Image description

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। গ্রামের মেঠোপথ ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন এক স্কুলশিক্ষক। পেছনের ক্যারিয়ারে ব্যাগ, পায়ে মৃদু ছন্দে প্যাডেল ঘোরানো। সামনে কয়েকজন পথচারী। তাঁদের সতর্ক করতে তিনি বাজালেন সাইকেলের ছোট্ট ঘণ্টি, ক্রিং... ক্রিং...। শব্দটি ছিল কোমল, পরিচিত এবং আপন। সেই শব্দে পথচারীরা একটু সরে দাঁড়াতেন, কেউবা ফিরে তাকিয়ে হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানাতেন। সাইকেলের ঘণ্টির সেই ক্রিং ক্রিং শুধু একটি সংকেত ছিল না; ছিল একসময়ের জীবনযাত্রার অংশ, ছিল ধীরস্থির জীবনের এক সুর।

আজ বিশ্ব সাইকেল দিবস। দিনটি শুধু সাইকেলের উদ্‌যাপন নয়, বরং মনে করিয়ে দেয়, একটি সময় ছিল যখন গতি ছিল মানুষের পায়ের ছন্দে। যাতায়াতের সঙ্গী ছিল সাইকেল। সময়ের চাকা ঘুরেছে। মেঠোপথের জায়গায় এসেছে প্রশস্ত সড়ক। সাইকেলের সংখ্যা কমে বেড়েছে মোটরচালিত যানবাহন। এখন সেই কোমল ক্রিং ক্রিংকে ঢেকে দিয়েছে বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির কর্কশ হর্ন। শহর তো বটেই, অনেক গ্রামেও আজ আর সাইকেলের ঘণ্টির শব্দ সহজে শোনা যায় না।

অথচ গ্রামবাংলার চিরচেনা ছবিতে একসময় বাইসাইকেল ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, ডাকপিয়ন, শিক্ষক, কৃষি কর্মকর্তা, এমনকি চিকিৎসকরাও নিয়মিত সাইকেল ব্যবহার করতেন। একটি সাইকেল অনেক পরিবারের জন্য ছিল মর্যাদা ও প্রয়োজনের প্রতীক।

তখন রাস্তায় যানবাহনের চাপ কম ছিল। মানুষ গন্তব্যে পৌঁছাতে তাড়াহুড়ো করত না। সাইকেলের ঘণ্টির শব্দ ছিল পথের ভাষা। সেই শব্দে বিরক্তির বদলে ছিল সহমর্মিতা।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নগরায়ণ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চলাচলের ধরনও বদলেছে। দ্রুতগতির জীবনে সময় বাঁচানো এখন প্রধান বিবেচনা। ফলে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার এবং বিভিন্ন ধরনের যান্ত্রিক যানবাহনের ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। সঙ্গে বেড়েছে শব্দদূষণও। শহরের ব্যস্ত সড়কে দাঁড়ালে একটানা হর্নের শব্দে কথাবার্তাও শুনতে কষ্ট হয়। সেই শব্দের ভিড়ে সাইকেলের ছোট্ট ঘণ্টি যেন অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক নগর পরিবহনব্যবস্থায় সাইকেলকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় এর ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত হয়ে পড়েছে। নিরাপদ সাইকেল লেনের অভাব এবং দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে না পারাও এর অন্যতম কারণ।

সাইকেল শুধু একটি বাহন নয়; এটি ছিল সামাজিক সংস্কৃতিরও অংশ। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে সাইকেল চালানো, গ্রামের হাটে যাওয়া, স্কুলে যাওয়ার পথে ঘণ্টি বাজিয়ে বন্ধুকে ডাকা, এসব স্মৃতি বহু মানুষের শৈশব ও কৈশোরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজকের প্রজন্মের অনেকেই সেই অভিজ্ঞতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাদের দৈনন্দিন জীবনে সাইকেলের জায়গা নিয়েছে মোটরচালিত যান। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে সাইকেলকে ঘিরে গড়ে ওঠা একধরনের সামাজিক বন্ধনও।

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানিসংকট এবং নগর যানজটের কারণে আবারও সাইকেলের গুরুত্ব বাড়ছে। অনেক দেশ সাইকেলবান্ধব নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। স্বাস্থ্যসচেতন তরুণদের মধ্যেও সাইকেল চালানোর আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। দেশেও বিভিন্ন সাইক্লিং সংগঠন এবং তরুণদের উদ্যোগে সাইকেলের প্রতি আগ্রহ নতুন করে তৈরি হয়েছে। ছুটির দিনে রাজধানীর সড়কে কিংবা জেলা শহরগুলোতে সাইকেল আরোহীদের দল এখন আগের চেয়ে বেশি চোখে পড়ে।

হয়তো আগের দিনের মতো সাইকেল আর কখনো পথের একচ্ছত্র বাহন হবে না। কিন্তু পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যকর পরিবহনের কথা যখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত হচ্ছে, তখন সাইকেলের প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে সামনে আসছে। যান্ত্রিকতার উচ্চ হর্নে আজ সাইকেলের ‘ক্রিং ক্রিং’ অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে। তবু সেই শব্দ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। শহরের কোনো ভোরে, গ্রামের কোনো নির্জন পথে কিংবা কোনো স্কুলগামী শিশুর সাইকেলে এখনো মাঝেমধ্যে শোনা যায় সেই পরিচিত সুর।

সেই ক্রিং ক্রিং যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গতি যতই বাড়ুক, জীবনের সব সৌন্দর্য উচ্চ শব্দে নয়; কিছু সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে ছোট্ট একটি ঘণ্টির মৃদু ধ্বনিতেও।

ঢাকায় এখনও লাখো না হলেও হাজার হাজার সাইকেল আছে। এগুলো বায়ুদূষণ খানিকটা হলেও কমাচ্ছে। তারা যদি তেল পোড়ানো মোটরচালিত যানবাহনে চড়তেন, তাহলে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য দূষণ নির্গত হতো। সাইকেল চালানো উৎসাহিত করতে শুধু আলাদা লেন নয়, মেট্রোর নিচে স্ট্যান্ড করা দরকার। যেখান থেকে সাইকেল নিয়ে বা রেখে একজন নাগরিক শহরের দূষণ কমাতে সাহায্য করতে পারেন।