মৌলবাদ কেবল আদর্শগত বা ধর্মীয় বিষয় নয়, এর একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক ভিত্তি রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত। আজ থেকে ১১ বছর আগে তিনি তাঁর ‘বাংলাদেশে মৌলবাদ ও মৌলবাদী জঙ্গিত্বের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ শীর্ষক গবেষণায় এমন যুক্তি তুলে ধরেছিলেন।
সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক নিয়ে নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আবার আলোচনায় এসেছে আবুল বারকাতের গবেষণাটি। বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও ‘মৌলবাদের’ উত্থান নিয়ে গবেষণার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ইসলামী ব্যাংক সংশ্লিষ্ট তাঁর গবেষণাপত্রটি ২০১৫ সালের ১ জুন বাংলাদেশ জার্নাল অব পলিটিক্যাল ইকনোমিতে প্রকাশিত হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিগুলো রাজনৈতিক সংগঠনের সমান্তরাল একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। এই কাঠামো তাদের প্রভাব বিস্তার ও টিকে থাকার প্রধান শক্তি।
আবুল বারকাত একে ‘মৌলবাদের অর্থনীতি’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এই অর্থনীতি শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, সংগঠন পরিচালনা, মতাদর্শ প্রচার এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ এই অর্থনীতি।
গবেষণাপত্রে বারকাত ধর্ম, ধর্মবিশ্বাস এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে পার্থক্য করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তিনি যুক্তি দেন, ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে দেখা এবং ধর্মকে রাজনৈতিক আদর্শে রূপান্তর করা এক বিষয় নয়। তাঁর মতে, মৌলবাদ তখনই জন্ম নেয় যখন ধর্মকে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মৌলবাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি বিশ্লেষণ। বারকাতের মতে, বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বিমা, এনজিও, ব্যবসা-বাণিজ্য, হাসপাতাল, দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এই নেটওয়ার্ক থেকে অর্জিত অর্থ আবার সংগঠন সম্প্রসারণ, কর্মী গঠন, মতাদর্শ প্রচার এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ অর্থনীতি ও রাজনীতি এখানে একে অপরকে শক্তিশালী করে।
গবেষণাপত্রে তিনি ইসলামী ব্যাংককে এই ধর্মভিত্তিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে দাবি করেছেন। তাঁর মতে, জামায়াত-ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়, একটি বৃহত্তর মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ।
বারকাতের দাবি, মৌলবাদের উত্থানের পেছনে ধর্মীয় কারণের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণও কাজ করে। যখন বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, গণতান্ত্রিক চর্চা দুর্বল হয়, মানুষের মধ্যে বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তা বাড়ে, তখন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির জন্য নতুন সমর্থক সংগ্রহ সহজ হয়ে ওঠে। তিনি মনে করেন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা মৌলবাদী রাজনীতির জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে।
গবেষণাপত্রে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভূমিকাও গুরুত্ব পেয়েছে। বারকাত যুক্তি দিয়েছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অভিযান, ‘ওয়ার অন টেরর’, বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতি এবং পশ্চিমা শক্তির বিভিন্ন নীতি মুসলিম বিশ্বে ক্ষোভ ও অস্থিরতা তৈরি করেছে। তাঁর মতে, এসব ঘটনা বিভিন্ন দেশে ধর্মভিত্তিক মৌলবাদের বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো কখনো কখনো নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করেছে এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বারকাত মনে করেন, মৌলবাদী রাজনীতির শক্তি কেবল নির্বাচনী রাজনীতি থেকে আসে না; বরং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবের সমন্বয়ে এটি বিস্তার লাভ করে। ফলে একটি সংগঠন রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এ কারণেই তিনি মৌলবাদের অর্থনীতিকে রাজনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলবাদী রাজনীতির একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। তাঁর মতে, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোর চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রচার নয়; বরং রাষ্ট্র ও সমাজকে তাদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে পুনর্গঠন করা।
তবে বারকাতের গবেষণা নিয়ে বিতর্কও আছে। সমালোচকেরা বলেন, তিনি ধর্মভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সম্পর্ককে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই বিস্তৃত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। অন্যদিকে তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন, বাংলাদেশে মৌলবাদী রাজনীতির অর্থনৈতিক ভিত্তি নিয়ে তিনি প্রথম দিকের এবং সবচেয়ে বিস্তৃত গবেষণাগুলোর একটি পরিচালনা করেছেন।
সব মিলিয়ে এই গবেষণাপত্রের মূল বার্তা হলো—বাংলাদেশে মৌলবাদকে শুধুমাত্র ধর্মীয় বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। আবুল বারকাতের মতে, এর পেছনে রয়েছে একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক কাঠামো, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং রাজনৈতিক প্রকল্প। তাই মৌলবাদ মোকাবিলার জন্য শুধু আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা নয়, বরং বৈষম্য হ্রাস, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং বিকল্প সামাজিক-অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।