Image description

নালার ধারে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছিল একটি কুকুর। হঠাৎ কানের কাছে বেজে উঠল বাঘের গর্জন! চমকে চোখ মেলেই কুকুরটি দেখে সামনে বসে আছে আস্ত এক ‘বাঘ’। প্রচণ্ড আতঙ্কে দিগ্বিদিক হন্যে হয়ে ছুটতে গিয়ে সোজা নালায় ছিটকে পড়ে কুকুরটি। আর ঠিক সে সময়ই ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে ওঠে অট্টহাসি।

‘আরিফ ভাই’ নামক একটি ফেসবুক পেইজ থেকে পোস্ট করা একটি নিরীহ প্রাণির ওপর এমন নিষ্ঠুর প্র্যাঙ্ক ভিডিওটি এরই মধ্যে দেখে ফেলেছেন ২ কোটি ১০ লাখেরও বেশি মানুষ; যেখানে রিঅ্যাক্ট পড়েছে প্রায় ৩ লাখ। মূলত আরিফ ভাই নামক যুবক ঘুমন্ত কুকুরটির পাশে চুপিসারে বাঘ সদৃশ একটি পাপেটের সাথে সাউন্ডবক্স রেখে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ান। এরপর দূরে দাঁড়িয়েই মোবাইল থেকে সাউন্ডবক্সে চালু করেন বাঘের গর্জন। তাতেই ভয়ে কেঁপে ওঠে নালায় গিয়ে পড়ে কুকুরটি।

আরেকটি ভিডিওর দৃশ্য আরও নির্মম। Mufazzal Hosen নামের একটি ফেসবুক পেইজ থেকে আপলোড করা ওই রিলসে দেখা যায়, এক যুবক একটি কুকুরকে জালের (নেট) নিচে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছেন। বাঁচার তাগিদে প্রাণীটি যখন আর্তনাদ করছে এবং জাল থেকে বের হতে মরিয়া হয়ে ছটফট করছে, ঠিক তখনই ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজানো হচ্ছে অট্টহাসির সাউন্ড ইফেক্ট। একটি প্রাণির আর্তনাদ যেন কিছু মানুষের হাসির উপলক্ষ্য এনে দিয়েছে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে যুবকটি জাল সরিয়ে নিলে কুকুরটি প্রাণভয়ে দৌড়ে পালায়। প্রাণীদের প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা প্রদর্শনের এই ভিডিওটিও দেখেছেন প্রায় ৯ লাখ দর্শক। হাজার হাজার মন্তব্যকারীর মধ্যে কেউ কেউ এমন নিষ্ঠুরতা নিন্দা জানালেনও অনেকে আবার উপভোগ করছেন এমন কর্মকাণ্ড।

প্রাণীদের এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সস্তা বিনোদনের এই ভয়ংকর ট্রেন্ড বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই চলমান আছে। বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে এই বিকৃত চর্চা। শুধু ‘আরিফ ভাই’ কিংবা ‘মুফাজ্জল হোসেন’ এর পেইজেই এগুলো সীমাবদ্ধ নেই; ডিজিটাল অনুসন্ধানে কুকুর নির্যাতনের মাধ্যমে বাংলাদেশে কনটেন্ট তৈরি করছে এমন অন্তত ২৬টি ফেসবুক আইডি ও পেইজ চিহ্নিত করেছে দ্য ডিসেন্ট। 

এসব আইডি বা পেইজের পোস্টে মন্তব্যের ধরণ দেখলেই বোঝা যায় স্রেফ বিনোদনের উপলক্ষ হিসেবেই অনেক ব্যবহারকারী এসব দেখেন৷ তবে কিছু নেতিবাচক মন্তব্যও পরিলক্ষিত হয় কমেন্টে। ফেসবুকে এসব রিলস বা ভিডিও দিয়ে ইনকামই মূল লক্ষ এসব কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের৷ 

সামাজিক অবক্ষয়, সহজে অনলাইনে পয়সা ইনকাম করার ইচ্ছা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ার সুযোগ নিয়েই এমন প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। 

কী আছে এসব ভিডিওতে?

অনলাইনে খুঁজে পাওয়া বাংলাদেশ ভিত্তিক ২৬টি ফেসবুক পেইজের বেশিরভাগের কনটেন্টের ধরন প্রায় অভিন্ন। কুকুরকে নির্যাতন করে তৈরি ৩০০ এর অধিক রিলস বিশ্লেষণ করেছে দ্য ডিসেন্ট। এতে অন্তত ১০ ধরণের নির্যাতনের চিত্র পাওয়া গেছে।

বাঘ বা সিংহের পাপেট দিয়ে কুকুরকে ভয় দেখানো, কুকুরের লেজে বিভিন্ন প্রাণির পাপেটসদৃশ বেলুন বেঁধে দেওয়া, কাপড় বা জাল দিয়ে কুকুরকে আটকে রাখা, কুকুরের মাথার কাছে ড্রোন ক্যামেরা উড়িয়ে ভয় দেখানো, কুকুরের পেছনের পায়ে ধরে চক্কর দিয়ে ছেড়ে দেওয়া, কুকুরের মুখে কাপড় বেধে চোখ অন্ধ করে রাখা, কানের কাছে বাঁশি বাজানো, কুকুরের পাশে পটকা ফুটানো, ঘুমন্ত কুকুরের কানে সুড়সুড়ি দেওয়া কিংবা সামনে গ্লাস রেখে টিজ করে নিরীহ প্রাণীদের চরম বিরক্তির মুখে ফেলেই তারা তৈরি করছেন এসব রিলস ও ভিডিও। 

কিছু পেইজে কুকুরের পাশাপাশি বিড়ালকেও এই ধরনের নির্যাতনের ভিডিও আপলোড করতে দেখা যায়। কোনো কোনো একাউন্টে কন্টেন্ট তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে শিশু ও নারীদেরও। 

‘‘New Best Dog Funny Video, Sleeping Dog Meets Funny Balloons, Viral Animal Comedy Video, পাগলের খেলা , New funny dog, Viral Treding funny short video, Sera funny video, Village Dog vs Drone Camera’’ এমন ক্যাপশনে বিভিন্ন হ্যাসট্যাগে পোস্ট হয় এসব ভিডিও। 

প্রাণি নির্যাতনের ভিডিও বেশি তৈরি হচ্ছে ময়মনসিংহে

প্রাণি নির্যাতন করে ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে এমন চিহ্নিত ২৬টি ফেইসবুক আইডি ও পেইজের সিংহভাগই ময়মনসিংহ জেলা ভিত্তিক। ২৬টি আইডি ও পেইজের মধ্যে ১৯টিই ময়মনসিংহের তারাকান্দা, গৌরিপুর এবং ফুলপুর থেকে পরিচালিত হয়। ২টি কিশোরগঞ্জ এবং ২টি সিরাজগঞ্জের কনটেন্ট ক্রিয়েটররাই পরিচালনা করেন। বাকি ৩টি আইডির লোকেশনের ব্যাপারে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। 

ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকা বিভিন্ন দোকানপাট ও স্থাপনার সাইনবোর্ডে থাকা তথ্য, আইডি ও পেইজের লোকেশনের তথ্য এবং কয়েকজন ক্রিয়েটরের সাথে কথা বলে এসব তথ্য নিশ্চিত হয়েছে দ্য ডিসেন্ট। 

ময়মনসিংহ থেকে পরিচালিত ১৯টি একাউন্ট হলো— Kasem Bangla, Mijan Comedy, Comedy Hafizul, MD Samiul Alam, Shakil Ahamed, Mufazzal Hosen, Nur Mohammad, Shahin Mia, মোঃ রেজাউল করিম, মোঃ জুয়েল মিয়া, Fokir Lal, Md Ashraful Alam, ময়মনসিংহের কাজল, Village comedy 10, Comedy Nur, বিল্লাল মিয়া, Habibi Habibi, Md Billal Mia এবং Anamul Haque।

