আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বড় ব্যবসায়ীদের ঢালাও সুযোগ দিচ্ছে সরকার। এতে বড় ব্যবসায়ীরা আনন্দিত হলেও চিন্তার ভাঁজ ছোট ব্যবসায়ীদের কপালে। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৌশলে শহরের মহল্লার দোকানি থেকে শুরু করে গ্রামীণ বাজারের খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত যাচ্ছে কর ও ভ্যাটের জাল। আর শিল্প উদ্যোক্তাদের তদারকিবিহীন সুবিধা দিলেও মধ্যবিত্তের করহার হচ্ছে দ্বিগুণ। যদিও কিছু নিত্যপণ্যে উৎসের কর কমিয়ে দেওয়া হবে সান্ত্বনা। ছোট ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের জালে আনতে ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাব খুলতে লাগবে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন)। আর ব্যাংকের সাধারণ হিসাব খুলতে লাগবে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন)। একই সঙ্গে করদাতা খুঁজতে এনআইডি থেকে শুরু করে ব্যাংক হিসাব এমনকি জমির রেজিস্ট্রেশন-সংক্রান্ত সার্ভারে থাকবে আয়কর কর্মকর্তাদের প্রবেশের সুযোগ। তবে স্বাস্থ্য, কৃষি, পোলট্রি ও উৎপাদনমুখী শিল্পে থাকছে বিশেষ কর ছাড়। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এমন প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
দীর্ঘ দুই দশক পর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভের পর এককভাবে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রথম বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে দলটি। বর্তমান মেয়াদে প্রথম বাজেট হলেও সামগ্রিকভাবে এটি হতে যাচ্ছে বিএনপি সরকারের ১৩তম জাতীয় বাজেট। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের পরিমাণ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট।
সূত্র জানায়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সারা দেশে ভ্যাটের জাল ছড়িয়ে দিতে ব্যাংকের ব্যবসায়িক হিসাব খুলতে বিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী। একইসঙ্গে খুচরা বিক্রেতাদের থেকে সরবরাহের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম কর আদায়ের প্রস্তাবও রাখবেন অর্থমন্ত্রী। তবে অগ্রিম করের পরিমাণ বেশি হলে ওই খুচরা বিক্রেতা কর দেওয়ার সময় সমন্বয় করতে পারবেন। এ ছাড়া আগামী অর্থবছর থেকে দেশের ক্ষুদ্র ও খুচরা বিক্রেতাদের জন্য অভিন্ন হারে টার্নওভার কর আরোপ করার প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী। এর বাইরে সাধারণ জনগণকে করের আওতায় আনতে ছাত্র এবং গেজেট দ্বারা অব্যাহতি ছাড়া সবার ব্যাংক হিসাব খুলতে লাগবে টিআইএন। অর্থাৎ করযোগ্য আয় না থাকলেও ব্যাংকে টাকা রাখতে গেলে খুলতে হবে টিআইএন। আর টিআইএন থাকলেই প্রতি বছর দিতে হবে রিটার্ন। আর রিটার্ন না দিলে গুনতে হবে জরিমানা। এ ছাড়া সারা দেশে করজাল সম্প্রসারণ করতে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ইউটিলিটি সেবা, সাব-রেজিস্ট্রিসহ করদাতার অন্যান্য সেবা প্রতিষ্ঠানে থাকবে এনবিআরের প্রবেশাধিকার। চাইলেই এনবিআর কর্মকর্তারা করদাতার ব্যাংক হিসাবের তথ্য নিতে পারবেন। করজাল বাড়ানোর অংশ হিসেবে আগামী বাজেটে এ প্রস্তাবও করবেন অর্থমন্ত্রী।
তবে এর বিপরীতে বড় ব্যবসায়ীদের জন্য থাকছে তদারকিবিহীন বন্ডেড সুবিধার প্রস্তাব। বন্ডেড প্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর অডিট করার বিধান থাকলেও তা বাড়িয়ে তিন বছর করা হচ্ছে। এ ছাড়া ওয়্যার হাউসের ক্যাপাসিটি অনুযায়ী একবারেই প্রাপ্যতা মিলবে ব্যবসায়ীদের। পাশাপাশি অফডক ও আইসিডি নীতিমালায় আনা হচ্ছে বড় পরিবর্তন। এসব অফডক বা আইসিডিতে বিদেশি মালিকানা ৪৯ শতাংশের বিধান বাতিল করা হচ্ছে। বিনিয়োগ আকর্ষণে করা হচ্ছে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানি ও উৎপাদনে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ ছাড়। বৈদ্যুতিক গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দুই লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সর্বনিম্ন ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া এসব গাড়ি আমদানির করভারও কমানো হচ্ছে। উল্টোদিকে অকটেন-পেট্রোল বা ডিজেলচালিত গাড়ির আমদানি শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী।
