বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ফল প্রকাশের প্রায় দেড় মাস পর ‘জালিয়াতি’ ও ‘অনিয়মের’ অভিযোগ উঠেছে। খোদ শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা মিললে পুরো পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় আয়োজন করা হতে পারে। নিয়োগের চূড়ান্ত ধাপে এসে এমন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১৪ হাজারেরও বেশি প্রার্থী, যারা বর্তমানে মৌখিক পরীক্ষার অপেক্ষায় রয়েছেন। ফল প্রকাশের এত দীর্ঘ সময় পর কেন অনিয়মের অভিযোগ সামনে এলো, সেই প্রশ্নও তুলছেন তারা।
অন্যদিকে, এই বৃহৎ নিয়োগ কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-ও বিষয়টি নিয়ে নীরব রয়েছে। ফল প্রকাশের পর থেকে মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট বার্তা দেয়নি সংস্থাটি। এছাড়া, বর্তমানে এনটিআরসিএ-তে নিয়মিত চেয়ারম্যান না থাকায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের ভাইভা কবে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানাতে পারছেন না কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে পরীক্ষায় কী ধরনের অনিয়ম বা জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে, অভিযোগের ভিত্তি কী এবং তদন্ত কত দূর এগিয়েছে— এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেরও সুনির্দিষ্ট উত্তর মিলছে না। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে প্রার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ দেওয়া হতো। এতে প্রায়ই স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠত। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে এনটিআরসিএ-র অধীনে এনে কেন্দ্রীয়ভাবে পরীক্ষা নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার
জানা গেছে, দেশের বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগে কেন্দ্রীয় পরীক্ষা চালুর উদ্যোগটি ছিল শিক্ষা খাতে একটি বড় নীতিগত পরিবর্তন। স্বাধীনতার পর থেকে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে এসব পদে নিয়োগ দিয়ে আসছিল সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি বা গভর্নিং বডি। ফলে বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, আর্থিক লেনদেন এবং যোগ্যতার পরিবর্তে পছন্দের প্রার্থী নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ ও সুপার নিয়োগকে কেন্দ্র করে অসংখ্য অভিযোগ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অনেক আগেই এনটিআরসিএর মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে নিবন্ধন পরীক্ষা ও গণবিজ্ঞপ্তিভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করা হয়। বর্তমানে শিক্ষক নিয়োগের প্রায় পুরো প্রক্রিয়াই কেন্দ্রীয়ভাবে সম্পন্ন হলেও প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগের ক্ষমতা পরিচালনা কমিটির হাতেই ছিল। ফলে নিয়োগ ব্যবস্থায় একটি দ্বৈত কাঠামো তৈরি হয়েছিল, যা অনেক ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্বের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এ পরিস্থিতিতে প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগকে এনটিআরসিএর আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সংশ্লিষ্টদের আশা ছিল, এর মাধ্যমে দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে এবং দীর্ঘদিনের বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।
প্রথম বিজ্ঞপ্তিতে ন্যূনতম ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হলেও পরবর্তীতে নীতিমালায় সংশোধন এনে তা ১৮ বছর বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলে প্রথম বিজ্ঞপ্তি বাতিল করে ২৬ মার্চের নতুন বিজ্ঞপ্তিতে ১২,৯৫১টি শূন্যপদের বিপরীতে পরীক্ষা নেওয়া হয়, যেখানে ৪৮,১৪৬ জন অংশ নিয়ে ১৪,৯৪২ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হন
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সুপার ও সহকারী সুপারসহ এসব পদে নিয়োগ এনটিআরসিএর মাধ্যমে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
পরে চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো এসব পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এনটিআরসিএ। ওই বিজ্ঞপ্তিতে ১৩ হাজার ৫৯৯টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন আহ্বান করা হয়। সে সময় প্রধান শিক্ষক পদে আবেদনের জন্য ন্যূনতম ১৫ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে, প্রথম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর গত ১০ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় বড় ধরনের সংশোধন আনে। নতুন সরকারের পরিপত্র অনুযায়ী স্কুল ও কলেজের শীর্ষ পদ— অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে আবেদনের জন্য ন্যূনতম ১৮ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়।
অভিজ্ঞতার এই নতুন শর্তের কারণে আগের বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করা অনেক প্রার্থী অযোগ্য হয়ে পড়েন। ফলে জানুয়ারিতে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি বাতিল করতে বাধ্য হয় এনটিআরসিএ। পরবর্তীতে সংশোধিত যোগ্যতার ভিত্তিতে গত ২৫ মার্চ ‘৮ম এনটিআরসিএ নিয়োগ পরীক্ষা-২০২৬’-এর নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। নতুন বিজ্ঞপ্তিতে শূন্য পদের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় ১২ হাজার ৯৫১টি। এ বিজ্ঞপ্তির আওতায় ২৮ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত নতুন করে আবেদন গ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে আগের বিজ্ঞপ্তির কারণে অযোগ্য হয়ে পড়া প্রার্থীদের আবেদন ফি ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়।

এনটিআরসিএর তথ্য অনুযায়ী, ১২ হাজার ৯৫১টি শূন্য পদের বিপরীতে মোট ৫৩ হাজার ৬৯ জন প্রার্থী আবেদন করেন। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানে ৭ হাজার ৯০৮টি, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের ১১২টি এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে ৩ হাজার ১৩১টি পদ ছিল। আবেদনকারীদের মধ্যে পুরুষ প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৪৭ হাজার ৩৫১ জন এবং নারী প্রার্থী ছিলেন ৫ হাজার ৭১৮ জন।
পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন এবং ২২ এপ্রিল ফল প্রকাশ হওয়ার প্রায় দেড় মাস পর হঠাৎ অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। শিক্ষামন্ত্রী জানান, অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে জালিয়াতির সত্যতা মিললে পুরো পরীক্ষাটি বাতিল করে পুনরায় নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়ায় প্রার্থীদের মাঝে চরম উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে
সবশেষ গত ১৮ এপ্রিল ঢাকার নয়টি কেন্দ্রে চারটি গ্রুপে এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য এনটিআরসিএ কার্যালয়ে একটি বিশেষ কন্ট্রোল রুমও স্থাপন করা হয়েছিল। পরীক্ষার আগে এনটিআরসিএ’র তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম একাধিকবার বলেছিলেন, এটি শুধু একটি নিয়োগ কার্যক্রম নয়, বরং একটি বড় কর্মযজ্ঞ। নিয়োগে কোনো ধরনের প্রভাব, সুপারিশ বা অনিয়মের সুযোগ থাকবে না বলেও তিনি দাবি করেছিলেন। এমনকি জুন মাসের মধ্যেই পুরো নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করার আশাবাদও ব্যক্ত করেছিলেন তিনি।
পরীক্ষার চার দিনের মাথায়, ২২ এপ্রিল ফল প্রকাশ করা হয়। এনটিআরসিএর তথ্যমতে, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪৮ হাজার ১৪৬ জনের মধ্যে ১৪ হাজার ৯৪২ জন উত্তীর্ণ হন। ফল প্রকাশের সময় জানানো হয়েছিল, উত্তীর্ণদের মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি পরবর্তীতে ঘোষণা করা হবে। কিন্তু ফল প্রকাশের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনও ভাইভার কোনো সূচি প্রকাশ করা হয়নি।
এমন অবস্থায় সম্প্রতি শিক্ষা এবং প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে জানান, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে পুরো পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা হবে।
মন্ত্রীর এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরপরই দেশজুড়ে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। কারণ, দীর্ঘ প্রস্তুতি, আবেদন প্রক্রিয়া, লিখিত পরীক্ষা এবং ফল প্রকাশের ধাপ পেরিয়ে তারা এখন মৌখিক পরীক্ষার অপেক্ষায় রয়েছেন। এমন অবস্থায় পুরো পরীক্ষা বাতিলের সম্ভাবনার কথা সামনে আসায় অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
ফল প্রকাশের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও উত্তীর্ণদের মৌখিক পরীক্ষার কোনো সময়সূচি দেয়নি এনটিআরসিএ। নতুন চেয়ারম্যান প্রেষণে নিয়োগ পেলেও এখনও দায়িত্ব গ্রহণ না করায় সংস্থাটিতে এক ধরনের প্রশাসনিক শূন্যতা ও সিদ্ধান্তহীনতা চলছে, যার ফলে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটি বর্তমানে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক উত্তীর্ণ প্রার্থী ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা সরকার নির্ধারিত নিয়ম ও যোগ্যতার ভিত্তিতে আবেদন করেছি এবং কঠোর প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছি। এই নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে শুরু থেকেই নানা জটিলতা ছিল। প্রথম বিজ্ঞপ্তি বাতিল, যোগ্যতার শর্ত পরিবর্তন, নতুন করে আবেদন গ্রহণ এবং পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণসহ সবকিছু মিলিয়ে দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এরপর লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ফল প্রকাশের পর আশা করেছিলাম, নিয়োগ কার্যক্রম দ্রুত শেষ হবে। কিন্তু এখন আবার পরীক্ষা বাতিলের সম্ভাবনার কথা শুনে হতাশ হয়ে পড়েছি।
ময়মনসিংহ বিভাগের একজন উত্তীর্ণ প্রার্থী বলেন, এই পরীক্ষার জন্য আমি চাকরির পাশাপাশি নিয়মিত পড়াশোনা করেছি। পরীক্ষা দিতে জেলা শহর থেকে ঢাকায় আসতে হয়েছে, থাকা-খাওয়ার খরচ হয়েছে। এখন যদি আবার শুরু থেকে পুরো প্রক্রিয়া করতে হয়, তাহলে সেটা আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর হবে।
রাজশাহীর আরেকজন প্রার্থী বলেন, ফল প্রকাশের আগে বা পরীক্ষার পরপরই যদি কোনো অনিয়মের তথ্য পাওয়া যেত, তাহলে সেটি যাচাই করা যেত। কিন্তু ফল প্রকাশের দেড় মাস পর এসে পুরো পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় আমরা হতবাক। এতে শুধু নিয়োগ প্রক্রিয়াই নয়, পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
কেউ কেউ আবার অভিযোগের প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের প্রশ্ন, কী ধরনের জালিয়াতি বা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, কতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে এবং তদন্ত কোন পর্যায়ে আছে— এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে গুঞ্জন ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।
