যশোরের বেড়েই চলেছে খুনের ঘটনা। ফলে একের পর এক নিরীহ মানুষ খুন হচ্ছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় যশোরের স্বামীর হাতে স্ত্রী এবং নাতনিকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া মা-সন্তান্তের ঝুলান্ত লাশ উদ্ধার ও এক বৃদ্ধার রহস্যেজনক মৃত্যু হয়েছে।
গত ৪৮ ঘণ্টায় (সোমবার ও মঙ্গলবার) যশোরের ৫ লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। হত্যা সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩জনকে আটক করেছে পুলিশ। শুধু হত্যার নয়; চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে হর-হামেশা। দ্রুত পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ পদক্ষেপ দাবি করেছে সাধারণ মানুষ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (৯জুন) ঝিকরগাছা থেকে মা ও শিশুসন্তানের ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। উপজেলার নাভারন ইউনিয়নের শরীফপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। মৃতরা হলেন, ওই গ্রামের জনি মিয়ার স্ত্রী রেবেকা খাতুন (২৬) ও তাদের দেড়বছর বয়সী শিশুসন্তান সোহরাব হোসেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সন্তানকে হত্যা করে রেবেকা খাতুন নিজেও গলায় দড়ি দিয়েছেন। তবে রেবেকার স্বজনদের দাবি, মা ও ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় রেবেকার স্বামী জনি মিয়াকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায় , মঙ্গলবার সকালে ঘরে রেবেকা ও শিশু সোহরাবের মৃতদেহ ঝুলতে দেখে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করে। একইসাথে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রেবেকার স্বামী জনি মিয়াকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
প্রতিবেশীরা জানায়, শ্বশুরবাড়ির জমি নিয়ে ভাই বোনের মধ্যে বিরোধ ও মাদকাসক্ত স্বামীর অত্যাচার-নির্যাতন সইতে না পেরে রেবেকা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে আত্মহত্যার আগে তার শিশুসন্তানকে হত্যা করেছে। ঘটনার সময় তাদের বড় মেয়ে জুঁই খাতুন (১০) স্কুলে ছিল।
এদিকে, রেবেকার মৃত্যুর খবর পেয়ে তার পিতার বাড়ি শার্শা উপজেলার দুর্গাপুর গ্রাম থেকে স্বজনেরা ছুটে আসেন। নিহতের বোন শাফিহা খাতুন, ভাবি সাবিহা বেগম ও খালাতো ভাই রবিউল ইসলামের দাবি, রেবেকাকে তার স্বামী হত্যা করেছে। জনি মিয়া ভবঘুরে বেকার ও ইয়াবাসক্ত। সে বিভিন্ন সময়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে স্ত্রীর প্রাপ্য দেড় বিঘা জমি বিক্রির ৩০ লাখ টাকা নষ্ট করেছে। আরো জমি বিক্রি করে টাকা দিতে স্ত্রীর উপর অব্যাহতভাবে চাপ সৃষ্টি করছিল। টাকা না পেয়ে তাকে হত্যা করে মৃতদেহ ঝুলিয়ে রাখতে পারে।
তবে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম কিবরিয়া জানিয়েছেন, ঝিকরগাছা থানার পুলিশ লাশ উদ্ধার ও জনি মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে। এটি হত্যা না আত্মহত্যা তা লাশের ময়না তদন্ত রিপোর্ট এবং তদন্তের পর জানা যাবে। পুলিশ প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে কাজ শুরু করেছে।
এদিকে, সোমবার (৮জুন) রাতে মণিরামপুরে নাতনীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় বখাটেরা নানাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। এদিন রাত ১০টার দিকে মণিরামপুর উপজেলার স্মরণপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। নিহত নানা ইনামুল হোসেন (৫০) পার্শ্ববর্তী ঝিকরগাছা উপজেলার ছারাসাতপুর গ্রামের মৃত রহিম সরদারের ছেলে। পুলিশ নিহত ইনামুল হোসেন মরদেহ উদ্ধারের পর যশোর আড়াইশ’ শয্যা হাসপাতালের মর্গে ময়না তদন্তর সম্পন্ন হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী রেশমা খাতুন বাদী হয়ে এগারো জনের নামে মণিরামপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে আবু হুসাইন নামের একজনকে আটক করেছে পুলিশ।
স্থানীয়রা ও নিহতের ভাতিজা সাদ্দাম হোসেন জানায়, ‘নিহত ইনামুল হোসেনের নাতনী (বোনের মেয়ের মেয়ে) ঝিকরগাছা উপজেলার একটি বালিকা বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণিতে পড়ে। বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার পথে প্রায়ই ছারাসাত গ্রামের রাব্বি, রাকিব, হুমায়ন, সাকিব, সিয়াম, মেহেদি, চঞ্চল, মিটু, ইউনুস, আরিফ ও রবিউল নামের বখাটেরা উত্ত্যক্ত করতো।’
শনিবার সাদ্দাম হোসেন ও নিহত ইনামুল হোসেন তার নাতনীকে উত্ত্যক্ত করার জন্য ওই বখাটেদের বকাঝকা করেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ করতে নিষেধ করলে এতে ক্ষিপ্ত হয় তারা। ঝিকরগাছা উপজেলার ছারাসাত গ্রামটি মণিরামপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী হওয়ায় ওই গ্রামের লোকজন মণিরামপুর উপজেলার স্মরণপুর বাজারে প্রয়োজনীয় কাজ সারেন। ঘটনার দিন স্মরণপুর বাজার হতে চা পান শেষে বাড়ি ফেরার পথে আগে থেকেই ওত পেতে থাকা হামলাকারিরা ইনামুল হোসেনের উপর অতর্কিত ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাকে মারধরের এক পর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলাপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে ফেলে রাখে। স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথ্যে ইনামুল হোসেন মারা যান।
মণিরামপুর থানার ওসি আবু সাঈদ জানায়, ‘হামলা ও হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের সবার বাড়ি ঝিকরগাছা উপজেলার ছারাসাত গ্রামে। কিন্তু হত্যাকান্ডটি মণিরামপুর উপজেলায় ঘটেছে। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। এ ঘটনায় একজন আটক।’
অন্যদিকে, বিয়ের ছয়মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই স্বামীর হাতে প্রাণ দিতে হলো নববধূ সামিনা আক্তার শাম্মীকে (২০)। গত সোমবার সকালে যশোর সদর উপজেলার শেখহাটি তামালতলা এলাকায় তাকে গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে। অভিযুক্ত স্বামী সুজন স্ত্রীকে হত্যার নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছে। মাদক সেবনের টাকা নিয়ে বাক-বিতন্ডার জেরে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী সুজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
নিহত স্ত্রী নিহত সামিনা আক্তার শাম্মী (২০) নওয়াপাড়া ইউনিয়নের তরফ নওয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। আত্মহত্যার চেষ্টা করা স্বামী সুজন টাঙ্গাইল জেলার বাসিন্দা। প্রায় ছয় মাস আগে ভালবেসে বিয়ে করে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তারা যশোর শহরের শেখহাটি তামালতলা এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। জানা গেছে, সামিনা ও সুজন সম্পর্কে মামাতো-ফুপাতো ভাই-বোন। স্বামী সুজন বর্তমানে যশোর জেনারেল হাসপাতালের পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ‘সোমবার সকালের দিকে বাসায় অবস্থানকালে মাদক সেবনের টাকা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে সুজন ক্ষিপ্ত হয়ে স্ত্রী সামিনা আক্তারকে ধারালো ছুরি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেন। এতে তিনি গুরুতর রক্তাক্ত জখম হন।’
ঘটনার পর সুজন নিজ শরীরেও ছুরি দিয়ে একাধিক আঘাত করে গুরুতর আহত হন। এ সময় আশেপাশের লোকজন তাদের দ্রুত উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সামিনাকে মৃত ঘোষণা করেন। আর স্বামী সুজন পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহত সামিনার মামা পিয়াস জানায়, ‘সুজন আগে বিদেশে কর্মরত ছিলেন। প্রায় ছয় মাস আগে ভালোবেসে তারা বিয়ে করেন এবং পরে আলাদা ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে সুজন বেকার ছিলেন এবং পুনরায় বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর মধ্যেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।’
যশোর কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল বলেন, ‘ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তারা আত্মীয়তার সম্পর্কের মধ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আলাদাভাবে বসবাস করতেন। পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এঘটনায় নিহতের স্বামী আটক রয়েছেন।’
অপরদিকে, সোমবার মাঠ থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধারের পর হামিদ বিশ্বাস (৬৫) নামে এক ব্যক্তির চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে। এদিন দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে যশোর জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে তিনি মারা যান। চিকিৎসকের ধারণা অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে হার্ট অ্যাটাকজনিত কারণে মারা গেছেন হামিদ বিশ্বাস। তিনি পাঁচবাড়িয়া গ্রামের আকবার বিশ্বাসের ছেলে।
হাসপাতাল ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ‘সোমবার রাত ৯টার দিকে পাঁচবাড়িয়া স্কুল মাঠে হামিদ বিশ্বাসকে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন শুকুর নামের এক ভ্যানচালক। পরবর্তীতে তিনি হামিদকে উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ১২টার দিকে তার মৃত্যু হয়।’
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার আহসান কবির বাপ্পি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে হার্ট অ্যাটাকজনিত কারণে তার মৃত্যু হতে পারে। মৃত্যুর কারণ সন্দেহজনক হওয়ায় লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করা হয়। পরে ময়না তদন্তের শেষে লাশ পরিবারে কাছে হস্তান্ত করা হয়।’
যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল বলেন, ‘ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’
স্থানীয়রা এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে খুন মুড়ি মুড়কির মত ঘটছে। কিন্তু আইনশৃংখলা বাহিনীর বিশেষ কোন পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। পুলিশ আগের মতই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কেন কী কারণে এসব খুন ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে সে বিষয়ে তাদের নেই কোন বাড়তি নজরদারি। এচাড়াও তারা ক্রাইম স্পটগুলোতে পুলিশি টহল বাড়ানোসহ গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন।