Image description

২০০৫ সালের ঘটনা। যৌতুক চেয়ে না পেয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল সামিনা (১৬) নামের কিশোরীকে। তাঁর বাল্যবিবাহ হয়েছিল।

সামিনা হত্যা মামলার ১৩ বছর পর ২০১৮ সালে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৯ তাঁর (সামিনা) স্বামী জাফরসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এর মধ্যে জাফর, জাফরের বোন রোকেয়া এবং রোকেয়ার স্বামী আবদুর রহিম কারাগারে রয়েছেন। আট বছর পেরিয়েছে, মামলার রায় অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড এখনো কার্যকর হয়নি।

সামিনার মা নাজমা বেগম (৬০) সাভারের কাউনিয়া গ্রামে থাকেন। গতকাল মঙ্গলবার আক্ষেপ করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত দিনেও ফাঁসি হইল না।’ তিনি বলেন, সাভার থেকে মিরপুর ১০ নম্বরে এসে তিনি ফুটপাতে চুড়ি বিক্রি করেন। মাস দুয়েক আগে কয়েকজন এসে তাঁকে মারধর করেছেন। মারধরকারীরা আসামিদের স্বজন।

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২৭৩ বন্দী। ফাঁসির আসামিদের কনডেমড সেলে রাখা হয়।

স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার কারণে ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ধর্ষণের পর হত্যার কারণে। ধর্ষণের পর হত্যার দায়ে সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারি একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, সব মামলা মিলিয়ে দেশের ৭৪টি কারাগারে ২ হাজার ৭০৭ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দী রয়েছেন। সব মিলিয়ে বন্দীর সংখ্যা ৭৪ হাজার (৯ জুন পর্যন্ত হিসাব)। যদিও বন্দী ধারণক্ষমতা ৪৬ হাজার।

ফৌজদারি কোনো মামলায় আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে, যা ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মামলা হিসেবে পরিচিত। মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য বিচারিক আদালতের রায় ও নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠাতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দণ্ডিত আসামি রায়ের বিরুদ্ধে জেল আপিল ও আপিল করতে পারেন। এ ছাড়া আসামির বিবিধ আবেদনও করার সুযোগ রয়েছে।

সাধারণত ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের জেল আপিল, আপিল ও বিবিধ আবেদনের ওপর একসঙ্গে শুনানি হয়। তবে শুনানির পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত) প্রস্তুত করতে হয়। এতে মামলার এজাহার, অভিযোগ গঠন, সাক্ষীদের বক্তব্য, বিচারিক আদালতের রায়সহ বৃত্তান্ত সন্নিবেশিত থাকে।

দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই ডেথ রেফারেন্স শুনানিতে দেরি হয়। নিষ্পত্তি হতে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সময় লাগে। এ সময় বন্দীরা কারাগারে থাকেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় উচ্চ আদালত থেকে আসামি খালাসও পেয়ে যান।

সামিনাকে পুড়িয়ে হত্যা করার মামলাটি পরিচালনা করেছে বেসরকারি সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংগঠনের লিগ্যাল এইড অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি বিভাগের পরিচালক দীপ্তি সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, মামলাটি উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। রায় পেতে ১৩ বছর লেগেছে। ৮ বছর ধরেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। তিনি বলেন, বিচারিক এই দীর্ঘসূত্রতা সমাজকে ন্যায়বিচার দ্রুত নিশ্চিত করার বার্তা দেয় না। মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। অনেক সময় বেঁচে থাকা ভুক্তভোগী বা ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা আসামিপক্ষের হুমকির মুখে দিন কাটান।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা কারা কর্তৃপক্ষের কোনো নির্দেশনা শুনতে চান না, বেপরোয়া আচরণ করেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন, কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস)

দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা

ডেথ রেফারেন্সের শুনানির দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা ও কেটে টুকরা টুকরা করার ঘটনার পর। এটি দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে।

হত্যার ঘটনার ১৯ দিনের মধ্যে এই মামলায় রায় হয় ৭ জুন। ঢাকা মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক রায়ে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে আসামি সোহেল রানা এবং ধর্ষণ ও হত্যায় সহযোগিতা করার জন্য তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। ডেথ রেফারেন্সের জন্য বিচারিক আদালতের রায়সহ মামলার যাবতীয় নথিপত্র গতকাল দুপুরে হাইকোর্টে গেছে।

আরেকটি আলোচিত ঘটনা ঘটে গত বছরের ৫ মার্চ। বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার শিকার হয় মাগুরার একটি শিশু। সংকটাপন্ন অবস্থায় শিশুটিকে ঢাকায় আনা হয়। ওই বছরের ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়।

নিম্ন আদালত কোনো মামলায় রায় দিলেও আপিল শুনানিতে বিলম্ব ঘটার কারণে সে রায় কার্যকরে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। এটা নিয়ে তিনি (গত রোববার) উন্মুক্ত আদালতে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিতে আনেন। তখন প্রধান বিচারপতি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা (ডেথ রেফারেন্স ও আপিল) শুনতে সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ গঠনের কথা বলেছেন।
মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অ্যাটর্নি জেনারেল

