Image description

সাকলায়েন রিজভী

শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউ (সাবেক বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ)। এখানেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই সম্পত্তির আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। কিন্তু ভবনটির মূল ফটক এখন আধভাঙা এবং বন্ধ। গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে ধরনের জনরোষ ও সহিংসতা দেখা গেছে, তা ঠেকাতে এবং দলীয় কর্মীদের জমায়েত আটকাতে সেখানে কিছু পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়, সুনসান নীরবতার মাঝে হকারদের কয়েকটি ভ্যান পড়ে আছে। চারপাশের দেয়ালে কালি আর ছাইয়ের দাগ। জায়গাটি ভাঙাচোরা, অপরিষ্কার। বাতাসে ভাসছে মূত্রের উৎকট গন্ধ। এখন আর সেখানে এসি চলে না, বাতি জ্বলে না। কোনো বড় নেতা আসেন না, সেখান থেকে কেউ বেরও হন না। পাঞ্জাবির ওপর মুজিব কোট পরে দলীয় কর্মীদের আড্ডা দিতেও দেখা যায় না। অথচ দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই পোশাকটি পরিধানে ছিল রীতিমত প্রতিযোগিতা।

একই নীরবতা ধানমন্ডিতে অবস্থিত আওয়ামী লীগের কার্যালয়েও। ভবনের বিভিন্ন জায়গায় এখন নির্বিঘ্নে ঘাস গজাচ্ছে। শেখ হাসিনার ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে এটি দেশের অন্যতম রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্র ছিল। তার কোনো চিহ্নই আজ আর অবশিষ্ট নেই।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বাসভবনটিরও একই দশা। পুরোনো কাঠামোর সামান্য কিছু অংশই শুধু টিকে আছে। একসময় কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা এই বাড়িটিকে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা প্রায় পবিত্র স্থান মনে করত। আর আজ এটি পরিত্যক্ত ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

১৯৭৫ সালে এই বাড়ির যে সিঁড়িতে শেখ মুজিব এবং তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছিল, সেই সিঁড়িটিও এখন ভাঙা। সিঁড়িটির সাথে জড়িয়ে থাকা পুরোনো স্মৃতি ও চিহ্নগুলো ধ্বংসযজ্ঞের নিচে চাপা পড়েছে। (উল্লেখ্য, সে সময় শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় বেঁচে গিয়েছিলেন)।

দেয়ালগুলো এখন নানা স্লোগানে ভরা। কোথাও লেখা—‘ভারতপন্থা গুঁড়িয়ে দাও’, কোথাও লেখা—‘এই ভবন দেখে শিক্ষা নিন’। আবার ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যার বিচার চেয়ে লেখা হয়েছে, ‘গণহত্যার ক্ষমা নাই, সকল ঘাতকের ফাঁসি চাই।’ এসব কর্তৃত্ববাদী শাসনের পরিণতিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় এখনও মাঝে মাঝে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। কর্তৃপক্ষের ভয়, এখানে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা জড়ো হলে আবারও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

গত প্রায় দুই বছর ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয়গুলোর এটাই সাধারণ চিত্র। তাদের কোনো বড় সমাবেশ নেই, দৃশ্যমান রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই, রাস্তায় কোনো উপস্থিতিও নেই। দলটি কয়েকবার ধর্মঘটের ডাক দিলেও তার কোনো প্রভাব পড়েনি। কয়েক মাস পরপর হঠাৎ দু-একটি ঝটিকা মিছিল ছাড়া দলটি মূলত জনসমুখ থেকে হারিয়ে গেছে।

এমনকি সাম্প্রতিক নির্বাচনের সময়ও দলের নামে দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা ছিল না। কারণ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করেছিল। এছাড়া ২০২৫ সালের মে মাসে নির্বাচন কমিশন তাদের নিবন্ধনও স্থগিত করে। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় সমাবেশ, সভা, প্রচার-প্রচারণা, প্রকাশনা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত ছিল।

 

ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় এখনও মাঝে মাঝে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

 

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে। তারাও অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি। ফলে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে সংসদ একটি আইন পাস করে, যা অন্তর্বর্তী প্রশাসনের চালু করা এই নিষেধাজ্ঞাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। এর ফলে আনুষ্ঠানিক রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগের ছিটকে পড়া আরও পোক্ত হয়।

তাহলে এখন আওয়ামী লীগের অবস্থান ঠিক কোথায়? দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের কর্মীরা আসলে কী ভাবছেন? আর যে রাজনৈতিক শক্তি একসময় পুরো বাংলাদেশ দাপিয়ে বেড়াত, তাদের ভবিষ্যৎই বা কী?

পতনের পর: ১৯৭৫ ও ২০২৪ সালের তুলনা

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের পতন বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেকটি বড় রাজনৈতিক পালাবদলের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। সেটি হলো ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের পতন। প্রায় পাঁচ দশকের ব্যবধানে ঘটা এই দুটি ঘটনাই দেশের রাজনীতির চেহারা বদলে দিয়েছিল। তবে প্রজন্মের পরিক্রমায় জনস্মৃতি, রাজনৈতিক প্রতিরোধ এবং দল হিসেবে টিকে থাকার লড়াইয়ে এই দুই সময়ের মাঝে অনেক বড় পার্থক্যও রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তালুকদার মনিরুজ্জামান তাঁর একটি প্রবন্ধে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস থেকে প্রকাশিত ওই প্রবন্ধের নাম ছিল ‘বাংলাদেশ ইন ১৯৭৫: দ্য ফল অব দ্য মুজিব রেজিম অ্যান্ড ইটস আফটারম্যাথ’। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, শেখ মুজিবের সরকার ‘বাকশাল’ নামে একটি একদলীয় কাঠামোর মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিল। এর ফলে দল ও রাষ্ট্রের মধ্যকার পার্থক্য মুছে গিয়েছিল। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর বাকশাল বাতিল করা হয়, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়। বাংলাদেশ প্রবেশ করে এক অস্থির যুগে। ক্যু, পাল্টা-ক্যু, গ্রেপ্তার এবং আদর্শিক দ্বন্দ্ব নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

অধ্যাপক মনিরুজ্জামানের বর্ণনামতে, খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার শুরুতে মুজিবের ১৮ জন মন্ত্রীর মধ্যে ১০ জনকে এবং ৯ জন প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ৮ জনকে বহাল রেখেছিল। অর্থাৎ, পুরোনো প্রশাসনের একটা অংশকে সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে না দিয়ে নতুন কাঠামোয় যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু দ্রুতই চাপ বাড়তে থাকে। সামরিক আইনের অধীনে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন ৬ জন মন্ত্রী, ১০ জন সংসদ সদস্য, ৪ জন সরকারি আমলা, একজন শিক্ষাবিদ এবং ১২ জন ব্যবসায়ী।

কয়েক মাসের মধ্যেই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ওপর দমন-পীড়ন চরম আকার ধারণ করে। ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার শীর্ষ নেতা—তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম. মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই শেখ মুজিব ও তার পরিবারকে হত্যা করা হয়েছিল।

এতকিছুর পরও সে সময় মুজিবপন্থিরা একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাননি। মনিরুজ্জামান উল্লেখ করেছেন, সে সময় মস্কোপন্থি নেতা ও শিক্ষার্থীদের একটি বিশাল মিছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে মুজিবের বাসভবন পর্যন্ত গিয়েছিল ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি দিবস’ পালনের জন্য।

১৫ আগস্টের পরও মুজিবপন্থি নেটওয়ার্কগুলো নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সীমিত আকারে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছিল। ১৯৭৫ সালের শেষের দিকে তৎকালীন অন্যতম বৃহৎ শিল্প কারখানা আদমজী জুট মিলে মুজিবপন্থি শ্রমিক নেতারা অস্থিরতা তৈরি করেছিলেন। একই সময়ে পুরো ঢাকা শহরে ‘বঙ্গবন্ধুর খুনিদের শাস্তি চাই’ লেখা লিফলেট ছড়ানো হয়েছিল।

গণঅভ্যুত্থানের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এমন চিত্র একেবারেই অনুপস্থিত। নির্বাসিত বা আত্মগোপনে থাকা নেতাদের ডাকা দু-একটি ঝটিকা মিছিল, অনলাইনে কিছু প্রচার বা ধর্মঘটের ডাক দেখা গেছে শুধু। এছাড়া দলের পক্ষে বা নেতাদের সমর্থনে কোনো ধারাবাহিক গ্ণজমায়েত করতে আওয়ামী লীগ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