প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে শিক্ষামন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। পরে এ বিষয়ে জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের হোয়াটসঅ্যাপে পাঁচটি প্রশ্ন পাঠানো হয়। তবে, প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সেসব প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি
আরেক উত্তীর্ণ প্রার্থী বলেন, যদি কেউ অসদুপায় অবলম্বন করে থাকে, তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু কয়েকজনের সম্ভাব্য অপরাধের দায়ে হাজার হাজার সৎ ও মেধাবী প্রার্থীকে আবার পরীক্ষার মুখোমুখি করা কতটা ন্যায়সঙ্গত হবে, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
জালিয়াতির বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানায়নি সরকার, সিদ্ধান্তহীনতায় এনটিআরসিএ
প্রথমবারের মতো আয়োজিত বড় নিয়োগ পরীক্ষায় কী ধরনের অনিয়ম বা জালিয়াতি হয়েছে, সে বিষয়ে এখনও সরকারের উচ্চপর্যায় কিংবা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, জালিয়াতির ধরন কিংবা সরকারের চলমান তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তারা কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনটিআরসিএর কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, পরীক্ষায় কী ধরনের জালিয়াতি হয়েছে বা কোন প্রক্রিয়ায় তদন্ত চলছে— এ বিষয়ে তাদের কাছেও বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই।
এদিকে, প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগসংক্রান্ত ভাইভা কবে অনুষ্ঠিত হবে এ বিষয়ে এনটিআরসিএর সচিব এ এম এম রিজওয়ানুল হক সম্প্রতি ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছেন, মৌখিক পরীক্ষার বিষয়ে এখনও কোনো নতুন অগ্রগতি নেই। এছাড়া, নিয়মিত চেয়ারম্যান না থাকায় এনটিআরসিএর প্রশাসনিক কার্যক্রমেও কিছুটা সিদ্ধান্তহীন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গত ২৬ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রেষণ-১ শাখার এক প্রজ্ঞাপনে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রাজা মো. আব্দুল হাইকে এনটিআরসিএর নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাজা মো. আব্দুল হাইকে বদলিপূর্বক প্রেষণে এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান পদে পদায়ন করা হয়েছে। জনস্বার্থে জারিকৃত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। তবে, নতুন চেয়ারম্যান এখনও দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির দৈনন্দিন প্রশাসনিক ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত কার্যক্রমে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় পরীক্ষা মূল্যায়ন ও প্রত্যয়ন সদস্য মুহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এসব বিষয়ে বক্তব্য নিতে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা চেয়ারম্যান মুহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকীর সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

ত্রুটি প্রমাণিত হলে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করা হবে: শিক্ষামন্ত্রী
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রধান শিক্ষক-অধ্যক্ষ নিয়োগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ নিয়োগ পরীক্ষার বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে ত্রুটির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কোনো ধরনের ত্রুটি প্রমাণিত হলে পুরো পরীক্ষাই বাতিল করা হবে।
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে প্রধান শিক্ষক নিয়োগে ব্যবস্থাপনা কমিটির কোনো ভূমিকা নেই। আগে যেভাবে ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হতো, এখন সেই সুযোগ নেই। সরকার সরাসরি পরীক্ষা নিয়ে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জেলা প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে।
ড. মিলন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব ছাড়ার আগে তড়িঘড়ি করে ১৪ হাজার ৫০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। এই নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলো তদন্ত করা হয়েছে। কোথাও অভিযোগের সত্যতা মিলেছে, কোথাও মেলেনি। ডিসিদের মাধ্যমে ভাইভা নেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে শেষ পর্যন্ত নিয়োগপ্রাপ্তদের বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে, তাদের জন্য দুই বছরের পর্যবেক্ষণকাল (প্রভিশন) থাকবে।
তিনি বলেন, ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম শতভাগ প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রশ্ন হলো, এত দ্রুত নিয়োগ দেওয়ার প্রয়োজন কী ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি জানা থাকলেও তারা বিষয়টি পরবর্তী সরকারের জন্য রেখে যায়নি। দ্রুত সাক্ষাৎকার নিয়ে নিয়োগ সম্পন্ন করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে, প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে শিক্ষামন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। পরে এ বিষয়ে জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের হোয়াটসঅ্যাপে পাঁচটি প্রশ্ন পাঠানো হয়। তবে, প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সেসব প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এছাড়া, মঙ্গলবার (২ জুন) শিক্ষামন্ত্রীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বৈঠকে রয়েছেন বলে জানানো হয়। ফলে অভিযোগের প্রকৃতি, তদন্তের অগ্রগতি এবং পরীক্ষা বাতিলের সম্ভাবনা সম্পর্কে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।