ঢাকার কারওয়ান বাজারে ২০ তলাবিশিষ্ট নিজস্ব ভবন তৈরি করেছে যমুনা অয়েল কোম্পানি। উদ্দেশ্য ছিল ভাড়া দিয়ে কোম্পানির আয় বাড়ানো। কিন্তু ভবনটির ওপর নজর পড়ে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)র। সম্প্রতি ওই ভবনের তিনটি ফ্লোর কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ইতোমধ্যে এ প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়েছে। বিষয়টি এরই মধ্যে যমুনার বোর্ড অনুমোদনও দিয়েছে। মিলেছে সরকারের ইতিবাচক সাড়াও।
জানা গেছে, বর্তমানে ফেয়ার ভ্যালু নির্ধারণে কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঈদের পর কমিটির প্রতিবেদন পেলে টাকা জমা দিয়ে ফ্লোরগুলো নিজেদের করে নেবে বিপিসি। অথচ কোম্পানি আইন বলছে, এক টাকার সম্পদ কাউকে দিতে গেলে এজিএমে পাস করাতে হবে। এজিএম ছাড়া শুধু বোর্ড সম্পদ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এখানে কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে ফ্লোর হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানির ৬০ শতাংশ শেয়ারের মালিক বিপিসি। এই জোরে ঢাকায় যমুনা ভবনের তিনটি ফ্লোর (১৫ হাজার স্কয়ায় ফিট) চাইছে প্রতিষ্ঠানটি। নিয়মানুযায়ী কোম্পানির কোনো সম্পদ হস্তান্তর করতে হলে এজিএমের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে যদি কেউ ওই সম্পদ কিনতে চায়, তবে এজিএমের ভোটে সে অংশ নিতে পারবে না। অর্থাৎ ৬০ শতাংশ শেয়ারের মালিক হয়েও এজিএমের এই এজেন্ডায় বিপিসি অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে না। সেক্ষেত্রে বাকি ৪০ শতাংশ শেয়ারহোল্ডারকে শতভাগ ধরে নিয়ে এজিএমে ভোটাভুটি হবে। এখানে বেশিরভাগ শেয়ারহোল্ডার প্রস্তাবে ভেটো দিলে নিয়মানুযায়ী ফ্লোর হস্তান্তরের বিষয়টি ঝুলে যাবে।
আইনে জটিলতা থাকায় বিপিসি সরকারের সায় নিয়ে ফ্লোর হস্তান্তরের বিষয়টি ইতোমধ্যে যমুনার বোর্ডসভায় অনুমোদন হয়ে গেছে। ফ্লোরগুলোর ফেয়ার ভ্যালু নির্ধারণের জন্য একটি কমিটিও গঠিত হয়েছে। ঈদের পরপরই ওই কমিটির প্রতিবেদন দাখিলের কথা রয়েছে।
বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি চট্টগ্রামের প্রধান কার্যালয়কে ঢাকায় স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যমুনা ভবনের এই তিন ফ্লোরেই প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটির ৯০ শতাংশ কাজই চট্টগ্রামে। কারণ, বিপিসির অধীন ইস্টার্ন রিফাইনারি, বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, এলপিজি, মোবিলসহ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই চট্টগ্রামে।
প্রাতিষ্ঠানিক কাজের সুবিধার পাশাপাশি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্যে বিপিসিকে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত করা হয় এরশাদ সরকারের আমলে। সেই থেকে ভাড়া কার্যালয়ে বিপিসির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে সম্প্রতি চট্টগ্রামের জয়পাহাড়ে বিপিসির নিজস্ব জমিতে ৫০ কোটি টাকা
ব্যয়ে একটি ভবনও নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ঈদের পর যেকোনো সময় কার্যালয়টি উদ্বোধনের কথা রয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে হঠাৎ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে অত্যন্ত দ্রুততায়।
ত্বরিতগতিতে এগোচ্ছে স্থানান্তর প্রক্রিয়া
বিপিসির প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি হঠাৎ শুরু হয়। সংসদের প্রথম অধিবেশনে কার্যপ্রণালির ৭১ বিধি অনুসারে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী হঠাৎ বিপিসির অফিস স্থানান্তরের বিষয়টি জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন উল্লেখ করে একটি নোটিস করেন। এতে জনস্বার্থে বিপিসির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুষ্ঠুভাবে কার্যসম্পাদনের লক্ষ্যে প্রধান কার্যালয় রাজধানীতে স্থানান্তরের আবেদন জানান। বিষয়টি আমলে নিয়ে ১২ মে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে বিপিসির চেয়ারম্যানের মতামত চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়।
মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপিসি সচিব শাহিনা সুলতানা প্রতিষ্ঠানটির ছয় বিভাগের ছয় জিএমকে মতামত দেওয়ার জন্য আরেকটি চিঠি ইস্যু করেন। সূত্র জানিয়েছে, বিপিসি চেয়ারম্যান সব জিএমকে ইতিবাচক মতামত দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। চেয়ারম্যানের কথায় সবাই কার্যালয় স্থানান্তরের পক্ষে মত দিতে বাধ্য হয়েছেন। তবে জিএমদের মতামত এখনো ঢাকায় পাঠানো হয়নি।
গত ১২ মে প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের জন্য জাতীয় সংসদে প্রস্তাব উঠলেও কার্যালয়ের জন্য যমুনা ভবনের তিনটি ফ্লোর বিপিসিকে বাজারমূল্যে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গত ২৯ এপ্রিল ৫৪৬তম বোর্ডসভায় গৃহীত হয়।
বিষয়টি নিয়ে এত দ্রুত সিদ্ধান্ত হওয়ায় জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরাও হতবাক। তারা বলছেন, সংসদে প্রস্তাব উপস্থাপন ছিল একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। সবকিছু আগে থেকেই ঠিক করে রাখা হয়েছিল। এখন শুধু দাপ্তরিক কাজ পালন করা হচ্ছে। তারা আরো বলছেন, সরকারের গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া এত গুরুত্বপুর্ণ সিদ্ধান্তে সবাই একমত হওয়া সম্ভব নয়। মূলত উপর মহলের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তই সবাই খাতা-কলমে বাস্তবায়ন করে চলেছেন মাত্র। কিন্ত তড়িঘড়ি করে করতে গিয়ে আইনের ব্যত্যয় ঘটছে অনেক জায়গায়।
কোম্পানি আইন লঙ্ঘন
রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান হলেও ‘যমুনা অয়েল’ শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত একটি লিমিটেড কোম্পানি। তাই এ কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন ছাড়া ভবনের ফ্লোরের মতো সম্পদ স্থানান্তর করার সুযোগ নেই। অথচ যমুনা অয়েল কোম্পানি অন্য শেয়ারহোল্ডারদের অন্ধকারে রেখে শুধু বোর্ডের একটি অনুমোদন নিয়েই ফ্লোর হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে যমুনা অয়েলের সাবেক এক এমডি জানান, ঢাকার নিজস্ব জমিতে ভবন তৈরির উদ্দেশ্য ছিল সেখানকার একটি ফ্লোরে যমুনার আধুনিক একটি লিয়াজোঁ অফিস করা। পাশাপাশি অন্য ফ্লোরগুলো ভাড়া দিয়ে কোম্পানির আয় বাড়ানো। কিন্তু যমুনায় বিপিসির শেয়ার আছে ৬০ শতাংশ। এছাড়া রাষ্ট্রীয়ভাবেই যমুনার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিপিসি। তাই ফ্লোর হস্তান্তরের এ প্রক্রিয়া বিতর্কিত। এখন অন্য শেয়ারহোল্ডারাও যদি বিপিসির মতো ভবনের ভাগ চায়, তাহলে কোম্পানির উদ্দেশ্য সফল হবে না।
যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের বর্তমান এমডি ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া জানান, তিনি নতুন জয়েন করেছেন। তাই এসব বিষয়ে তার কিছুই জানা নেই।
চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের আগ্রহ
বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে হলেও মূলত প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানসহ পরিচালকরা সবাই ঢাকায় অবস্থান করতে পছন্দ করেন। কারওয়ান বাজারের লিয়াজোঁ অফিসে বসেই নিয়ন্ত্রণ করেন জ্বলানি তেলের বিশাল খাতটিকে। বিপিসি চেয়ারম্যান তিন মাসেও একদিন চট্টগ্রামে আসেন না। যখন আসেন তখন তার সফরসূচিতে উল্লেখ করা হয় ‘বিপিসি চেয়ারম্যানের চট্টগ্রাম সফর’। অথচ প্রধান কার্যালয়েই তার অফিস করার বিধান রয়েছে।
অন্য পরিচালকদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে যমুনা অয়েলের সাবেক এক এমডি বলেন, প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একটি সম্মিলিত মিটিং করার প্রয়োজন হয়। শুধু বিপিসি চেয়ারম্যান ঢাকায় থাকার কারণে সবগুলো কোম্পানির এমডি কখনো কখনো একাধিক জিএম পর্যায়ের কর্মকর্তাকেও ঢাকায় ছুটে যেতে হয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে মিটিং করতে। এক ঘণ্টার একটি মিটিংয়ের জন্য একদিন, কখনো কখনো দুদিনও ঢাকায় হোটেল ভাড়া দিয়ে থাকতে হয়। এতে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হয়, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক কাজেরও ক্ষতি হয়।