১৯৭৫ সালের পর আওয়ামী লীগ কিন্তু নির্বাচনী মাঠ থেকেও হারিয়ে যায়নি। ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে। কিন্তু আব্দুল মালেক উকিলের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ অংশটিও ৪০টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই ফলাফল প্রমাণ করে যে, দমন-পীড়ন, বিভাজন এবং শেখ মুজিবকে হারানোর মাত্র চার বছর পরও আওয়ামী লীগের একটি সাংগঠনিক ভিত্তি এবং নির্বাচনী প্রাসঙ্গিকতা টিকে ছিল।

ঠিক এই জায়গাতেই ২০২৪ সালের চিত্রটা একেবারেই আলাদা। ২০২৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নিতেই দেওয়া হয়নি।

হাসিনার পতনের পর আওয়ামী লীগের কার্যালয়, নেতাদের বাড়িঘর এবং দলের সাথে যুক্ত স্থানগুলো সরাসরি জনগণের ক্ষোভের নিশানায় পরিণত হয়। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর একসময় সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকা ছিল। সেটি বারবার হামলার শিকার হয়ে আজ ধ্বংসস্তূপ। বুলডোজার দিয়েও সেখানে ভাঙচুর চালানো হয়েছে।

দলের পতনে শোক প্রকাশ করে মিছিল তো দূরের কথা, আওয়ামী লীগের সমর্থকরা এখন জনসমক্ষে আসতেই ভয় পান। যারা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যাওয়ার বা ফুল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তারা ধাওয়া ও হামলার শিকার হয়েছেন। রাজপথে দলের উপস্থিতি শূন্যের কোঠায়।

আওয়ামী লীগের ওপর আইনি চাপও এখন অনেক গুণ বেশি। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে শুধু ঢাকাতেই ৭০৭টি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫ হাজারেরও বেশি। এসব মামলায় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচও জানিয়েছে যে, অভ্যুত্থানের পর হাজার হাজার সন্দেহভাজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আটক করা হয়েছে। একইসঙ্গে, আন্দোলন চলাকালে হত্যার বিচারের রায় না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

১৯৭৫ এবং বর্তমান সময়ের মধ্যে আরেকটি লক্ষণীয় মিল হলো ভারত-বিরোধী মনোভাব।

অধ্যাপক মনিরুজ্জামান দেখেছেন, ৭৫-এর অভ্যুত্থানের পর ভারত-বিরোধী আবেগ তীব্রভাবে দৃশ্যমান হয়েছিল। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং সেনাবাহিনীর একাংশের মধ্যে এই মনোভাব প্রবল ছিল, যারা মনে করত মুজিব সরকার দিল্লি ও মস্কোর প্রতি মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল। বর্তমান বাংলাদেশেও হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারত-বিরোধী বক্তব্য ফের জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী দলগুলো দিল্লির সাথে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের তীব্র সমালোচনা করছে।

তবে এই দুই সময়ের মধ্যে কিছু বড় পার্থক্যও আছে।

মুজিব সরকারের পতন ঘটেছিল একটি রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। এই অভ্যুত্থান মুহূর্তেই রাষ্ট্র কাঠামো বদলে দেয়। কিন্তু ২০২৪ সালের পতন এসেছে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সাধারণ মানুষের আন্দোলন, তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব এবং কর্তৃত্ববাদী শাসন ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ক্ষোভের মধ্য দিয়ে। রাস্তায় কোনো ট্যাংক নামেনি। সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল অ্যাক্টিভিজমের মাধ্যমে গড়ে ওঠা বিশাল গণবিক্ষোভই পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অচল করে দিয়েছিল।

স্মৃতি ধরে রাখার ধরনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক বয়ান মূলত খবরের কাগজ, রেডিও এবং এলিট রাজনৈতিক মহলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আজ, পুলিশি ক্র্যাকডাউন, আন্দোলনে মৃত্যু আর রাজনৈতিক সহিংসতার ভিডিওগুলো অভ্যুত্থান শেষ হওয়ার অনেক পরেও অনলাইনে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর ফলে দলটির পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি এমন মত প্রকাশ করেছেন যে, ১৯৭৫ এবং বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো আওয়ামী লীগের জন্য উন্মুক্ত রাজনৈতিক পরিসর।