শিশুটির মৃত্যুর দুই মাস পর গত বছরের ১৭ মে রায় দেন মাগুরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে শিশুটির বোনের শ্বশুর হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া বাকি তিন আসামি শিশুটির বোনের স্বামী, শাশুড়ি ও ভাশুরকে খালাস দেওয়া হয়।

মামলাটি এখন আপিল বিভাগে ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৫ জুন হাইকোর্টে আপিল করেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হিটু শেখ।

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, সব মামলা মিলিয়ে দেশের ৭৪টি কারাগারে ২ হাজার ৭০৭ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দী রয়েছেন। সব মিলিয়ে বন্দীর সংখ্যা ৭৪ হাজার (৯ জুন পর্যন্ত হিসাব)। যদিও বন্দী ধারণক্ষমতা ৪৬ হাজার।

কারা অধিদপ্তর বলছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সামলানো কঠিন। কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা কারা কর্তৃপক্ষের কোনো নির্দেশনা শুনতে চান না, বেপরোয়া আচরণ করেন। তিনি বলেন, কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার অধিক বন্দী রয়েছে। বিচারাধীন মামলা দ্রুত শেষ হলে বন্দীর সংখ্যা কমে আসবে।

আইন ১৯৮৩ সালে

স্বাধীনতার পর দেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় সাধারণ আইনে বিচার হতো। এ ধরনের অপরাধ দমনে প্রথম বিশেষ আইন হয় ১৯৮৩ সালে, অধ্যাদেশ হিসেবে। ১৯৯৫ সালে এসেছিল নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইন। এখন রয়েছে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, যেটি ২০০৩, ২০২০ ও সর্বশেষ ২০২৫ সালে সংশোধন হয়েছে।

এখন আইনটির নাম হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০২৬। এ আইনের কয়েকটি ধারায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

২০২০ সালে সিলেট ও নোয়াখালীতে দলবদ্ধ ধর্ষণের দুটি ঘটনায় দেশজুড়ে বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করে। পাশাপাশি ধর্ষণের মামলার আসামি শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়।

মাগুরার শিশুধর্ষণ ও হত্যা ঘটনার পর ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ধর্ষণের ধারায় উল্লেখযোগ্য কিছু সংশোধন আনে। আইনে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণকে ধর্ষণের ধারায় (৯)–এ রাখা হলেও ভিন্ন উপধারায় (৯ খ) ভিন্ন শিরোনামে (বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম করিবার দণ্ড) নেওয়া হয়েছে। এ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।

এ ছাড়া ভুক্তভোগী ও আসামির ডিএনএ পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে বলা হয়েছে, আদালত যদি মনে করে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া মেডিক্যাল সনদ দিয়ে বিচারকাজ পরিচালনা করা যাবে, তাহলে ডিএনএ পরীক্ষা লাগবে না।

ধর্ষণের (৯ খ বাদে) ঘটনার তদন্ত ও বিচারের সময় অর্ধেক করা হয়েছে। তদন্ত হবে ১৫ দিনে ও বিচার হবে ৯০ দিনে। তবে বিচারক মনে করলে সময় বাড়াতে পারবেন।

বিচারিক আদালতে ফাঁসির রায়ের পর উচ্চ আদালতে যাতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি না হয়, তা নিশ্চিতে উদ্যোগী হয়েছে নতুন সরকার।

পল্লবীর শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের আলোচিত মামলার রায়ের পর এক ব্রিফিংয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, নিম্ন আদালত কোনো মামলায় রায় দিলেও আপিল শুনানিতে বিলম্ব ঘটার কারণে সে রায় কার্যকরে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। তিনি জানিয়েছেন, এটা নিয়ে তিনি (গত রোববার) উন্মুক্ত আদালতে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিতে আনেন। তখন প্রধান বিচারপতি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা (ডেথ রেফারেন্স ও আপিল) শুনতে সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ গঠনের কথা বলেছেন।

জামিন নিয়ে পলাতক

২০১২ সালের ১ জুন রাজধানীর হাতিরপুলের নাহার প্লাজায় ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় কিশোরী একটি মেয়ে (১৫)। তাকে হত্যার পর ২৬ টুকরা করে হাতেনাতে ধরা পড়েন আসামি সাইদুজ্জামান বাচ্চু।

ঘটনার ৫ বছর পর ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল চাঞ্চল্যকর এই মামলায় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ সাইদুজ্জামানের বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দেন। তবে সেই রায় স্বস্তিদায়ক হয়নি পরিবারটির জন্য। রায় ঘোষণার মাস ছয়েক আগেই জামিন পেয়ে পলাতক হয়ে যান আসামি।

কিশোরীটির মায়ের সঙ্গে ২০২৩ সালের নভেম্বরে কথা হয়েছিল এই প্রতিবেদকের (গত দুদিনে যোগাযোগের চেষ্টা হয়েছিল, পাওয়া যায়নি)। তিনি আক্ষেপ করে তখন বলেছিলেন, গরিব বিচার পায় না।