তিনি বলেন, বিপিসির প্রধান কার্যালয় যদি ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়, তাহলে ছোটখাটো যেকোনো সিদ্ধান্তের জন্য অধীনস্থ কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঢাকায় ছুটে আসতে হবে। এতে মুখথুবড়ে পড়বে জ্বালানি খাত।
এ ব্যাপারে বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা জানান, প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি। সবেমাত্র মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় সংসদের একটি প্রস্তাবনার ওপর মতামত চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। আমরা সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মতামত চেয়েছি। বলা যায়, বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।
তিনি আরো জানান, যমুনা ভবনের তিনটি ফ্লোর বিপিসিকে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বহুদিন আগে থেকেই চলছে। মূলত ঢাকায় বিপিসির কোনো লিয়াজোঁ অফিস নেই। তাই বড় মিটিংগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের পেট্রোবাংলার অফিস ব্যবহার করতে হয়। ঢাকায় একটি লিয়াজোঁ অফিস করার উদ্যোগ বহুদিন আগে নেওয়া হয়েছে। সেটির অংশ হিসেবেই যমুনা ভবনের তিনটি ফ্লোর ফেয়ার ভ্যাল্যুতে কিনে নেওয়ার ব্যাপারটি এসেছে।
বর্তমানে বিপিসির প্রধান কার্যালয় যেখানে চার হাজার স্কয়ার ফিটের মধ্যে, সেখানে লিয়াজোঁ অফিস করতে ১৫ হাজার স্কয়ার ফিটের তিনটি ফ্লোর কেন প্রয়োজনÑএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অফিসটি আধুনিক করে গড়ে তোলার জন্যই একটু বেশি জায়গা প্রয়োজন। এছাড়া বর্তমানে বিএসসি ভবনে ভাড়া হিসেবে বিপিসির প্রধান কার্যালয় চলছে। এটা প্রয়োজনের তুলনায় ছোট অফিস। সম্প্রতি জয়পাহাড়ে প্রধান কার্যালয়ের জন্য একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে অনেক বেশি জায়গা আছে বলেও জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের বক্তব্য
ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মানজারে খোরশেদ আলম জানান, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্যে বিপিসির প্রধান কার্যালয়কে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির অন্তত ৯০ শতাংশ কাজ চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। এখানে ছোটখাটো অনেক বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়। প্রধান কার্যালয় ঢাকায় নিয়ে গেলে অনেক ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হবে। এতে দেশের জ্বালানি খাতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
টিআইবির জাতীয় পর্ষদ সদস্য প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার জানান, বিপিসি আর যমুনার এ সিদ্ধান্তে মোটাদাগে তিনটি বড় অসংগতি আছে। প্রথমটি হলো, সংসদে প্রস্তাব উপস্থাপনের আগে অফিসের জন্য জায়গা নির্ধারণ করার অর্থ হলো সংসদকে তারা এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। কেউ যদি বলে সংসদের চেয়েও বিপিসি বেশি ক্ষমতাবান, সেটা ভুল হবে না।
দ্বিতীয়টি হলো, সরকার প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ করতে চায়। অর্থাৎ গুরুত্ব বুঝে কিছু প্রতিষ্ঠানকে ঢাকার বাইরে বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে অনেক দিন ধরে। কিন্তু বিপিসির এমন সিদ্ধান্ত সরকারের সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নকে আরো বিঘ্নিত করবে। তৃতীয়টি হলো, যেকোনো এজিএম ওই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক ফোরাম। এজিএমকে পাশ কাটিয়ে কোনো সম্পদ হস্তান্তরের সুযোগ নেই। এটি প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের প্রতিও অবজ্ঞা।