তিনি বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর দলটি দুর্বল ও খণ্ডিত হয়ে পড়েছিল। অনেক নেতা আত্মগোপনে বা ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু দলটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি। সময়ের সাথে সাথে তারা গুছিয়ে উঠে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে আসে। অন্যদিকে, আজকের আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত। তাদের নির্বাচনী প্রতীক কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আর অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার অধিকারের পক্ষে কথা বলার চরম অনীহা কাজ করছে।

বয়ান টিকিয়ে রাখার লড়াই

১৯৭১ সালের পর আওয়ামী লীগ বর্তমানে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শত শত নেতার নামে ফৌজদারি মামলা চলছে। দলের শীর্ষ নেতাদের বড় অংশই এখন নির্বাসনে বা আত্মগোপনে। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে দমন-পীড়ন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।

দেশের বাইরে অবস্থানরত অনেক নেতার কাছে এখন রাজনীতি ও নির্বাসিত জীবন মিলেমিশে একাকার। সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত মনে করেন, হত্যাসহ তার বিরুদ্ধে অন্তত ১০০টি মামলা রয়েছে। বর্তমান জীবন নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি জানান, এটি চরম অনিশ্চয়তা আর শূন্য থেকে নতুন করে শুরু করার একটি লড়াই।

দ্য ডিপ্লোম্যাট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ধরুন, আপনার একটা নির্দিষ্ট বাড়ি ছিল, কাজের জন্য একটা টেবিল ছিল, ল্যাপটপ-ফোন ছিল। সেই পুরো গোছানো জীবনটা তছনছ হয়ে গেছে। এখন সবকিছু শূন্য থেকে আবার সাজাতে হচ্ছে।’

আরাফাত নিজেকে ‘অত্যন্ত ব্যস্ত’ বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক আলোচনা আর ব্যক্তিগত জীবন—সব মিলিয়ে একটা পরিস্থিতি। আমি কোন দেশে আছি, কোথায় আছি, কার সাথে আছি, তার চেয়ে বড় কথা হলো দিনকাল কেমন যাচ্ছে। রাজনীতির ফয়সালা হোক বা না হোক, কাজের কোনো শেষ নেই। প্রায় ২৪ ঘণ্টাই কাজ করতে হয়। আর এর বড় অংশজুড়ে থাকে শুধুই যোগাযোগ।’

আরাফাত আরও জানান, নির্বাসিত অবস্থায় সাধারণ রাজনৈতিক কাজ করতেও এখন অনেক বেশি সময় লাগে। তার ভাষায়, ‘আগে যে কাজটা হয়তো দুই ঘণ্টায় হয়ে যেত, এখন সেটা করতে দুই দিন লেগে যায়।’

বাংলাদেশের ভেতরে দলের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়লেও নেতারা দাবি করছেন যে, অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, এনক্রিপ্টেড (নিরাপদ) যোগাযোগ মাধ্যম এবং অনলাইনে সমন্বয়ের মাধ্যমে দল এখনও সক্রিয় আছে।

আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন দ্য ডিপ্লোম্যাট-কে বলেন, তাদের বর্তমান দলীয় কাজ মূলত কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখা, আইনি সহায়তা সমন্বয় করা এবং গ্রেপ্তার, নির্বাসন বা আত্মগোপনে থাকা কর্মীদের মনোবল ধরে রাখার মাঝেই সীমাবদ্ধ।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

তিনি বলেন, ‘আমাদের নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হচ্ছে। তাদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। আমরা আইনি ও রাজনৈতিক—সব ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়েই যাচ্ছি।"

সাদ্দাম হোসেন বর্তমান দমন-পীড়নকে ‘অবিশ্বাস্য রকমের বিশাল’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তাদের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এটি এক ধরনের ফ্যাসিবাদী বাস্তবতা।’

সাক্ষাৎকার দেওয়া প্রায় প্রত্যেক শীর্ষ নেতাই আওয়ামী লীগের পতনকে ‘স্বাভাবিক রাজনৈতিক পতন’ হিসেবে মানতে নারাজ। এর বদলে তারা জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে দেশীয় বিরোধী দল, ইসলামী শক্তি এবং বিদেশি স্বার্থের সমন্বয়ে ঘটা একটি ‘সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আমার মনে হয় এটা ছিল এক ধরনের প্রতারণা বা স্ক্যাম। তারা লাশের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতার রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়েছে।’

ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি রকিবুল হাসান রকিবও এই অভ্যুত্থানকে ‘দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘একাত্তরের প্রতিটি পরাজিত শক্তি মিলে এটি ঘটিয়েছে।’

মোহাম্মদ আলী আরাফাতও শেখ হাসিনার পতনকে দেশি ও বিদেশি চাপের ফসল বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘যখন একটি জাতীয়তাবাদী সরকার কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে মাথা নত করে না, তখন নানা ধরনের চাপ আসতে থাকে। এ কারণেই বিভিন্ন অশুভ শক্তি, জঙ্গি গোষ্ঠী এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলো একজোট হয়েছিল।’

এই ব্যাখ্যাটিই এখন আওয়ামী লীগের মূল হাতিয়ার, যার মাধ্যমে তারা অভ্যুত্থানটিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করছে। দলীয় নেতারা বারবার দাবি করছেন যে, আন্দোলনে নিহতের ঘটনাগুলোর কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি। তাদের অভিযোগ, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার নিহতের এই পরিসংখ্যানকে বেছে বেছে কেবল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করছে।

আরাফাত বলেন, ‘প্রতিটি মৃত্যুর যদি নিরপেক্ষ তদন্ত হতো, তবে পুরো চিত্রটাই পরিষ্কার হয়ে যেত। তখন বোঝা যেত কে সত্য বলছে আর কে মিথ্যা বলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি বিচারের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। কিন্তু তারা তো বিচার করছে না। তারা লাশের সংখ্যা নিয়ে রাজনীতির ব্যবসা করছে।’

একই সঙ্গে সরকারের পতনের কারণে দলের ভেতর শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে গেছে—এমন দাবিও নেতারা কঠোরভাবে নাকচ করে দিয়েছেন। দলের একটা অংশ নেতৃত্ব পরিবর্তন চায়, এমন গুঞ্জনকে তারা স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেন।

এ বিষয়ে সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘এ নিয়ে কোনো প্রশ্নই ওঠে না। শেখ হাসিনাই এই দলের ঐক্য, সংগ্রাম এবং প্রতিরোধের প্রতীক।’

রকিবও একই সুরে বলেন, ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বাইরে কোনো বিকল্প নেই। আমরা এমন কিছু চিন্তাও করি না।’

কয়েকজন নেতা তো এমন দাবিও করেছেন যে, দৃশ্যমান রাজনীতি থেকে হারিয়ে গেলেও দলের বিশাল একটি সামাজিক ও আদর্শিক সমর্থন এখনও অটুট রয়েছে।

সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল দ্য ডিপ্লোম্যাট-কে জানান, ব্যাপক ধরপাকড়, হত্যা এবং তাঁর ভাষায় ‘রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট মবতন্ত্রের’ পরও দল সাংগঠনিকভাবে অক্ষত রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ওপর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মবতন্ত্র চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৭০০-এর বেশি কর্মীর মৃত্যু হয়েছে, অনেকে জীবিকা হারিয়েছেন, হাজার হাজার মানুষ জেলে আছেন। তারপরও দলটি ঐক্যবদ্ধ, উজ্জীবিত এবং সুসংগঠিত রয়েছে।’

নওফেলের দাবি, আওয়ামী লীগের অবশিষ্ট নির্বাচনী শক্তির ভয়েই তাদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তৃণমূলের সাধারণ মানুষের কাছে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে বলেই আমাদের অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। বর্তমান সরকার ভয় পাচ্ছিল যে, মানুষ বিপুল ভোটে আমাদেরই নির্বাচিত করবে।’

তবে দেশের ভেতরে থাকা নেতারাও তাদের বর্তমান জীবনকে অবরুদ্ধ অবস্থা, অনিশ্চয়তা আর টিকে থাকার লড়াই হিসেবেই বর্ণনা করেছেন। রকিব, যার নামে হত্যা মামলা রয়েছে কিন্তু এখনও দেশেই অবস্থান করছেন, জানান যে সাধারণ চলাফেরাও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘দেশটাকে গণতন্ত্র থেকে মবতন্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। মব বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার রাজত্বে কে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে?’

তবে এসব বাহ্যিক আত্মবিশ্বাসের আড়ালে সাক্ষাৎকারগুলো থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—পরাজয়, নির্বাসন, গ্রেপ্তার এবং সাংগঠনিক ধসের কারণে আওয়ামী লীগ ভেতর থেকে কতটা বদলে গেছে। দলটির রাজনীতি এখন আর সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নয়, বরং অনেকটাই প্রতিরক্ষামূলক। নেতারা এখন আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন না, তাদের মূল ভাবনাজুড়ে আছে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, আইনি লড়াই, দমন-পীড়ন এড়ানো এবং কোনো একদিন ফিরে আসা।

সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের জন্য শেখ হাসিনার ফেরাটা জরুরি। জনগণের সংগ্রাম আর শেখ হাসিনার ফেরা—এই দুটি বিষয় এখন একই বিন্দুতে এসে মিলেছে।’

এই প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখেই আওয়ামী লীগ এখন একটি নতুন রাজনৈতিক বয়ান দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। এই বয়ানে তাদের বিগত দিনের অর্জনের চেয়ে বরং বঞ্চনা, নিজেদের ভিকটিম হিসেবে উপস্থাপন, গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার কথাই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। কিন্তু এই বয়ান সাধারণ মানুষের সহানুভূতি কতটুকু আদায় করতে পারবে, তা এখনও চরম অনিশ্চিত।

আওয়ামী লীগ কি ফিরতে পারবে

ক্ষমতা হারানোর প্রায় দুই বছর পরও আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন, সাংগঠনিকভাবে দুর্বল এবং দৃশ্যমান রাজনীতি থেকে অনেকটাই অনুপস্থিত। এত বড় বিপর্যয়ের পরও বিশ্লেষকরা বলছেন, দলের ভবিষ্যৎ কেবল রাজপথে তাদের অনুপস্থিতি দিয়ে মাপা ঠিক হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ এম শাহান মনে করেন, দলটি শুধু মানুষের ক্ষোভের কারণেই ধুঁকছে না। বরং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগকে বয়কট করার যে অলিখিত ঐক্য গড়ে উঠেছে, সেটিই তাদের জন্য বড় বাধা।

দ্য ডিপ্লোম্যাট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ এখনও লড়াই করছে। তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে কারণ বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক মঞ্চের মতো প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একটি বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে যে—আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে দেওয়া হবে না। যতদিন এই বোঝাপড়া বহাল থাকবে, দলটি ধুঁকতেই থাকবে।’

অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, আজকের দিনে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু দমন-পীড়ন বা আইনি চাপ নয়। বরং নিজেদের পতনের মূল কারণগুলো প্রকাশ্যে স্বীকার না করাই তাদের প্রধান ব্যর্থতা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজের মতে, কর্তৃত্ববাদী শাসন, রাজনৈতিক নিপীড়ন, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে সহিংসতার কারণে মানুষের মনে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সেটি মেনে নিতে দলটি এখনও নারাজ।

তিনি বলেন, ‘তারা সব সময়ই বলে আসছে যে এটি একটি ষড়যন্ত্র। তাদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা, তাদের করা ভুল ও অবিচার এবং দুর্নীতির দায়—এসব নিয়ে জবাবদিহি করার কোনো ইচ্ছাই তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।’

পারভেজের মতে, এই জবাবদিহির অভাব দলটির রাজনীতিতে ফিরে আসার পথ আরও কঠিন করে তুলেছে।

‘একটি রাজনৈতিক দলকে জনগণের কাছে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হয়,’ তিনি বলেন। ‘রাজনৈতিক পুনর্মিলন অত্যন্ত জরুরি। একটি দলের এই সৎ সাহস থাকা উচিত যে, তারা ভুল স্বীকার করবে এবং তা থেকে শিক্ষা নেবে। কিন্তু এই দলটির মধ্যে এই দুটি বিষয়ের ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না।’

অধ্যাপক শাহানও মনে করেন, অনেক আওয়ামী লীগ কর্মী ও অন্ধ সমর্থক এখনও বুঝতেই পারছেন না যে, শেখ হাসিনার শেষ শাসনামলে সাধারণ মানুষের মনে কতটা ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘দলের অনেক কর্মী এবং অনুগত ব্যক্তি একটি ঘোরের মধ্যে বাস করছেন। তারা শুধু সেটাই শুনছেন, যেটা তারা শুনতে চান। আর এই স্বভাব দলটিকে ঘুরে দাঁড়াতে কোনোভাবেই সাহায্য করছে না।’

একইসাথে, বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন যে, আওয়ামী লীগকে পাকাপাকিভাবে রাজনীতি থেকে দূরে রাখলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সমালোচকদের মতে, প্রশাসনিকভাবে কোনো বড় রাজনৈতিক শক্তিকে মুছে ফেলা যায় না। এর ফলে তাদের সামাজিক ভিত্তি কখনই পুরোপুরি ধ্বংস হয় না।

এ প্রসঙ্গে পারভেজ বলেন, ‘রাজনীতিকে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হয়। কাউকে নিষিদ্ধ করে চিরতরে দমিয়ে রাখা যায় না।’

তাঁর মতে, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় উল্টো ফল বয়ে আনে। নিষিদ্ধ দলগুলো নিজেদের ভিকটিম হিসেবে উপস্থাপন করে ফায়দা নিতে পারে। পারভেজ বলেন, ‘আমি তো বলব, তাদের নিষিদ্ধ করলে বরং তাদেরই সুবিধা হবে। এর ফলে তারা একটি ভিকটিম বয়ান তৈরি করবে এবং মানুষের কাছ থেকে সহানুভূতি কুড়াবে।’

অধ্যাপক শাহানও বিশ্বাস করেন যে, সাংগঠনিক পতন সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের একটি বড় আদর্শিক ভিত্তি এখনও রয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করলেই দলটির শেষ হয়ে যাবে। যতদিন তারা এই সমর্থক গোষ্ঠীকে ধরে রাখতে পারবে, দলটি হারিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’

শাহানের মতে, আওয়ামী লীগের এই পতন গণঅভ্যুত্থানের অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। শেখ হাসিনার ক্রমাগত কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা ভেতর থেকেই দলটিকে দুর্বল করে দিয়েছিল। তিনি সাংগঠনিক কাঠামোর চেয়ে আমলা, টেকনোক্র্যাট, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করেছিলেন।

‘একটা সময় ক্ষমতায় থাকার জন্য তার আর দলের প্রয়োজন ছিল না। এর বদলে তিনি টেকনোক্র্যাট ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটি জেতার মতো জোট গঠন করেছিলেন’, বলেন শাহান।

তিনি আরও যোগ করেন, ‘এর পরিণতিতে দলটির এখনও একটি উল্লেখযোগ্য সমর্থক ও কর্মী গোষ্ঠী থাকলেও তাদের কোনো কার্যকর নেতৃত্ব নেই। কারণ সময়ের সাথে সাথে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি একদম নড়বড়ে হয়ে গেছে।’

এই সাংগঠনিক দুর্বলতাই অন্যতম কারণ যে, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারকে হত্যার পর আওয়ামী লীগ যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, এখন তা পারছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আবেগীয় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

১৯৭৫ সালের পর সামরিক শাসন একটি সাধারণ প্রতিপক্ষ তৈরি করেছিল। এর ফলে আওয়ামী লীগপন্থি শক্তিগুলো ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সামরিক শাসনবিরোধী ছাতার নিচে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পায়। এছাড়া শেখ মুজিব ও তার পরিবারকে হত্যার কারণে মানুষের মধ্যে এক ধরনের সহানুভূতিও তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্লেষকদের মতে, এবার সেই সহানুভূতি বা ঐক্যের সুযোগ একেবারেই নেই।

পারভেজ বলেন, ‘সে সময় সামরিক শাসন নামের একটি সাধারণ প্রতিপক্ষ ছিল। কিন্তু পুরো দেশকে ঐক্যবদ্ধ করে আওয়ামী লীগের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করাবে, এখন এমন কোনো সাধারণ প্রতিপক্ষ দেখা যাচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ৭৫-এর পর অনেকেই রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু এবারের জনরোষ অনেক বেশি গভীর। কারণ, মানুষের মনে আন্দোলনকারীদের হত্যা, দমন-পীড়ন এবং হাসিনার শেষ বছরগুলোর কর্তৃত্ববাদী শাসনের দগদগে স্মৃতি এখনও তরতাজা।