সূত্র আরও জানায়, আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির জন্য পাঁচ মেয়াদি করহার ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী। এতে আগামী ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা হচ্ছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ২০২৮-২৯ এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা হবে ৪ লাখ টাকা। আর ২০৩০-৩১ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণ করা হবে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে এই ব্যক্তিশ্রেণির করহারও নির্ধারণ করা হচ্ছে আগামী বাজেটে। আগামী অর্থবছর থেকে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি যারা আয় করবেন, তাদের ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। যা আগে ছিল ৫ শতাংশ। এই আয়ের পরবর্তী তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। যদিও উচ্চবিত্তের করহারে কোনো পরিবর্তন আনেনি সরকার। এ ছাড়া আগামী বাজেটে স্পিডবোট থেকে শুরু করে মৎস প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাটজাত পণ্য, ক্রোকারিজ, ডায়াপারসহ ১০ ধরনের পণ্য শুধু ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে সরকার বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির শুল্ক ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ করা হচ্ছে। আর ৫০ হাজার ডলারের বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে শুল্ক নির্ধারণ হচ্ছে ৮০ শতাংশ। এছাড়া প্লাগ ইন হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতেও শুল্ক ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭৩ শতাংশ করা হচ্ছে। এর বাইরে রেজিস্ট্রেশন খরচও করা হচ্ছে অর্ধেক। আগামী বাজেটে ল্যাপটপ, ডেক্সটপ থেকে শুরু করে সার্ভার, প্রিন্টার, মনিটরের সব শুল্ক প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী। ব্যবসায়ীদের খুশির অংশ হিসেবে অথোরাইজড ইকোনমিক অপারেটররা (এইও) কোনো ধরনের নিরীক্ষা প্রতিবেদন ছাড়াই পণ্য খালাস করতে পারবেন। আর কীটনাশক আমদানিতে প্রতিবার প্রত্যয়ন নিতে হবে না। একবার প্রত্যয়ন নিয়েই বছরজুড়ে কীটনাশক আমদানি করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। আর মোবাইল, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন উৎপাদনকারীদের ২০৩০ সাল পর্যন্ত শুল্ক সুবিধার প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী। তবে বিদেশি ওয়াশিং মেশিন আমদানির খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব রাখবেন অর্থমন্ত্রী।
সূত্র আরও জানায়, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ধান, চাল, গম থেকে শুরু করে গবাদি পশু, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ভোজ্য তেলবীজসহ ৬০ ধরনের নিত্যপণ্যের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী। এছাড়া সব ধরনের মসলা আমদানিতে থাকা ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্কও প্রত্যাহার করা হচ্ছে। আর খেজুর আমদানিতে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটিও প্রত্যাহার হচ্ছে। শিশু খাদ্য উৎপাদনে আমদানি করা কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হচ্ছে।
আগামী বাজেটে কৃষি খাতে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ সুবিধা। কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনের ৩৬টি কাঁচামালের আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হচ্ছে। আর সার উৎপাদনের কাঁচামালে প্রত্যাহার হচ্ছে আমদানি শুল্ক। এর বাইরে ভেটেরিনারি মেডিসিনের আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে পোলট্রি ডেইরি এবং মৎস্য খাতে কাঁচামাল আমদানিতে মিলবে রেয়াতি সুবিধা। আর পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনকারীরাও বিনা শুল্কে উপকরণ আমদানির সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্পূর্ণ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আর জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় ওষুধের ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাবও করবেন অর্থমন্ত্রী।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শুল্ক-কর ও ভ্যাটের হার বাড়ানোর তুলনায় শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বিবেচনায় অবারিত সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় কপার তার ও টিউবের শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। এর বাইরে রাজস্ব আহরণের বড় খাত হচ্ছে সিগারেট। এই খাতে করহার বা শুল্ক না বাড়িয়ে শুধু দাম বাড়িয়ে কর আদায়ের পরিকল্পনা করছে সরকার। এতে আদতে কোম্পানির মুনাফা বাড়বে। এ ছাড়া হিমায়িত মাছের আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে আগামী অর্থবছরের বাজেটে বাড়ি নির্মাণের খরচ কিছুটা বাড়বে। কারণ প্রস্তাবিত বাজেটে রডের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও করছেন অর্থমন্ত্রী।