কিশোরগঞ্জ থেকে পরিচালিত ২টি একাউন্ট হলো,  Md. Shohedul Islam ও Md Ashraful। সিরাজগঞ্জ থেকে পরিচালিত ২টি একাউন্ট হলো, Arif Vai এবং Foriudl Vai ভাই। 

ময়মনসিংহ ভিত্তিক পেইজ ও একাউন্টগুলোর মধ্যে পরস্পরের সংঘবদ্ধতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এদের অনেকে একে অপরের সাথে নানানভাবে যুক্ত। কিছু ক্ষেত্রে একজন ক্রিয়েটর অন্যজনের সাথে মিলে এসব রিলস শুট করেন। উল্লেখিত এলাকার গ্রামের রাস্তাঘাট এবং স্থানীয় বাজারে বসবাসরত বেওয়ারিশ কুকুরদের নিয়ে তারা ভিডিও বানান। 

 

এসব কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সবারই নাম ও পরিচয় উন্মুক্ত, তবুও এমন কর্মকাণ্ড থামাতে কোনো প্রশাসনিক উদ্যোগ নেই। 

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস্) আশরাফুল করিম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘কুকুরকে নির্যাতন করে বানানো এমন ভিডিও ইতোপূর্বে আমাদের নজরে আসেনি। এটা তো অবশ্যই দণ্ডনীয় অপরাধ। তথ্য পেলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’’

‘মনে হয় কাজটা ঠিক হচ্ছে না, লাভের জন্য বানাই’

কুকুরকে উত্যক্ত করে বানানো এসব কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মূল লক্ষ্য টাকা ইনকাম। এক্ষেত্রে তারা ‘ঠিক-বেঠিকের’ তোয়াক্কা করেন না তেমন। এদের কেউ কেউ এসব রিলস বানিয়ে লক্ষাধিক টাকা ইনকাম করেন।

দ্য ডিসেন্ট এসব কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে চারজনের সাথে ফোনে কথা বলেছে। এরমধ্যে Fokir Lal পড়েন ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। কুকুরের মাথার কাছে ড্রোন উড়িয়ে রিলস বানিয়ে আপলোড করেন ফেসবুকে। এসব রিলস বানিয়ে মাসে লাখ খানেক টাকা ইনকাম হয় বলে জানান তিনি। 

সিরাজগঞ্জের আরেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর আরিফ। ‘আরিফ ভাই’ নামক একটি পেইজ থেকে বাঘের পাপেট দিয়ে কুকুরকে ভয় দেখিয়ে রিলস বানান। 

তিনি জানান, আগে সবমিলিয়ে কয়েক লাখ টাকা ইনকাম করলেও তার বর্তমান ইনকাম কম। তার সাথে ‘ফরিদ ভাই’ নামে আরেক ক্রিয়েটর একসাথে শ্যুট করেন। ওই ফরিদ ভাই’র ইনকাম মাসে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা বলে জানান তিনি।

কুকুরকে উত্যক্ত করে এমন রিলস বানানো তো আইনত অপরাধ, তারপরও এমন করছেন কেন— এমন প্রশ্ন করলে আরিফ দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘এটা আমাদের কাছেও মনে হয় যে কাজটা ঠিক হচ্ছে না, তবুও আমরা বানাই কারণ এটা আমাদের লাভের জন্য। আর এরকম ভিডিও আমি একা না, অনেকেই বানায়।’’

প্রাণিকে উত্যক্ত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ

২০১৯ সালের প্রাণি কল্যাণ আইন অনুযায়ী, কোন প্রাণিকে উত্যক্ত করে ভিডিও করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।  প্রাণী কল্যাণ আইনের ৬ ধারায় নিষ্ঠুর আচরণের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

ধারা ৬(১) এর ‘ছ’ দফায় কোনো প্রাণিকে লড়াই করার জন্য প্ররোচিত করা বা টোপ হিসাবে ব্যবহার করা বা উত্যক্ত করা হলে এবং ‘ঢ’ দফা অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতিপত্র ছাড়া কোনো প্রাণিকে বিনোদন বা ক্রীড়া ক্ষেত্রে ব্যবহার করলে সেটি নিষ্ঠুর আচরণের সংজ্ঞার আওতাধীন হবে।

৬ ধারার ৩ উপধারা অনুযায়ী, অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণ সংঘটন বা সংঘটনে সহযোগিতা উভয়ই আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ এবং শাস্তিযোগ্য।

২০১৯ সালের প্রাণী কল্যাণ আইনের ১৬ ধারায় প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, নিধন সহ অন্যান্য বিষয়ে শাস্তির বিধান আছে। এই ধারা অনুযায়ী, “প্রাণির প্র‍তি নিষ্ঠুর আচরণের অপরাধ সংঘটন করিলে অথবা অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করলে সেই ব্যক্তি অনধিক ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।”

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রায়হান সোবহান বলেছেন, ‘‘আইনি বাধ্যবাধকতার বাইরেও আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, আমাদের চারপাশে থাকা অনেক প্রাণিই মানুষের মতোই সামাজিক জীব। প্রকৃতির সুনিপুণ ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রতিটি প্রাণির অস্তিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানবিক মানসিকতার পাশাপাশি প্রাণি কল্যাণ আইন ২০১৯ এর বিধানগুলো যথাযথ ও কঠোরভাবে প্রয়োগ প্রাণির প্রতি অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ রোধ করবে বলে আশা রাখি।’’

মেটার পলিসি ব্রেক করলেও নেই ব্যবস্থা 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কুকুর ও বিড়ালকে পাপেট, বেলুন, ড্রোন, পটকা, কাপড় বেঁধে চোখ ঢেকে রাখা, চক্কর দেওয়া, সুড়সুড়ি দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে ভয় দেখিয়ে ও বিরক্ত করে নির্যাতনের ভিডিও স্পষ্টভাবে ফেসবুকের (মেটা) কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘন করছে।

মেটার অফিসিয়াল কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড অনুসারে, এসব ভিডিও ‘Violent and Graphic Content’ বিভাগের আওতায় পড়ে। বিশেষ করে ‘Imagery of humans committing acts of brutality on living animals’ (জীবিত প্রাণির ওপর মানুষের নির্মম আচরণের দৃশ্য) এবং ‘Imagery depicting injured animals suffering’ (কষ্টে থাকা আহত প্রাণীর ছবি/ভিডিও) নিষিদ্ধ।

এছাড়া প্রাণিদের কষ্ট দেখে আনন্দ প্রকাশ করা বা স্যাডিস্টিক কমেন্ট করাও এই পলিসির আওতায় লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হয়।

কিন্তু এরপরও ফেসবুকে এসব ভিডিওর বিরুদ্ধে কোনো ধরণের রেস্ট্রিকশন বা ব্যবস্থা নেয়নি মেটা। প্রতিনিয়ত এসব ভিডিও আপলোড দিচ্ছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। 

যা বলছেন প্রাণি বিশেষজ্ঞরা

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাশেদুল আলম দ্য ডিসেন্টকে বলেন , ‘‘যখন ঘুমন্ত কুকুরকে কেউ ডিস্টার্ব করবে, সে অবশ্যই ভয় পাবে এবং এগ্রেসিভ হবে। কুকুরের মেমোরি অত্যন্ত শার্প এবং তাদের সাথে কে কী করছে তারা মনে রাখে এগুলো। এর ফলে ওরা অনেকসময় মানুষের প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে।’’

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কুকুরকে উত্যক্ত করা বা নির্যাতনের এই ধারা শুরু হয় একদম ছোটবেলা থেকেই। গ্রামে অনেকেই কুকুরকে খারাপ সিম্বল হিসেবে দেখে এবং তাদেরকে নির্যাতন করাকে খারাপ কিছু মনে করে না। ফলে এমন মানসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা মানুষরাই এমন কাজে জড়ায়। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘অনেক সময় গ্রামীণ পর্যায়ে কুকুর এবং বিড়ালের প্রতি মানুষের একটা নেতিবাচক বিষয় কাজ করে। তারা দেখবেন যে বিড়াল এবং কুকুরকে অনেক সময় সমাজের ক্ষতির জন্য একটা সিম্বল হিসেবে দেখে।’’

তার মতে, বাংলাদেশের চাকরির সংকট আছে, অনেক মানুষ বেকার। ফলে তারা সহজে বেশি টাকা ইনকাম করতে গিয়ে এসব দিকে ঝুঁকে।  

তিনি বলেন, ‘‘আমি বলবো যে এটা একটা সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার। যারা এসব রিলস বানায় তারা চায় একটু নজরে আসতে। সেই নজরে আসার জন্য তারা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ইউজ করে। এর মাধ্যমে মানুষ এখানে একটু হাসবে, একটু বিনোদন পাবে। কিন্তু তার বিপরীতে গিয়ে যে সে একটা প্রাণীকে পরোক্ষভাবে নির্যাতন করছে, তার মধ্যে এই সেন্সটুকু নাই। এবং অনেকেই এটাকে একটা কমন বিষয় হিসেবে দেখে। এই যে এটা একটা অপরাধ, যারা কনটেন্টগুলো বানাচ্ছে তাদের কিন্তু এই বিষয়ে খুব বেশি নলেজ নাই।’’

এ বিশ্লেষকের মতে, এসব যে অপরাধ সে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি অপরাধের ধরণ অনুযায়ী নতুন আইনও তৈরি ও প্রয়োগ করা উচিৎ। 

‘‘বর্তমান সময়ে  ক্রাইমের ধরন পরিবর্তন হচ্ছে, পরিবর্তিত ক্রাইমের উপর বেস করে আমাদের আইনগুলো কিন্তু খুব বেশি শক্তিশালী না এবং আইনগুলো সেভাবে তৈরি করাও না। এজন্যই আমাদেরকে এমন কিছু আইন তৈরি করতে হবে যেসব আইনে এসব নতুন এলিমেন্টসগুলো সেখানে ঢুকাতে হবে। যারা এমন কোনো কনটেন্ট তৈরি করবে, এগুলোকে নলেজে নিয়েই একটা নতুন এখানে আইন তৈরি করা উচিত।’’, বলেন রেজাউল করিম সোহাগ। 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাণি কল্যাণ ফাউন্ডেশন ‘অভয়ারণ্য’-এর প্রতিষ্ঠাতা রুবাইয়া আহমেদ বলেন, ‘‘প্রাণি নির্যাতন অসম্ভব রকমের বেড়ে গেছে বাংলাদেশে এবং আমরা তাল রাখতে পারছি না। আমরা এটা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন।’’

রুবাইয়া আহমেদ বলেন, “এমন কন্টেন্ট বানানো এবং শেয়ার করা উভয়টিই বন্ধ করতে হবে। যারা শেয়ার করছেন, যারা দেখছেন তাদের একটা দায়িত্ব আছে, এখানে সরকারেরও দায়িত্ব আছে এবং এগুলোর শাস্তি হওয়া দরকার। মোটা অংকের জরিমানা হওয়া দরকার।”

‘‘এই বিষয়টা সরকারের দৃষ্টিসীমার মধ্যে এখনো আসেইনি। নতুন সরকার এসছে, একটু সময় দিতে হবে সবাই বুঝতে পারছি। কিন্তু অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ারটা সব সরকারের আমলেই তলায় পড়ে যায়, বা কোনো প্রাধান্যই পায় না। এবারও আমরা কিন্তু দেখছি যে এই সরকার অনেক কিছু বললেন, কিন্তু আসার পর থেকে সেরকম দৃষ্টান্তমূলক কোনো কাজ আমরা এখনো দেখতে পাইনি।’’, বলেন রুবাইয়া আহমেদ।