Image description

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক । দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে খাতটির প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পোশাক রপ্তানি নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, টানা কয়েক মাসের দুর্বলতার পর ঘুরে দাঁড়ানোর যে আভাস দেখা গিয়েছিল, তা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় রপ্তানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

বাংলাদেশের একক বৃহত্তম বাজার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দেশটির বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমেছে ১৭ দশমিক ২১ শতাংশ। রপ্তানিকারকরা বলছেন, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা শুল্কই এ বড় পতনের প্রধান কারণ।

ওটেক্সার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাস জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে মোট ২৯৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ কম। শুধু রপ্তানি আয় নয়, ইউনিটপ্রতি গড়মূল্য এবং রপ্তানির পরিমাণ দুক্ষেত্রেই হ্রাস পেয়েছে। এ সময়ে ইউনিটপ্রতি দাম ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং রপ্তানির পরিমাণ ৯ দশমিক ০১ শতাংশ কমেছে। ফলে মূল্য ও পরিমাণ—উভয় সূচকের পতনের কারণে মোট আয় সংকুচিত হয়েছে।

বাজারবিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানির সামগ্রিক প্রবণতাই বর্তমানে নিম্নমুখী। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদহারের কারণে মার্কিন ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় দেশটিতে সামগ্রিকভাবে পোশাক আমদানি ১২ শতাংশ কমেছে। সে প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রপ্তানি কমা একক কোনো ঘটনা নয়, বরং চাহিদা সংকোচনের প্রতিফলন।

তারা আরো বলেন, উদ্বেগের জায়গা তৈরি করেছে আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের সাফল্য। একই সময়ে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তাদের রপ্তানি ১ দশমিক ৩১ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। আরো চমক দেখিয়েছে কম্বোডিয়া, যেখানে তাদের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ০৭ শতাংশে। ফলে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ আরো কঠিন হয়ে উঠেছে।

ওটেক্সার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চীন ও ভারতের রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে উল্লিখিত সময়ে চীনের রপ্তানি আয় কমেছে ৫০ দশমিক ২১ শতাংশ ও ভারতের কমেছে ২৮ দশমিক ০৩ শতাংশ।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে ৪৪০ কোটি ২৭ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আগের বছরের একই মাসে এ পরিমাণ ছিল ৪৭৩ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ। উল্লিখিত সময়ে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৫৯ কোটি ডলার, যা গত বছরের মে মাসের ৩৯২ কোটি ডলারের তুলনায় প্রায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ কম। মূলত পোশাক খাতের এ বড় পতনের কারণেই সামগ্রিক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু আমার দেশকে বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হ্রাসের পেছনে কয়েকটি অভিন্ন কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের কারণে সেখানে ক্রেতাদের চাহিদা কমেছে। বাড়তি খরচের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে। ফলে ভোগ কমে গেছে, যে কারণে আমাদেরও রপ্তানি কমেছে। বর্তমান বাস্তবতায় রপ্তানি খাতে ইতিবাচক প্রবণতা কবে ফিরবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল আমার দেশকে বলেন, পুরো যুক্তরাষ্ট্র বাজারেই পোশাক আমদানিতে মন্দা চলছে। সে তুলনায় আমাদের রপ্তানি ওই বাজারে ততটা কমেনি। তবে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি কমে যাওয়ায় যে বাজার-সুযোগ তৈরি হয়েছিল, বাংলাদেশ তা কাজে লাগাতে পারেনি। সে সুযোগ নিয়েছে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো।