Image description

রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক থেকে শুরু করে সরু গলি— চোখে পড়বে হাসপাতাল, ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাইনবোর্ড। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকই গড়ে উঠেছে এমন সব ভবনে, যেগুলো গড়ে ওঠেনি হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য। কোথাও আবাসিক ভবনের কয়েকটি তলা ভাড়া নিয়ে চলছে চিকিৎসাসেবা, কোথাও আবার একের পর এক বাড়ি কিনে জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশাল হাসপাতাল। জাতীয় বিল্ডিং কোডের (বিএনবিসি) শর্ত উপেক্ষা করেই চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। ফলে চিকিৎসা নিতে এসে অজান্তেই বড় ধরনের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়ছেন রোগীরা।

সম্প্রতি রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে। তদন্তে উঠে এসেছে অনিয়মতান্ত্রিক ওয়ার্ড স্থাপন, বায়ু চলাচলের সংকট এবং অনুমোদনহীন স্থাপনার মতো উদ্বেগজনক তথ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসিক ভবনকে হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা শুধু বিল্ডিং কোড লঙ্ঘনই নয়, বাড়াচ্ছে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকিও।

গত ২৮ মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে পরপর ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি জন্ম দেয় দেশ জুড়ে আলোচনা-সমালোচনার। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে হাসপাতালটির বেশ কিছু গুরুতর অনিয়ম।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরনো ভবনে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে স্থাপন করা হয়েছিল পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড। সেখানে কার্যকর ছিল না বায়ু চলাচলের কোনো ব্যবস্থা। বন্ধ রাখা হয়েছিল সেন্ট্রাল এসিও। এমনকি হাসপাতালের ভেতরে অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল একটি বেকারি।

ঘটনার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন স্পষ্ট ভাষায় জানালেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ভবনটি চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। হাসপাতাল পরিচালনার মৌলিক শর্তগুলো নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

কাগজে আছে নিয়ম, বাস্তবে নেই প্রয়োগ

জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুযায়ী, একটি হাসপাতালের প্রধান করিডরের প্রস্থ কমপক্ষে ২ দশমিক ৪ মিটার (প্রায় ৮ ফুট) হওয়া বাধ্যতামূলক। স্ট্রেচার চলাচল কম, এমন স্থানেও ন্যূনতম প্রস্থ হতে হবে ১ দশমিক ৮ মিটার (প্রায় ৬ ফুট)। পাশাপাশি পর্যাপ্ত লিফট, জরুরি নির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং বায়ু চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করার রয়েছে নির্দেশনা।

তবে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিক ঘুরে দেখা গেছে, এসব শর্তের অনেকই উপেক্ষিত। অনেক জায়গাতেই সরু সিঁড়ি, অপর্যাপ্ত করিডর, আলো-বাতাসহীন ওয়ার্ড এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চিকিৎসাসেবাই পরিণত হয়েছে স্বাভাবিক চিত্রে।

মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার (জনসন রোড)

পুরান ঢাকার জনসন রোডের একটি ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলা ভাড়া নিয়ে চলছে মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম। ভবনটির নিচতলায় রয়েছে হার্ডওয়্যারের দোকান। রোগীদের ওপরে উঠতে হয় সরু সিঁড়ি বেয়ে। নেই কোনো লিফট।

সরেজমিনে দেখা যায়, হুইলচেয়ারে আসা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ওপরে উঠতে হচ্ছে স্বজনদের কাঁধে ভর করে সিঁড়ি বেয়ে। অনেক ক্ষেত্রে স্ট্রেচারে রোগী বহন করাও হয়ে পড়ে প্রায় অসম্ভব।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। যেহেতু এটি আমাদের নিজস্ব ভবন না, তাই আমরা চাইলেই পরিকাঠামো পরিবর্তন করতে পারছি না। তবে আমরা বাড়ির মালিককে লিফট স্থাপনের জন্য অনুরোধ জানিয়েছি।’

ঢাকা সিটি ক্লিনিক

মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ঠিক ওপরের তলায় অবস্থিত ঢাকা সিটি ক্লিনিক। চারপাশের ঘিঞ্জি ভবনের কারণে এখানে প্রবেশের সুযোগ নেই পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের। এর ওপর ক্লিনিকের ওপরের তলায় পরিচালিত হচ্ছে একটি বাণিজ্যিক ট্রান্সপোর্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম।

