বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন দিঘিতে থাকা সর্বশেষ কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কুমিরটিকে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে রাখা হবে বলে জানা গেছে। বুধবার (৩ জুন) সকালে বন বিভাগের সহায়তায় কুমিরটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
এর আগে সোমবার রাতে মাজারসংলগ্ন দিঘির পাড় থেকে ফাতেমা নামের আট বছর বয়সী এক শিশুকে টেনে নিয়ে যায় কুমিরটি। পরদিন ভোরে দিঘিতে ভেসে ওঠে তার মরদেহ। এরও আগে গত এপ্রিলে একটি কুকুরকে টেনে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পর লোকালয়ের দিঘি থেকে কুমির সরিয়ে নেওয়ার দাবি জোরালো হয়। তবে অনেকে মাজারের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে কুমিরটিকে সেখানে রাখার পক্ষেও মত দেন। যদিও বর্তমান কুমিরটি খানজাহান আলীর সময়ের কালাপাহাড়-ধলাপাহাড়ের বংশধর নয়।
খাঞ্জেলি দিঘি নামের ইতিহাস
খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন দিঘিটি স্থানীয়ভাবে ‘খাঞ্জেলি দিঘি’ নামে পরিচিত। তবে এর কেতাবি নাম ‘ঠাকুরদিঘি’। এই নামকরণ নিয়ে নানা লোকগাঁথা প্রচলিত আছে।
কেউ বলেন, দিঘি খননের সময় বুদ্ধ ঠাকুরের মূর্তি পাওয়ায় এর নাম হয় ‘ঠাকুরদিঘি’। আবার কারও মতে, স্থানীয় হিন্দুরা খানজাহান আলীকে শ্রদ্ধাভরে ‘ঠাকুর’ বলে সম্বোধন করতেন বলেই এমন নামকরণ। আরেকটি মত অনুযায়ী, খানজাহান আলীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু পীর আলী মোহাম্মদ তাহেরকে তিনি স্নেহ করে ‘ঠাকুর’ বলে ডাকতেন। তার স্মৃতিতেই দিঘির নাম রাখা হয় ‘ঠাকুরদিঘি’।
খলিফতাবাদ নগর ও ঠাকুরদিঘি
ইতিহাস থেকে জানা যায়, সুলতানি আমলে ১৪ শতকের প্রথম দিকে হযরত খানজাহান আলী (রহ.) বাগেরহাটে খলিফতাবাদ নগর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। জনশ্রুতি আছে, মানবকল্যাণে তিনি বারোবাজার থেকে শুরু করে সমগ্র ভাটি অঞ্চলে ৩৬০টি মসজিদ নির্মাণ এবং ৩৬০টি দিঘি খনন করেছিলেন।
নোনা পানির এ অঞ্চলে মানুষের পানীয় জলের চাহিদা পূরণে এসব দিঘি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে ঠাকুরদিঘিই সবচেয়ে বড় বলে পরিচিত।
কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়
স্থানীয়দের বিশ্বাস, নিজের শাসনামলে খানজাহান আলী (রহ.) এই দিঘিতে ‘কালাপাহাড়’ ও ‘ধলাপাহাড়’ নামে দুটি মিঠাপানির কুমির অবমুক্ত করেছিলেন। তিনি নিজেও নিয়মিত তাদের খাবার দিতেন। যদিও এই কুমির ছাড়া নিয়েও নানা কিংবদন্তিও প্রচলিত রয়েছে।
খানজাহান আলীর মৃত্যুর পর তাকে এই দিঘির পাড়েই সমাহিত করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার মাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠে ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। একইসঙ্গে দিঘিতে বেড়ে ওঠে কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়ের বংশধরেরা।
ধীরে ধীরে কুমিরগুলো মাজারকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কুমির মানুষের প্রতি তুলনামূলকভাবে শান্ত আচরণ করত। ফলে তাদের ঘিরে তৈরি হয় নানা কিংবদন্তি ও বিশ্বাস।
মানত, বিশ্বাস ও কুমির
খানজাহান আলীর স্মৃতির সঙ্গে কুমিরের সম্পর্ক থাকায় ভক্তদের মধ্যে এগুলোকে ঘিরে বিশেষ আস্থা তৈরি হয়। অনেকেই নিজেদের মনোবাসনা পূরণের আশায় কুমিরের নামে মানত করতেন। হাঁস, মুরগি, খাসি কিংবা গরু মানত দেওয়ার রেওয়াজও গড়ে ওঠে।
মাজারের খাদেমদের বসবাসও দিঘির আশপাশে। তাদের অনেকে দিঘির সঙ্গে সংযুক্ত ছোট পুকুর খনন করেন। কুমির এসব পুকুরে এলে ভক্তরা সেখানে ভিড় করতেন। কুমিরের সামনে মানতের জিনিস উপস্থাপন করাকে অনেকেই মানত পূরণের প্রতীক হিসেবে মনে করতেন। পরে সেই মানতের জিনিস খাদেমদের দখলে চলে যেত।
এভাবে কুমির শুধু একটি প্রাণী নয়, বরং স্থানীয় সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও অংশ হয়ে ওঠে।
কালাপাহাড়-ধলাপাহাড় বিলুপ্তি
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিঘির বড় মাছ ধরতে কিছু অসাধু ব্যক্তি গোপনে ফাঁসজাল পাততেন। এসব জালে আটকে বিভিন্ন সময়ে কুমির মারা গেছে। এছাড়া প্রজনন হার কমে যাওয়া এবং নানা কারণে মৃত্যুর ফলে একসময় মিঠাপানির এই কুমিরগুলো বিলুপ্তির মুখে পড়ে।
অবশেষে প্রায় ছয়শ বছর ধরে টিকে থাকা কালাপাহাড়-ধলাপাহাড়ের শেষ বংশধর কুমিরটি ২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মারা যায়।
নতুন কুমির, নতুন বাস্তবতা
তবে তারও আগে, ২০০৫ সালে মাজারের ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকার ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ফার্ম থেকে ছয়টি মিঠাপানির কুমির এনে এই দিঘিতে অবমুক্ত করে।
কিন্তু নতুন কুমিরগুলো পুরোনো কালাপাহাড়-ধলাপাহাড়ের মতো ছিল না। সেগুলো ছিল তুলনামূলক বেশি হিংস্র। ফলে দিঘিতে মানুষের অবাধ যাতায়াত সীমিত করা হয়।
২০০৬ সালে নতুন আনা কুমিরের আক্রমণে এক নারীর মৃত্যু হয়। পরে ধীরে ধীরে কুমিরগুলোও স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। সময়ের সঙ্গে ভক্তদের কাছে তারাও ‘কালাপাহাড়-ধলাপাহাড়’ নামেই পরিচিতি পায়।
এক এক করে মারা যায় ছয়টির মধ্যে পাঁচটি কুমির। সর্বশেষ ২০২৩ সালের অক্টোবরে মারা যায় একটি পুরুষ কুমির। এরপর বেঁচে ছিল শুধু ‘পিলপিল’ নামের একটি স্ত্রী কুমির।
বুধবার সেই পিলপিলকেও সরিয়ে নেওয়া হলো খাঞ্জেলি দিঘি থেকে। এর মধ্য দিয়ে প্রায় সাত শতক ধরে মাজার, দিঘি ও কুমিরকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো।