মধ্য-বামপন্থী বাজেট নীতির মূল দর্শন সামাজিক সমতা, সম্পদের পুনর্বণ্টন এবং নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ। এতে সাধারণত সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, শ্রম সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।
বাজেট অর্থায়নের জন্য প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা—অর্থাৎ উচ্চ আয়ের ব্যক্তির ওপর তুলনামূলক বেশি কর আরোপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
যদিও তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে মধ্য-বামপন্থী বাজেট নীতি বা সামাজিক কল্যাণমুখী দর্শনের বাস্তবায়ন বড় ধরনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ ও দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়ে। একদিকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, ভর্তুকি ও জনসেবা সম্প্রসারণের রাজনৈতিক ও সামাজিক তাগিদ, অন্যদিকে সীমিত রাজস্ব, উচ্চ ঋণব্যয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের আস্থার সংকট। এ দুই বাস্তবতার সংঘাত বাজেট বাস্তবায়নকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়। বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আজ পেশ হতে যাওয়া বিএনপি সরকারের মধ্য-বামপন্থী বাজেটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আশঙ্কা থাকছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
অর্থ বিভাগের তথ্যানুসারে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার, যা আজ জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। যা চলতি অর্থবছরের ঘোষিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে (প্রস্তাবিত) রাজস্ব আহরণের সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ আসবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো অর্থবছরেই সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা দেশী-বিদেশী উৎস থেকে নেয়া ঋণের মাধ্যমে মেটানো হবে। এর মধ্যে বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নেয়া হবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। স্থানীয় উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ নেবে সরকার।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো নতুন কর্মসূচি যুক্ত করাসহ বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অধীনে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। জানা গেছে, সব মিলিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হতে পারে। ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ সম্ভাব্য বরাদ্দ দেয়া হবে ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকির সম্ভাব্য পরিমাণ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। তাছাড়া সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানো বাবদ প্রস্তাবিত বাজেটে অতিরিক্ত ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে।
অর্থনৈতিক সংকটকালে সরকারের মধ্য-বামপন্থী বাজেট নীতির বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হতে পারে বাজার-আরোপিত ব্যয় সংকোচন। উচ্চ ঘাটতি ও ঋণের ঝুঁকি দেখলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা সুদের হার বাড়িয়ে দেয় কিংবা পুঁজি প্রত্যাহার করে নেয়। এতে সরকার প্রায়ই এমন কৃচ্ছ্রসাধনমূলক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়, যা তাদের নিজস্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর ইউরোপের বহু মধ্য-বামপন্থী সরকারকে এ ধরনের চাপে পড়তে দেখা গেছে। এ নীতির আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাজস্ব ঘাটতি। অর্থনৈতিক সংকোচনের সময় ব্যবসা, বিনিয়োগ ও ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়ায় করের ভিত্তি সংকুচিত হয়। কিন্তু একই সময়ে বেকার ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও সরকারি সহায়তার চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে কর ব্যবস্থা সংস্কার বা নতুন রাজস্ব উৎস ছাড়া কল্যাণমূলক ব্যয় অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে এবং বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
মধ্য-বামপন্থী বাজেটকে সাধারণত দুটি অগ্রাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়—একদিকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন, ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষার মতো নিয়মিত ব্যয়; অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে অবকাঠামো, শিল্পায়ন বা উদ্দীপনামূলক বিনিয়োগ। সীমিত সম্পদের অর্থনীতিতে উভয় খাতে একসঙ্গে বড় ব্যয় প্রায়ই উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ঋণনির্ভরতা বা সম্পদের অদক্ষ বণ্টনের ঝুঁকি তৈরি করে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ রকম উদাহরণ দেখা গেছে। যুক্তরাজ্যে চ্যান্সেলর অব এক্সচেকার র্যাচেল রিভসের নেতৃত্বে লেবার সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলে একদিকে ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে সরকারি সেবা খাতে বিনিয়োগ বজায় রাখার চেষ্টা ছিল। জার্মানির মধ্য-বামপন্থী এসপিডির নেতৃত্বাধীন জোটের অধীনে বুন্দেসটাগ কর্তৃক অনুমোদিত ফেডারেল বাজেটে প্রতিরক্ষা ও সামাজিক কল্যাণ খাতে বড় আকারে ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি উচ্চমাত্রার সরকারি ঋণের প্রবণতা দেখা গেছে।
রাজনৈতিক বাস্তবতাও এ ধরনের বাজেট বাস্তবায়নে বড় বাধা সৃষ্টি করে। জোট সরকার বা বিভক্ত পার্লামেন্টে মধ্য-বামপন্থী দলগুলোকে প্রায়ই রক্ষণশীল দল কিংবা বাজারমুখী গোষ্ঠীর সঙ্গে আপস করতে হয়। এতে প্রগতিশীল নীতির ধার কমে যায়, আবার একই সঙ্গে বাজারও পুরোপুরি সন্তুষ্ট হয় না। ফলে নীতিগত দ্বৈত চাপ তৈরি হয়। অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে মধ্য-বামপন্থী বাজেটের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয় সামাজিক ন্যায়বিচার ও আর্থিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। পর্যাপ্ত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কার্যকর কর সংস্কার এবং দক্ষ ব্যয় ব্যবস্থাপনা ছাড়া শুধু সম্প্রসারণমূলক সামাজিক ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নব্য-উদারবাদী উন্নয়ন দর্শনে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতে সহায়ক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিকাশের পরিবেশ তৈরি করা। নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে বড় বাজেট স্বাভাবিক হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি একদিকে প্রয়োজনের তুলনায় ছোট। অন্যদিকে অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে বেশ চ্যালেঞ্জিং। রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকার জন্য বাজেটের আকার জিডিপির ২০-২২ শতাংশ হওয়া উচিত হলেও তা বর্তমানে ১২-১৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ; শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের প্রধান সংকট দুটি—নিম্ন রাজস্ব আহরণ এবং দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতা। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আদায়ের হার ৭ শতাংশেরও কম হওয়ায় বাজেট ক্রমেই ঋণনির্ভর হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতা, অপচয় ও দুর্নীতির কারণে ব্যয়ের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও দুর্নীতির কারণে প্রকৃত উপকারভোগীরা অনেক সময় বঞ্চিত হন। তাই শুধু বাজেটের আকার বৃদ্ধি নয়, রাজস্ব আহরণ, ব্যয়ের গুণগত মান এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবায়ন সক্ষমতার বিকাশই টেকসই উন্নয়নের মূল শর্ত।’
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হওয়ায় সামগ্রিক ভোগব্যয় কমেছে। এর প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবির ভাব দেখা দিয়েছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। চলতি মূলধন সংকটে উদ্যোক্তারা ব্যবসা পরিচালনার দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। উৎপাদন, বিক্রি, বিনিয়োগসহ সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস রফতানি খাত বর্তমানে চাপে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে দেশের মোট রফতানি আয় আগের বছরের তুলনায় দেড় শতাংশ কমে ৩৫ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এর মধ্যে প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাকের আয় প্রায় ২ শতাংশ কমে ৩২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
অন্যদিকে একই সময়ে আমদানি ৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৫৪ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির প্রবণতা কমেছে। এর প্রভাব উৎপাদন খাতেও পড়েছে; ফেব্রুয়ারিতে শিল্প উৎপাদন সূচক আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারের ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩০ দশমিক ৩৭ শতাংশে পৌঁছেছে এবং অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সরকার দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ১ লাখ ৪৪ হাজার ১০৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।
দেশের পুঁজিবাজার পরিস্থিতি এখনো নাজুক। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে শিল্প খাতে নতুন অর্থায়ন আসছে না। তাছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো বর্তমানে খুব বেশি নতুন বিনিয়োগ কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণের দিকে যাচ্ছে না। বরং বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকটে আয় ও মুনাফা কমে যাওয়ায় চাপে পড়েছে অনেক কোম্পানি।
ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে সার্বিক কর্মসংস্থানেও। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেশকিছু শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। এসব কারখানার বেশির ভাগই এখনো উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। কারখানাগুলোয় শ্রমিক ছাঁটাই অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি ঈদুল আজহার ছুটি শেষে কারখানা খোলার পর পরই সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা সামনে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ছাঁটাই হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান থাকা আল-মুসলিম গ্রুপে। গ্রুপটির তিনটি কারখানা থেকে মোট ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। শুধু আল-মুসলিম গ্রুপ নয়, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ছয়টি শিল্প এলাকার ৭৯টি কারখানায় মোট ৭ হাজার ৭৮৪ শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। এসব কারখানার অধিকাংশই তৈরি পোশাক খাতের।
একদিকে শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতি কম থাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কম। এ বছরে মার্চে বাংলাদেশ সফর শেষে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট এক বিবৃতিতে জানান, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করেছে; কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের। অর্থাৎ কর্মক্ষম তরুণদের প্রায় অর্ধেকই চাকরি পায়নি।
স্থানীয় প্রভাবকের পাশাপাশি বৈশ্বিক বিভিন্ন পরিস্থিতিও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের ধাক্কা এরই মধ্যে অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। বৈশ্বিক এ অনিশ্চয়তার প্রভাবের জের অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন ধরে বহন করতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী দিনগুলোতে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সরকারের উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। চলতি অর্থবছরেও সরকারের রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) রাজস্ব আহরণ হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকায়। ফলে টানা দশম বছরের মতো রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও সরকারি ব্যয় দিন দিন বাড়ছে। অর্থ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সরকারের মোট ব্যয় হয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ লাখ ৪২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে পরিচালন খাতে, যা মোট ব্যয়কৃত অর্থের প্রায় ৮৪ শতাংশ। বিপরীতে উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ৫৭ হাজার ৫৪ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২৩ শতাংশ। প্রথম নয় মাসে পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করেছে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধ। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধেই প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ অবস্থায় বাজেট বাস্তবায়নে আরো বেশি ঋণ নিলে সামনে সরকারের সুদ ব্যয় আরো বেড়ে যাবে। ফলে ইচ্ছা থাকলেও কল্যাণমুখী খাতে সরকারের অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা সীমিতই থাকবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার—বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষায় জোর দেয়া এবং রাজস্ব বৃদ্ধির পরিকল্পনা—তাত্ত্বিকভাবে যথাযথ। তবে এসব লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করবে সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর। বাজেটে কর সংস্কার ও রাজস্ব আহরণের নতুন উদ্যোগ থাকলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঝুঁকি, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।’
এ অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, ‘অতীতে রাজস্ব আয় কম হলে ব্যয়ও কমিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক ধরনের নিম্ন পর্যায়ের ভারসাম্য বজায় রাখা হতো। কিন্তু এবার চলমান উন্নয়ন প্রকল্প, উচ্চ পরিচালন ব্যয়, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার কারণে সরকারের ব্যয় কমানোর সুযোগ সীমিত। ফলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে বড় ধরনের বাজেট ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এ ঘাটতি মেটাতে অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়াতে পারে। তাই এবারের বাজেটে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।’
অবশ্য সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, তারা আসন্ন বাজেটে অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি একটি ‘কল্যাণরাষ্ট্রের ভিত্তি’ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছেন। এতে শিল্পায়ন, কর সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা ও রাজস্ব বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সম্প্রতি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একদিকে পূর্ববর্তী ঋণের দায় পরিশোধ করতে হবে, অন্যদিকে অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। আর বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য অর্থনীতির সম্প্রসারণ জরুরি। এজন্য একটি কার্যকর বাজেট থাকতে হবে। রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য আমাদের তিনটি কৌশল আছে। অর্থনীতির আকার বাড়াতে পারলে রাজস্ব আয় বাড়ানো যাবে। তাছাড়া কর্মসংস্থানও বাড়বে। আরেকটা হলো কর ফাঁকি ও কর পরিহারের প্রবণতা কমিয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানো হবে। ঋণ ব্যবস্থাপনায়ও কৌশলগত কিছু পরিবর্তন আনা হবে। অর্থনীতির আকার বাড়লে জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত কমে আসবে। এর ইতিবাচক প্রভাব আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিংয়েও পড়বে।’
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সরকারের বাজেট পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আসন্ন বাজেটে আমরা পরিচালন ব্যয়ের অংশ কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে চাই। এগুলোও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়াবে। আসন্ন বাজেটে কল্যাণরাষ্ট্রের ভিত্তি, জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামো, ‘স্কিল বাংলাদেশ’ কর্মসূচি, শিল্পায়ন, কৃষি সংস্কার, সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন উদ্যোগের প্রতিফলন দেখা যাবে।’
২০২৬-২৭ অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটে জিডিপির ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্য ধরা হয়েছে বলে জানা গেছে। মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও সেটি অর্জন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে একটি নতুন ঋণ কর্মসূচি শুরু করার বিষয়ে সরকার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সামনে নতুন কর্মসূচি শুরু হলে এর অধীনে সরকারকে নানা ধরনের শর্ত ও সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে, যা অনেক ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক নীতির স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রিত রাখবে। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক সংকটের এ সময়ে সম্প্রসারণমূলক মধ্য-বামপন্থী ধারণার বাজেট বাস্তবায়ন করা সরকারের পক্ষে কতটা সম্ভব হবে, সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
বিদ্যমান চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেয়ার পর এত কম সময়ের মধ্যে বাজেট প্রণয়নের কাজ বেশ কঠিন বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরাও। তাছাড়া দেশের অর্থনীতির অবস্থা এমন পর্যায়ে নেমে গেছে যে তা পুনরুদ্ধারে বড় আকারের বিনিয়োগ ও সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। সম্প্রতি ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত বাজেট-সংক্রান্ত এক সেমিনারে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে আগে নিচে নেমে যাওয়া স্তরকে ওপরে তুলতে হবে। নতুন সরকারের দায়িত্ব নেয়ার মাত্র এক-দেড় মাসের মধ্যে বাজেট প্রণয়ন করা অত্যন্ত কঠিন। সাধারণত বাজেট প্রস্তুতিতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগে। তার ওপর পূর্ববর্তী সরকারের কাছ থেকে একটি ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়ায় চ্যালেঞ্জ আরো বেড়েছে। তারপরও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকার ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি কার্যকর বাজেট দেয়ার চেষ্টা করছে। এ বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো দুর্নীতিমুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে উন্নয়নের সুফল দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছাবে।’