জোর করে বৃদ্ধের চুল কেটে দিচ্ছেন তিনজন। তাদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। শেষ পর্যন্ত শক্তি-সামর্থে তরুণদের সঙ্গে পেরে ওঠেননি বৃদ্ধ। আক্ষেপ করে বলছেন, ‘আল্লাহ, তুই দেহিস।’
গত বছর কোরবানির ঈদের আগে হালিম উদ্দিন আকন্দের প্রতি এই নিপীড়নের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ালে ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরে ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর থেমে থাকলেও আবার তৎপর এই চুল কাটা চক্রের সদস্যরা।
ময়মনসিংহের তারাকান্দার কাশিগঞ্জের কোদালিয়া এলাকার আপন পাড়ার বাসিন্দা হালিম উদ্দিন আকন্দের চুল কেটে দিয়েছিল ‘হিউম্যান সার্ভিস বাংলাদেশ’ নামে ফেসবুক পেজের সদস্যরা। তারা ছিন্নমূল মানুষের চুল কেটে, সেই দৃশ্য ভিডিও করে ফেসবুক ও ইউটিউবে দেয়। মূলত ভিউ থেকে ডলার কামানোর জন্য এসব ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছাড়া হয়।
‘হিউম্যান সার্ভিস বাংলাদেশ’ পেজ পরিচালনা করেন মাওলানা সোহরাব হোসাইন। ময়মনসিংহের ঘটনার পরে স্ট্রিমকে তিনি বলেছিলেন, ‘যে মানুষ অপরিচ্ছন্ন থাকে, কোনো দিন গোসল করে না, ময়লা খায়, তাঁকে একটু পরিচ্ছন্ন করে পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে আমাদের খুব ভালো লাগত। মামলা হয়েছে, আমরা বুঝতে পেরেছি এটি খারাপ কাজ। আমরা আর করব না।’
কিন্তু ‘কথা রাখেননি’ মাওলানা সোহরাব। সম্প্রতি ‘হিউম্যান সার্ভিস বাংলাদেশ’ পেজে আবার জোর করে চুল কাটা এবং সে সবের প্রচার করা হচ্ছে। জানতে চাইলে পেজের অ্যাডমিন জানান, তারা এসব করছেন না। এ ব্যাপারে মাওলানা সোহরাব হোসাইন স্ট্রিমকে জানান, এই ধরনের কোনো কাজ তারা করছেন না। পেজে নতুন করে ভিডিও দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে পেজটি পরিচালনা করছেন ভিডিও এডিটর। তিনি হয়ত পুরাতন ভিডিও দিয়েছেন। আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’
অবশ্য পেজটি ঘুরে দেখা যায়, ময়মনসিংহের ঘটনায় মামলার পর এই ধরনের কোনো ভিডিও দেওয়া হয়নি। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ঢাকা-১৩ আসনে ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের পক্ষে প্রচার চালানো হয়েছে।
বসে নেই অন্যরা
রাজধানীর পোস্তগোলা মহাশ্মশানে লাশ সৎকারের পাশাপাশি সদরঘাট এলাকায় ফল বিক্রি করেন লিটন সাধু। আধ্যাত্মিক ভাবনা থেকে দীর্ঘদিন চুল–দাড়ি লম্বা রাখেন তিনি। দুই হাত ভর্তি ধাতব বালা। ব্যতিক্রমী বেশভূষার কারণে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ছিলেন তিনি। ‘মানব কল্যাণ’–এর নামে কয়েক তরুণ জোর করে তাঁর চুল কেটে দেন। আপত্তি জানিয়েও রেহাই পাননি লিটন। পুরো ঘটনা ভিডিও করে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ফেসবুকে।
ওই ভিডিও সূত্রে সামনে আসে মাহবুবুর রহমান সরকারের নাম। পড়াশোনার পাশাপাশি কন্টেন্ট তৈরি করেন তিনি। মাহবুবুর রহমানের ফেসবুক পেজ ‘মাহবুব ক্রিয়েশন ফোর’–এর অনুসারী ৩৭ লাখের বেশি। এই পেজে আপলোড করা অসংখ্য ভিডিওতে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে তিনি ভাসমান ও অসহায় মানুষদের চুল–দাড়ি কেটে গোসল করান, খাবার দেন।
মাহবুবুর রহমানের উপস্থাপনা মানবিক মনে হলেও, ভিডিও বানানোর জন্য কারও সম্মতি না নিয়ে জোর করে চুল কেটে দেন তিনি। আর এসব ভিডিওর ভিউ থেকে কামিয়ে নেন ডলার।
হিউম্যান সার্ভিস, মাহবুব ক্রিয়েশনের মতো মোহাম্মদ কামরুজ্জামান রিয়াজও একই কাজ করছেন। ‘কেএম রিয়াজ’ নামে ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে জোর করে চুল কেটে দেওয়ার মানবিক গল্পের ভিডিও প্রচার করছেন তিনি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলেছে, জোর করে চুল কেটে দেওয়া কেবল ভুক্তভোগীর মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার লঙ্ঘন নয়, বরং এটি তাঁর মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। এ ধরনের ঘটনা সমাজে ভীতি, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করছে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, এই ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে আইনের শাসন ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে আর কোনো নাগরিক এমন অবমাননাকর ও বেআইনি আচরণের শিকার যাতে না হন, রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া স্ট্রিমকে বলেন, ‘এসব কাজ অন্যের বিশ্বাসের ওপরে আঘাত করা, যেটি আমাদের সংবিধান অনুমোদন করে না। রাষ্ট্রের এখতিয়ার নাই কারও বিশ্বাস, কারও জীবনযাপন পদ্ধতি, চালচলন, কোনো কিছুর ওপরে হস্তক্ষেপ করার। রাষ্ট্রই যেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারে না, সেখানে একটি গ্রুপ শালীনতার নামে বা সুস্থ পথে আনার নামে চুল কেটে ব্যক্তির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। এরা কিন্তু কোনো রকম দায়িত্ব নিচ্ছে না, তাদের পুর্নবাসন করছে না।’
এসব ঘটনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায় দেখছেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘আমাদের এতগুলো এজেন্সি, তাদের নজরে কেন আসছে না? এটা তো ফৌজদারি অপরাধ, মানবাধিকারের প্রশ্ন। এই ফৌজদারি অপরাধের জন্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ভারপ্রাপ্ত প্রধান উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আলি আকবর খান স্ট্রিমকে বলেন, সরাসরি কোনো ঘটনার তদন্ত করার এখতিয়ার সিআইডির নেই। থানা পুলিশ হয়ে যে মামলাগুলো আসে, আমরা সেগুলো তদন্ত করি। ফলে আমরা এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারছি না।