এর ফলে তা দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করে।’

নতুন শুল্ক কাঠামো

সংসদে আগামী অর্থবছরের অর্থবিল পেশ করার কথা রয়েছে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর, যেখানে একটি সংশোধিত শুল্ক কাঠামো প্রস্তাব করা হতে পারে যা আমদানি প্রণোদনাকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, বৈদ্যুতিক যানের (ইভি) ওপর আমদানি শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হতে পারে। ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইভির ওপর শুল্ক হার প্রায় ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইভির ওপর ৮০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হতে পারে।

এ ছাড়া, বৈদ্যুতিক গতিশীলতা (ইলেকট্রিক মোবিলিটি) বৃদ্ধি এবং চার্জিং অবকাঠামোর উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে ইভি চার্জিং যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনা হতে পারে।

যেহেতু বর্তমানে চীন বিশ্বের বৃহত্তম বৈদ্যুতিক যান, ব্যাটারি এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির রপ্তানিকারক, তাই বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই পরিবর্তনের ফলে চীনা নির্মাতারা সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারেন।

বিপরীতে, ১ হাজার ২০০ সিসি থেকে ১ হাজার ৬০০ সিসি ইঞ্জিন ক্ষমতার প্রচলিত জ্বালানি চালিত গাড়ির শুল্ক ১৩২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ শতাংশ করা হতে পারে। এর অর্থ হলো, ১০ লাখ টাকা আমদানি মূল্যের একটি গাড়ির ওপর সংশোধিত কাঠামো অনুযায়ী অতিরিক্ত অন্তত আড়াই লাখ টাকার করের বোঝা চাপতে পারে।

যেহেতু জাপান বাংলাদেশের যাত্রীবাহী গাড়ি আমদানির প্রধান উৎস, তাই এই শুল্ক বৃদ্ধি জাপান থেকে গাড়ি আমদানিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

পাশাপাশি, উৎপাদন ও বিনিয়োগে সহায়তা করতে বিভিন্ন শিল্প কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে সরকারের। বৈশ্বিক শিল্প সরবরাহ চেইনে চীনের আধিপত্য থাকার কারণে এই খাতগুলোতে শুল্ক হ্রাস চীন থেকে আমদানি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

তারেক রহমানের চীন সফরের আগে

আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের কথা রয়েছে, যে সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে।

বাণিজ্য নীতি বিশ্লেষক ও আলোচক মোস্তফা আবিদ খান বলেন, বাজেটের এই পদক্ষেপগুলো আসন্ন সফরের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘নতুন বাজেট প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, কিছু শুল্ক সংস্কার চীনা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আমদানি বাড়াতে উৎসাহিত করতে পারে।’

আবিদ খানের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ি, যন্ত্রপাতি এবং শিল্প কাঁচামালের ওপর কম শুল্ক দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে পারে এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

তিনি বলেন, ‘রাজস্ব নীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। কারণ, এটি সরাসরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের প্রবাহকে প্রভাবিত করে।’

বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, অর্থনৈতিক কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে বিশ্বব্যাপী সরকারগুলো শুল্কনীতিকে ক্রমশ বেশি ব্যবহার করছে। উদাহরণ হিসেবে তারা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অংশীদার দেশগুলোকে পুরস্কৃত করতে, দেশীয় শিল্প রক্ষা করতে বা বিদেশি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির ব্যাপক ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন।

এই পরিস্থিতিতে, বিএনপি সরকারের অধীনে বাংলাদেশের প্রথম এই বাজেটটি কেবল দেশীয় অর্থনৈতিক প্রভাবের জন্যই নয়, বরং ঢাকা যখন বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কৌশলগত অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছে, তখন প্রধান আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে এটি কী বার্তা পাঠায় তা দেখার জন্যও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।