‘শেখ মুজিবের পরিবারকে হত্যার পর আওয়ামী লীগের জন্য সহানুভূতি তৈরি হয়েছিল’, তিনি বলেন। ‘কিন্তু এবার আমি সে ধরনের কোনো সহানুভূতি দেখছি না।’

এতকিছুর পরও খুব কম বিশ্লেষকই মনে করেন যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে স্রেফ ভোজবাজির মতো মিলিয়ে যাবে। বরং বড় প্রশ্ন হলো, দলটি রাজনৈতিক, সাংগঠনিক এবং আদর্শিকভাবে নিজেদের নতুন করে গড়তে পারবে কি না? নাকি অব্যাহত এই নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরও বেশি মেরুকরণের দিকে ঠেলে দেবে?

বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের এই অনুপস্থিতি বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন রূপ দিচ্ছে। কয়েক দশক ধরে দলটিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্তত প্রতীকীভাবে হলেও উদারপন্থি বা মধ্য-বামপন্থি হিসেবে দেখা হতো। দলটিকে আনুষ্ঠানিক রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ায় অধ্যাপক শাহান মনে করেন, দেশের রাজনীতির ভরকেন্দ্র ধীরে ধীরে আরও ডানপন্থার দিকে হেলে পড়ছে।

তিনি বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবেই দেখা গেছে, যখন মূলধারার কোনো রাজনৈতিক দলকে আনুষ্ঠানিক রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা বৃহত্তর রাজনৈতিক ও আদর্শিক মেরুকরণের পথ তৈরি করে। রাজনীতির ভেতরে থাকা একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হারিয়ে গেলে রাজনীতি আরও চরম আকার ধারণ করে।’

আপাতত আওয়ামী লীগ দুটি বাস্তবতার মাঝে আটকে আছে। একদিকে, অনেক বাংলাদেশির চোখেই দলটি চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও প্রত্যাখ্যাত। অন্যদিকে, দেশের ইতিহাস ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দলটির এত গভীর শেকড় রয়েছে যে, রাজনীতি থেকে তাদের পুরোপুরি মুছে ফেলাও প্রায় অসম্ভব।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের লেখক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটকে শুধু দমন-পীড়ন বা নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার চশমায় দেখলে হবে না। বরং গত দেড় দশক ধরে দলের ভেতরের আমূল পরিবর্তনকেও বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি লক্ষ্য করেছেন, হাসিনার পতনের পর আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার অধিকারের পক্ষে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে কেউ রাজি নয়। এমনকি যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা শেখ মুজিবের অবদান নিয়ে এখনও সাবধানে কথা বলেন, তারাও এই ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। মহিউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, ১৯৭৫ সালের পর তখনকার শাসকরা আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে যেটুকু জায়গা দিয়েছিল, বর্তমান শাসকরা ততটুকু জায়গা দিতেও নারাজ। এর ফলে দলটির আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে ফেরার পথ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

একইসাথে তিনি সতর্ক করে দেন যে, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করলেই তাদের চিরতরে মুছে ফেলা যায় না। দক্ষিণ এশিয়ায় বারবার দল নিষিদ্ধ করার ইতিহাস (যেমন জামায়াতে ইসলামীকে বারবার নিষিদ্ধ করা) টেনে তিনি বলেন, ‘কোনো দল যদি গভীরভাবে কোনো মতাদর্শ বিশ্বাস করে, তবে তাদের সমূলে উৎপাটন করা খুব কঠিন।’

ক্ষমতা হারানোর পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে ভারতের গুরুত্বের কথাও মনে করিয়ে দেন এই বিশ্লেষক। ১৯৭৫ সালের সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পরও অনেক আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মী ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। ঠিক যেমনটা ১৫ আগস্টের পর অনেক বাকশালপন্থি নেতা করেছিলেন।

তার মতে, দুই দেশে সরকারের পরিবর্তন হলেও আওয়ামী লীগ ভারতের সাথে দীর্ঘদিনের একটি পোক্ত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তাই দলটির আবার উন্মুক্ত রাজনীতিতে ফেরার সক্ষমতা শুধু দেশের ভেতরের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে না। বরং এটি আন্তর্জাতিক চাপ, বিশেষ করে ভারত ও তার মিত্রদের অবস্থানের ওপরও ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।