আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার বাড়ানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। একই সঙ্গে বড় আকারের বাজেট, রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং করব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে চলছে আলোচনা।
তবে শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই বিনিয়োগ বাড়বে না, এজন্য প্রয়োজন সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসাবান্ধব প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ—এমনটিই মনে করছেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হলে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান থাকতে হবে। পাশাপাশি করনীতির সরলীকরণ এবং বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রণয়নও জরুরি।
আসন্ন বাজেট, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, করব্যবস্থার সংস্কার এবং অর্থনীতির সামগ্রিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন ড. জাহিদ হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাঈদ শিপন।
জাগো নিউজ : আগামী অর্থবছরে সরকার বিনিয়োগ বাড়িয়ে জিডিপির ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে কী ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন? প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো কী?
জাহিদ হোসেন : শুধু বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না। বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত পরিবেশও তৈরি করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর তারা আস্থা রাখতে পারছেন কি না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি যদি দীর্ঘদিন থাকে, ব্যাংকিং খাত যদি দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকে, আর বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে যদি অনিশ্চয়তা থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই দ্বিধায় থাকবেন।
বিশেষ করে বিনিময় হার নির্ধারণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ থাকবে কি না, সেটি পরিষ্কার হতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাত সংস্কার এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের কর্মপরিকল্পনা কী, সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
আমার মতে, সাড়ে সাত থেকে আট লাখ কোটি টাকার মতো একটি বাজেট তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত হতে পারতো। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী
দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ করতে গিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের কাজ করতে হয়, সেগুলোর জটিলতা কমাতে হবে। বন্দরে জট আছে, রাস্তাঘাটে জট আছে। একটি কোম্পানি নিবন্ধনের জন্য আবেদন করলে অনেক ক্ষেত্রে ছয়-সাত মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। জমির রেজিস্ট্রেশন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, শ্রম আইন প্রতিপালনসহ বিভিন্ন অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। এতে সময় যেমন নষ্ট হয়, তেমনই খরচও বাড়ে। এই ঝামেলা এড়াতেই অনেক সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
এখন সরকার ডিরেগুলেশনের (নিয়ন্ত্রণমুক্ত) কথা বলছে। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ সংস্কার হবে, কীভাবে বিনিয়োগকারীদের পথ সহজ করা হবে, সেটা পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে।
তৃতীয়ত, নীতির ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীরা জানতে চান, আজ যে নীতি ঘোষণা করা হচ্ছে, এক বছর পরও সেটি থাকবে কি না। নীতি পরিবর্তন হলে কোন ভিত্তিতে হবে, সেটাও স্পষ্ট থাকা দরকার।
উদাহরণ হিসেবে জ্বালানি তেলের দাম বলা যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশেও দাম বাড়তে পারে—এটি সবাই বোঝে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের নিয়ম বা সূত্রটি যদি স্পষ্ট থাকে, তাহলে অনিশ্চয়তা কমে। অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। নীতির এই বিশ্বাসযোগ্যতাকেই আমরা ‘ক্রেডিবিলিটি’ বলি।
জাগো নিউজ : ব্যবসায়ীরা বলছেন মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বিনিয়োগে বড় প্রতিবন্ধকতা। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
জাহিদ হোসেন : অবশ্যই এগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু ইরান-ইসরায়েল সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মতো বিষয়গুলোর ওপর বাংলাদেশের সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বিনিয়োগকারীরাও সেটা বোঝেন। এগুলো তো শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সব দেশের জন্যই প্রযোজ্য।
বাস্তবতা হলো, এ ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যেই ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যেতে হয়। ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও এমন যে—না পুরোপুরি যুদ্ধ, না পুরোপুরি শান্তি। এই বাস্তবতার মধ্যেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলবে। তাই সরকারের কাজ হলো অভ্যন্তরীণ নীতিগত পরিবেশকে যতটা সম্ভব স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য করা।
জাগো নিউজ : জিডিপির অনুপাতে মোট বিনিয়োগের হার ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?
জাহিদ হোসেন : এটিকে আমি একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বলবো। বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এত অল্প সময়ে বিনিয়োগের হার এতটা বাড়ানো কঠিন। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যার মধ্যে এক লাফে এমন অর্জন বাস্তবসম্মত নয়।
তবে সরকার যদি সামষ্টিক অর্থনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নীতিগত স্বচ্ছতার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে ফিরে আসবেন। হয়তো এক বছরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না, কিন্তু অন্তত বিনিয়োগকে আবার প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বাজেটের আকার এমন হতে হবে, যা বাস্তবে অর্থায়ন করা সম্ভব। অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে না পারলে বড় বাজেটের কোনো অর্থ নেই। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যও বাস্তবসম্মত হতে হবে
জাগো নিউজ : বাংলাদেশের করব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে পরোক্ষ করনির্ভর। এটি কি একটি উদ্বেগের বিষয়?
জাহিদ হোসেন : এটি নিয়ে অনেকদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে। প্রত্যক্ষ কর, বিশেষ করে আয়কর ও সম্পদ করের অবদান বাড়ানোর কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে। আয়করের আওতা বাড়াতে হবে, করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং কর পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে করপোরেট করের ক্ষেত্রে অনেক ধরনের হার রয়েছে। টেলিযোগাযোগ খাতের জন্য এক হার, ব্যাংকের জন্য আরেক হার, তামাক খাতের জন্য আরেক হার, তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য আরেক হার। আবার কৃষি বা মৎস্যভিত্তিক শিল্পের জন্য বিশেষ সুবিধাও আছে।
এ জটিল কাঠামোর সুযোগ নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান বৈধ উপায়েই কর কমিয়ে ফেলতে পারে। আইন ভঙ্গ না করেও তারা করের বোঝা কমানোর সুযোগ পায়। ফলে রাজস্ব হারায় সরকার, আবার দুর্নীতির সুযোগও তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে দর-কষাকষির মাধ্যমে কর নিষ্পত্তির সংস্কৃতিও গড়ে ওঠে।
তাই করনীতির কাঠামো সহজ করা জরুরি। করহার পুরোপুরি এক করে ফেলা বাস্তবসম্মত নয়, সেটি কিছুটা আদর্শবাদী চিন্তা হবে। তবে বর্তমানের মতো এত বেশি বৈচিত্র্যও থাকা উচিত নয়। হারগুলোর সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে এবং কাঠামোকে সহজ করতে হবে।
জাগো নিউজ : তাহলে কি আপনি মনে করেন সব খাতের জন্য একই করপোরেট করহার হওয়া উচিত?
জাহিদ হোসেন : না, আমি তা বলছি না। একেবারে একক করহার বাস্তবসম্মত নয়। বিভিন্ন খাতের বাস্তবতা ভিন্ন। তবে বর্তমানের মতো অসংখ্য করহারও গ্রহণযোগ্য নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত করহারের সংখ্যা কমিয়ে কাঠামোকে সহজ ও স্বচ্ছ করা।
জাগো নিউজ : প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের মধ্যে আদর্শ অনুপাত কী হওয়া উচিত?
জাহিদ হোসেন: এর কোনো নির্দিষ্ট বা সর্বজনীন আদর্শ অনুপাত নেই। দেশভেদে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলো সাধারণত পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভরশীল। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরোক্ষ করের মধ্যেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যভিত্তিক করের অংশ অনেক বেশি। এটি শিল্পায়ন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
তাই ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যভিত্তিক করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভ্যাটভিত্তিক রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মোট কর আয়ে প্রত্যক্ষ করের অবদানও বাড়ানো উচিত।
জাগো নিউজ : সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি কতোটা বাস্তবায়নযোগ্য হবে বলে আপনি মনে করেন?
জাহিদ হোসেন : বাজেটের আকার এমন হতে হবে, যা বাস্তবে অর্থায়ন করা সম্ভব। অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে না পারলে বড় বাজেটের কোনো অর্থ নেই। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যও বাস্তবসম্মত হতে হবে। আমরা অতীতে যে পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহ করেছি, তার সঙ্গে তুলনা করলে হঠাৎ করে বিশাল লাফ দেওয়া সহজ নয়।
অনিশ্চয়তার মধ্যেই ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যেতে হয়। ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও এমন যে—না পুরোপুরি যুদ্ধ, না পুরোপুরি শান্তি। এই বাস্তবতার মধ্যেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলবে
কিছু নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে—উপজেলা পর্যায়ে প্যাকেজ ভ্যাট চালু করা, মোটরসাইকেলের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপ, অনলাইনে সেবা দেওয়া ফ্রিল্যান্সারদের ওপর কর আরোপ ইত্যাদি। এগুলো করজাল কিছুটা সম্প্রসারণ করতে পারে, কিন্তু এখান থেকে খুব বড় অঙ্কের রাজস্ব আসবে বলে মনে হয় না।
অন্যদিকে, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি আনতে হলে আয়কর, ভ্যাট এবং শুল্ক ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু এসব সংস্কারের সুফল এক বছরের মধ্যে পাওয়া যায় না। আমার মতে, সাড়ে সাত থেকে আট লাখ কোটি টাকার মতো একটি বাজেট তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত হতে পারতো। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী।
জাগো নিউজ : তাহলে আপনার পরামর্শ কী? বাজেট কেমন হওয়া উচিত?
জাহিদ হোসেন: বাজেট অবশ্যই বাস্তবায়নযোগ্য হতে হবে এবং অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে রয়েছে, ব্যাংকিং খাত নানান সমস্যায় জর্জরিত, আর বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের মতো হলেও সেটিকে খুব বেশি স্বস্তিদায়ক বলা যাবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য ও জ্বালানির দাম বাড়লে আবার চাপ তৈরি হতে পারে।
এ অবস্থায় অতিরিক্ত বড় বাজেট ঘাটতি তৈরি হলে সুদের হার, মূল্যস্ফীতি এবং বিনিময় হারের ওপর আরও চাপ পড়বে। তাই বাজেট এমন হওয়া উচিত—যা একদিকে বাস্তবায়নযোগ্য এবং অন্যদিকে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নষ্ট না করে প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করে।