ফলে একই সরু সিঁড়ি ব্যবহার করছেন রোগী, স্বজন ও ট্রান্সপোর্টের কর্মীরা। রোগীরা যখন ওঠানামা করছেন, তখন একই পথে পরিবহন করা হচ্ছে ভারী যন্ত্রপাতি ও লোহার পাইপ।

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আটকে পড়লেন রোগী রশিদ আনজুম। ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছিলেন, ‘আমি সিঁড়ি দিয়ে নামছিলাম, দ্বিতীয়তলায় আসতেই দেখি এক ব্যক্তি কাঁধে বড় লোহার পাইপ নিয়ে উঠছে। পুরো সিঁড়ি আটকে যাওয়ায় আমি ভয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকি। একটি হাসপাতালের সিঁড়িতে এমন পরিবেশ, তা ভাবাই যায় না।’

বিল্ডিং কোড অনুসরণের বিষয়ে জানতে চাইলে ক্লিনিকের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) ডা. ইমদাদুল হক বললেন, ‘আমরা ২০১০ সাল থেকে কম খরচে মানুষের সেবা দিচ্ছি। সরকারের সব অনুমোদন আমাদের আছে। তবে সব শর্ত মানতে গেলে দেশে কয়টি হাসপাতাল চলতে পারবে?’

‘আমরা তো জোর করে রোগী আনছি না। আমাদের পরিচিত এবং পুরনো আস্থাশীল রোগীরাই এখানে আসছেন’— রোগীর নিরাপত্তা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যোগ করলেন তিনি।

মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসেস (ইংলিশ রোড)

রাজধানীর ইংলিশ রোডে মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসেসেও দেখা গেছে একই চিত্র। ভবনের প্রবেশপথ এতটাই সংকীর্ণ যে, গলির দু’পাশের হার্ডওয়্যারের দোকানের ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢোকাই দায়। নেই কোনো লিফট বা র‍্যাম্প। সিঁড়ির প্রস্থও প্রয়োজনীয় মানের তুলনায় কম।

প্রতিষ্ঠানটির ইনচার্জ তামান্না তাবাসসুম মেনে নিলেন এ অব্যবস্থাপনার দায়। জানালেন, এই ভবনটি আধুনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের জন্য আদর্শ নয়। তবে প্রায় ২৩ বছর আগে যখন এটি চালু হয়েছিল, তখনকার বাস্তবতায় এটি ছিল উন্নত।

আপাতত হাঁটতে অক্ষম রোগীদের স্টাফরা হুইলচেয়ারে করে সিঁড়ি দিয়ে বহন করে ওপরে নিয়ে যান। বর্তমানে লিফট স্থাপনের বিষয়ে মালিকপক্ষকে বলা হয়েছে— উল্লেখ করলেন তিনি।

আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ধানমন্ডি):

শুধু ছোট ক্লিনিক নয়, রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোর মধ্যেও দেখা যাচ্ছে আবাসিক ভবন যুক্ত করে সম্প্রসারণের প্রবণতা।

ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করেছিল একটি সাততলা ভবন নিয়ে। পরে হাসপাতালটির পরিধি বাড়াতে আশপাশের প্রায় ১০টি আবাসিক ভবন কিনে মূল ভবনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবাসিক ভবনের নকশা উপযোগী নয় হাসপাতালের জন্য। এ ধরনের সম্প্রসারণের কারণে অনেক ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ও বায়ু চলাচলে সৃষ্টি হয়েছে সংকট।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, হাসপাতাল এবং আবাসিক ভবনের নকশাগত চাহিদা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

একটি হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইনের নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, প্রশস্ত করিডর, জরুরি নির্গমন পথ, বিশেষায়িত লিফট, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। এসব বিষয় বিবেচনায় না এনে আবাসিক ভবনকে হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা হলে যেকোনো দুর্ঘটনা নিতে পারে ভয়াবহ রূপ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতাল নির্মাণ ও পরিচালনার অনুমোদন দেওয়ার আগে প্রয়োজন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, রাজউক এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর আরও কঠোর নজরদারি। অন্যথায় চিকিৎসাসেবার নামে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে রোগীদের জীবন নিয়ে চলতে থাকবে এক নীরব জুয়া।